বিবি আছিয়া (আঃ)

From Sunnipedia
Revision as of 18:54, 5 November 2015 by Khasmujaddedia1 (Talk | contribs)

(diff) ← Older revision | Latest revision (diff) | Newer revision → (diff)
Jump to: navigation, search

পৃথিবীতে আল্লাহ তায়ালা কিছু মানব-মানবী সৃষ্টি করেছেন সীমাহীন ধৈর্য দিয়ে। তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে অবর্ণনীয় দুঃখকষ্ট ও নির্যাতন সহ্য করে ন্যায়ের পথে অবিচল ছিলেন। দুনিয়ার আরাম-আয়েসকে পদাঘাত করে আল্লাহর ভালোবাসাকে প্রধান্য দিয়েছেন। তাদের অন্যতম হলেন বিবি আসিয়া (আ.)।

হজরত আসিয়া (আ.) এর ঘরে তার কোলে-কাঁখে লালিতপালিত হন আল্লাহর প্রিয় নবী হজরত মুসা (আ.)। শিশু মুসা (আ.) কে যখন তার মা ফেরাউনের ভয়ে সিন্দুকে ভরে নীল নদে নিক্ষেপ করেন, তা ভাসতে ভাসতে সেই ফেরাউনের ঘাটে গিয়েই ঘুরপাক খেতে থাকে। যেখানে বাঘের ভয়, সেখানে রাত পোহায়! পাপিষ্ঠ ফেরাউন সিন্দুকটি উঠানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। তার অপবিত্র হাতে তা উঠছিল না। হজরত আসিয়া (আ.) যখন আল্লাহর নামে তা উঠানোর জন্য হাত দেন, সঙ্গে সঙ্গে তা উঠে আসে। সিন্দুক খুলে একটি পুত্রসন্তান দেখতে পেয়ে ফেরাউনের মনে সন্দেহ সৃষ্টি হয়। সে তাকে তার ভাবী শত্রু মনে করে হত্যা করতে উদ্যত হয়। কারণ সে গণকদের কাছ থেকে জানতে পেরেছিল, ইসরাইল বংশে এক শিশুপুত্র জন্মগ্রহণ করবে, যার হাতে তার রাজত্ব ধ্বংস হবে। কিন্তু তার স্ত্রী হজরত আসিয়া (আ.) তাকে লালনপালন করার আগ্রহ ব্যক্ত করেন। আল কোরআন বলছে,

ফেরাউনের স্ত্রী বলল, এ শিশু আমার ও তোমার নয়নমণি, তাকে হত্যা কর না। এ আমাদের উপকারে আসতে পারে অথবা আমরা তাকে পুত্র করে নিতে পারি।

— সূরা আল কাসাস : ৯

স্ত্রীর দাবির সামনে ফেরাউন নমনীয় হয়ে যায়। সে তাকে লালনপালনে সম্মত হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

প্রকৃতপক্ষে পরিণাম সম্পর্কে তাদের কোনো খবর ছিল না।

— সূরা আল কাসাস : ৯

আল্লাহর কী কুদরত! যে শিশুসন্তানের ব্যাপারে স্বপ্নে ও স্বপ্নের ব্যাখ্যার ভিত্তিতে ফেরাউন শঙ্কিত হয়েছিল এবং যার কারণে বনি ইসরাইলের অসংখ্য নবজাতক ছেলে সন্তানকে হত্যা করা হয়েছিল, তাকে আল্লাহ তায়ালা এ ফেরাউনের ঘরে তার স্ত্রীর আদরযত্নে লালিতপালিত করলেন। যে বিপদাশঙ্কায় পুরো জাতির ওপর নির্যাতনের স্টিমরোলার চালানো হয়েছিল, অবশেষে মহান আল্লাহ তার গৃহ থেকেই সে বিপদ আগ্নেয়গিরির এক ভয়ঙ্কর লাভা রূপে বিস্ফারিত করলেন। আল্লাহর অসীম কুদরতের কাছে বান্দা কত অসহায়! পবিত্র কোরআনের ভাষায় এ ঘটনা এভাবে বর্ণিত হয়েছে,

