নকশ্‌বন্দীয়া তরীকার প্রতিষ্ঠা ও এর বৈশিষ্ট্য

From Sunnipedia
Revision as of 17:46, 11 January 2016 by Khasmujaddedia1 (Talk | contribs) (Created page with "{{হযরত মোজাদ্দেদে আলফে সানী (রহঃ) 1|হযরত মোজাদ্দেদে আলফে সানী (রহঃ)}} ই...")

(diff) ← Older revision | Latest revision (diff) | Newer revision → (diff)
Jump to: navigation, search

ইমামুত তরীকত ও শরীয়ত হযরত খাজা বাহাউদ্দীন মুহাম্মদ বুখারী (র.) এ তরীকার প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ৭১৮ হিজরীর মুহাররম জন্ম গ্রহণ করেন। বংশের দিক দিয়ে তিনি ইমাম হাসান (রা.) ও ইমাম হুসাইন (রা.) -এর সাথে সম্পর্কিত ছিলেন। শৈশবকাল হতেই বেলায়েতের নূর তাঁর পবিত্র চেহারায় ফুটে উঠে। সে যুগের শ্রেষ্ঠ গুলীদের তারবীয়ত ও সোহবত লাভে তিনি ধন্য হন এবং দীর্ঘ প্রায় পঞ্চাশ বছর কঠোর রিয়াযাত ও সাধনা দ্বারা কামালিয়াত অর্জন করেন্ এ সময় তিনি বুখারার সব খানকাহ ও মাদ্রাসার প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ করতেন, তাছাড়া আল্লাহ্র ওলী ও দরবেশদের খিদমত ও তাদের পেশাব খানা ও পায়খানা পরিস্কার করার কাজও করতেন।

উল্লেখ্য যে নাফসের পবিত্রতা লাভের জন্য দীর্ঘ চল্লিশ-পঞ্চাশ বছর কঠোর পরিশ্রমের পর তিনি চিন্তা করেন যে, পরবর্তী সময়ের মানুষের হায়াত দীর্ঘ হবে না এবং আল্লাহ্ তায়ালার মারিফাত ও মহব্বত হাসিলের জন্য তারা এত কষ্ট দ্বীকার করতে পারবে না। কারণ, যতই দিন যাবে, ততই মানুষ দুনিয়ামুখী হবে এবং দুনিয়ার ঝামেলায় জড়িয়ে পড়বে। তাই একটি সহজ তরীকা লাভের আশায় তিনি আল্লাহর দরবারে লাগাতার পনের দিন সিজদায় পড়ে থাকেন। নামাযের সময় হলে শুধুমাত্র জামাতে ফরয নামায আদায় করতেন এবং বাকী সময় সিজদায় পড়ে থাকতেন। এ সময় কোন দিন তিনি এক লোকমা খানা বা এক ফোঁটা পানি স্পর্শ করেননি। খাজা বাহাউদ্দীন নকশ্‌বন্দ (র.) সিজদায় পড়ে এরূপ দু’আ করতেন:

ইয়া আল্লাহ্! আপনি আমাকে এরূপ তরীকা দান করুন, যে তরীকায় সহজে তোমার মারিফাত বা পরিচয় লাভ করা যায় এবং ‘তালেবে মাওলা’ যেন মাহরম না হয়।

কখনো কখনো তিনি এরূপ মনে করতেন যে, যদি তাঁর দু’আ কবুল না হয়, তবে তিনি সিজ্দার মধ্যেই নিজেকে আল্লাহর নিকট সোপর্দ করবেন। সে জন্য তিনি বলতেন  :

ইয়া আল্লাহ্! আপনার দরবারে সিজদার মধ্যে যদি আমার ইনতিকাল হয়ে যায়, তবে আমি আমার খুন মাফ করে দিলাম। আমি উম্মতে-মুহাম্মদীর জন্য আসান বা সহজ তরীকার দাবী আদায় না করে সিজ্দা থেকে মাথা উঠাব না।

এ সময় সিজ্দার মধ্যে মাঝে মাঝে এরূপ ‘ইল্হাম’ হতো :

আমি যেরূপ চাই, তুমি সেরূপ তরীকা গ্রহণ কর।

আর তিনি বলতেন :