আমি মুসা জননীকে আদেশ পাঠালাম, তাকে স্তন্য দান করতে থাকো। অতঃপর যখন তার সম্পর্কে বিপদের আশঙ্কা করো, তখন তাকে দরিয়ায় নিক্ষেপ করো এবং ভয় করো না, দুঃখও করো না। আমি অবশ্যই তাকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দেব এবং তাকে পয়গম্বরদের একজন করব। অতঃপর ফেরাউন পরিবার মুসাকে কুড়িয়ে নিল, যাতে তিনি তাদের শত্রু ও দুঃখের কারণ হয়ে যান। নিশ্চয় ফেরাউন, হামান ও তাদের সৈন্যবাহিনী অপরাধী ছিল।

— সূরা আল কাসাস : ৭-৮

আল্লাহর কুদরতের সামনে ফেরাউনি কৌশল শুধু ব্যর্থ ও বিপর্যস্তই হলো না; বরং ফেরাউন ও তার পারিষদ চরম বোকা বনে গেল। আল্লাহ তায়ালা হজরত আসিয়া (আ.) এর অন্তরে শিশু মুসা (আ.) এর প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করে দেন। তিনি তাকে নিজ ছেলের মতো ভালোবাসতে থাকেন।

হজরত আসিয়া (আ.) ছিলেন মিসরের অধিবাসী মুজাহিমের মেয়ে। তার বাবা তাকে মিসরের ফেরাউন (বাদশাহ) দ্বিতীয় রামসেসের সঙ্গে বিয়ে দেন। ফেরাউন ছিল অত্যন্ত প্রতাপশালী, জঘন্য ও কুখ্যাত। নিজেকে সে খোদা বলে দাবি করে। সে আল্লাহর প্রভুত্বকে অস্বীকার করে নিজের মনগড়া আইন-শাসন ও স্বৈরাচারী নীতি মানুষের ওপর চাপিয়ে দেয়। কিন্তু হজরত আসিয়া (আ.) ফেরাউনের ভ্রান্ত দাবি, বিশ্বাস ও স্বৈরাচারী নীতিকে প্রত্যাখ্যান করেন। এতে ফেরাউন তার ওপর ভীষণ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। হজরত আসিয়া (আ.) এর ওপর নেমে আসে জুলুম-নির্যাতনের খ্তগ। ফেরাউনের নির্দেশে তাকে জিঞ্জিরাবদ্ধ করা হয়। বিরাট পাথরের নিচে তাকে চাপা দিয়ে রাখা হয়। প্রস্তরাঘাতে তার পবিত্র দেহকে ক্ষতবিক্ষত করা হয়। তার চোখ উপড়ে ফেলা হয়। কিন্তু এসব অমানবিক নির্যাতন-নিপীড়নেও হজরত আসিয়ার বিশ্বাসে চুল পরিমাণ পরিবর্তন হয়নি। বরং তিনি দৃঢ় প্রত্যয়ে মহান প্রভুর প্রভুত্বের স্বীকৃতি দিয়ে যে নির্যাতন ভোগ করছিলেন, তাতেই তিনি ঈমানের স্বাদ পাচ্ছিলেন।

বিবি আসিয়া (আ.) কাফের ও জালিম স্বামীর জুলুম-নির্যাতন সহ্য করেও ঈমান ও ধৈর্যের যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা বিশ্ব নারী সমাজের জন্য এক শাশ্বত আদর্শ হয়ে আছে। আসিয়া (আ.) এর মর্যাদা সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেন, 'দুনিয়ার সব নারীর ওপর চারজন নারীর মর্যাদা রয়েছে। তারা হলেন হজরত মরিয়ম (আ.), হজরত আসিয়া (আ.), হজরত খাদিজা (রা.) ও হজরত ফাতিমা (রা.)। মুসা (আ.) বড় হয়ে নবুয়ত লাভ করেন। নবুয়ত লাভের পর তিনি ফেরাউনকে ঈমানের দাওয়াত দেয়ার জন্য মিসরে আসেন। ফেরাউনের সাম্রাজ্যের অনেকেই এমনকি ফেরাউনের অনেক আত্মীয়স্বজনও হজরত মুসা (আ.) এর ধর্মে দীক্ষিত হয়। কিন্তু ফেরাউন অস্বীকার করে। সে দুনিয়া ও আখেরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেল।

তথ্যসূত্র