ইয়া আল্লাহ্! আপনার বান্দা বাহাউদ্দীন যেমন আসান তরীকা চায়, তাকে তাই দান করুন।

অবশেষে পনের দিন আল্লাহ্ তায়ালার তরফ থেকে এরূপ ‘ইল্হাম’ বা নির্দেশ আসে :

আমি তোমাকে এমন তরীকা দান করব, যে তরীকায় দাখিল হওয়ার পর কেউ মাহরম বা বঞ্চিত হবে না।

আরো ‘ইলহাম’ হলো :

মানুষের শরীরে দশটি লতীফা আছে, এর মধ্যে পাঁচটি লতীফা ‘আলমে-আমর’ বা সূ² জগতের এবং পাঁচটি লতীফা আলমে-খালক’ বা জড় জগতের। ‘আলমে-আমরের পাঁচ লতীফা হলো : কল্ব, রূহ, সির, খফী ও আখ্ফা নূরের তৈরি, সে জন্য তা নূরানী।

মহান আল্লাহ্ ‘আমর’ শব্দের ব্যাখ্যায় আল্-কুরআনে ইরশাদ করেনেঃ

বস্তুত আল্লাহ্ তায়ালা যখন কোন কিছু সৃষ্টি করতে চান, তখন তিনি বলেন : হও, আর অমনি তা হয়ে যায়।

— আল্-কুরআন, সূরা ইয়াসিন, আয়াত : ৮৪

অর্থাৎ ‘কুন’ শব্দ দ্বারা যা কিছু সৃষ্টি হয়েছে, তার মধ্যে ‘আলমে-আমরের’ পাঁচ লতীফা শামিল। পক্ষান্তরে ‘আলমে খালক’ বা জড় জগতের পাঁচ লতীফা যুল্মত বা অন্ধকারাচ্ছন্ন। আর তা হলো: আগুন, পানি, মাটি,বাতাস ও নাফ্স।

উল্লেখ্য যে, নকশ্‌বন্দীয়া তরীকা প্রচার ও প্রসারের পূর্বে বুজু র্গানে দ্বীন প্রথমে ‘নাফসের তাযকীয়া’ বা প্রবৃত্তি পরিশুদ্ধ করার শিক্ষা দিতেন, কিন্তু নাফ্স যুল্মত বা কালো কয়লার মত কালো হওয়ার কারণে তা ইসলাহ বা সংশোধন হতে অনেক সময়ের প্রয়োজন হতো। নাফসের ইসলাহের জন্য আগের যামানার বুজুর্গরা ‘তালেবে মাওলাকে’ [1] যে পথ অনুসরণের উপদেশ দিতেন, তা ছিল ‘তরকে হাকীকী বা দুনিয়ার সব কিছু ত্যাগ করা। নাফসের পবিত্রতা হাসিলের জন্য ‘তালেবে মাওলাকে’ যে কঠিন ও কঠোর সংগ্রাম করতে হতো, তা হযরত অহেদ উদ্দীন কিরমানী (র.)-এর কবিতায় বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন :

আওহাদী শশ্ত সাল সখ্তী দীদ্!

তা-শবে রুয়ে নেক বখ্তী দীদ!

অর্থাৎ “অহেদ উদ্দীন ষাট বছর কঠোর সাধনার পর এক রাতে সে․ভাগ্যের মুখ দর্শন করনে।”

আল্লাহ্ তায়ালার তরফ থেকে হযরত খাজা বাহাউদ্দনি নকশ্‌বন্দ বুখারী (র.)-এর উপর এরূপ ‘ইল্হাম’ হয় যে, ‘নাফ্সের ইস্লাহ খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। আর ‘ক্বল্ব’ যেহেতু ‘নূর’ হতে সৃষ্ট স্বচ্ছ আয়নার ন্যায়, তাই তুমি প্রথমে ‘ক্বলবের’ ইস্লাহ কর, তাহলে মানুষের অন্তর অতি দ্রুত বাতিনী নূরের আলোকে নূরান্বিত হবে। বস্তুত : ‘তালেবে মাওলার’ অন্তরে যখন আল্লাহ্ তায়ালার মহব্বতের নূর পয়দা হয়, তখন আস্তে আস্তে গায়রুল্লাহর সাথে তার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়।

উল্লেখ্য যে, এরূপ নির্দেশ পাওয়ার পর হযরত বাহাউদ্দীন নকশবন্দ (রহ:) আল্লাহর দরবারে শোকর আদায় করে সিজদা থেকে মাথা উঠান এবং নির্দেশ মতো আল্লাহ্ প্রাপ্তির জন্য যারা আসতো, তাদের তালীম ও তারবীয়ত দেয়া শুরু করেন। তিনি হলেন নকশবন্দীয়া তরীকার ইমাম বা ‘আসান তরীকার’ [2] প্রতিষ্ঠাতা। এ তরীকার মূলনীতি হলো :

১. নিজের পীরকে সকলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ মনে করা। অন্যথায় রূহানী ফয়েয থেকে বঞ্চিত হয,
২. এই তরীকার মুর্শিদ সাইয়েদেনা হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) কে নবী গণের পর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষরূপে মনে করা। এই তরীকার মাধ্যমে শরীয়ত ও তরীকত উভয়েরই পূর্ণতা সাধন হয়। এ ছাড়া সুন্নতের পায়রবী করা ও বিদ্’আত সম্পূর্ণ পরিত্যাগ করা ও এই তরীকার অন্যতম মূলনীতি। হযরত রাসূলে করীম (স.)-এর বিশিষ্ট সাহাবায়ে কিরামের ন্যায় বেশ-ভূষা, পোষাক-পরিচ্ছদ, জীবন-যাপন, জিকির-আজকার, নাফসের হিসাব-কিতাব গ্রহণ করা ছাড়াও সব সময় হুজুরী-ক্বলব, পীরের প্রতি আদব রাখা, তাঁর খিদমত করা এবং তাঁর সাথে মহব্বত রাখা জরুরী।

এ ছাড়া কম পরিশ্রম, বেশী বেশী ফয়েয জারী হওয়া এবং কামালাতে বেলায়েত’ ছাড়া ও ‘কামালাতে নবূওতের’ শিক্ষা এই তরীকায় আছে। এতে চিল্লাকাশির [3] প্রয়োজনীয়তা নেই এবং জোরে জোরে জিকির করা ও বাদ্যযন্ত্রের সাহায্যে সিমা ও কাওয়ালী ইত্যাদির নিয়ম নেই। তাছাড়া কবরের উপর বাতি জ্বালানো, গিলাফ ও চাদর ইত্যাদির সাহয্যে কবর ঢাকা, স্ত্রীলোকদের মাযারে ভীড় করা, সিজদায়ে তাযীমি বা পীরের সামনে মাথা ঝুকানো, চুমা দেয়া, তাওহীদে অজুদী, আনাল হক, হামাউস্ত ইত্যাদির দাবী, স্ত্রীলোক-মুরীদের জন্য পীরের সামনে বে-পর্দা হওয়া ইত্যাদির অনুমাতি এই তরীকায় নেই [4] এ তরীকার বুনিয়াদ চারটি :

১. হুশ্‌ দর দম বা সর্বদা যিকিরের খেয়াল রাখা।
২. নযর বর কদম বা সর্বদা সামনে দৃষ্টি দেয়া। অর্থাৎ এক মাকামের পর অন্য মাকামের খেয়াল করা।
৩. সফর দর ওয়াতন বা নিজের সত্তার মধ্যে ভ্রমন করা এবং
৪. খেলাওত দর আন্-জুমান বা জনতার মধ্যে ও নির্জনতা।

তথ্যসূত্র

  1. আল্লাহ্ প্রাপ্তির পথের পথিককে ‘তালেবে মাওলা’ বলে।
  2. সহজ তরীকার প্রতিষ্ঠাতা।
  3. দুনিয়ার সাথে সম্পর্কছিন্ন করে লাগাতর ৪০ দিন আল্লাহর ইবাদত জিকির আজকারে সময় কাটানকে ‘চিল্লাকাশি বলে।
  4. জাওয়াহেরে মুজাদ্দেদীয়া।
  • মুজাদ্দিদ-ই-আলফে সানী (রহঃ) জীবন ও কর্ম (লেখকঃ ডক্টর আ. ফ. ম. আবু বকর সিদ্দীক)