মক্কা বিজয়ের পর থেকে বিদায় হজ্জ পর্যন্ত

From Sunnipedia
Revision as of 16:41, 3 September 2015 by Khasmujaddedia1 (Talk | contribs)

Jump to: navigation, search
নবূওতের বাইশ বছর - ৬৩২ খৃষ্টাব্দ, ৯ম হিজরী, বয়স ৬২ বছর।
হোনায়েন ও তায়েফ অভিযান

মক্কা বিজয়ের পর সমগ্র আরবে মুসলমানদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। আরবের অধিকাংশ গোত্র মুসলমানদের আনুগত্য মেনে নেয়। কিন্তু তায়েফের হাওয়াযেন ও ছাকীফ গোত্র না ইসলাম গ্রহণ করলো, আর না আনুগত্য স্বীকার করলো। এ দুটো গোত্র আরবের প্রধান গোত্রগুলোর অন্তর্ভুক্ত ও বীর যোদ্ধা হিসাবে খ্যাত ছিল। কিন্তু তারা যখন দেখলো, মুহাম্মদ (স.) মক্কা বিজয় করেছেন এবং অন্যান্য পার্শ্ববর্তী গোত্র ইসলাম গ্রহণ করেছে, তখন তারা বিপদের আশংকা করে যে, এখন মুসলমানরা তাদের আক্রমণ করতে পারে। সেজন্য দেরী না করে তারা রাসূলুল্লাহ (স.)-এর বিরুদ্ধে হামলার পরিকল্পনা করে।

হোনায়েন রনাংগন

বনূ হাওয়াযেনরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে রন প্রস্তুতি নেবার সাথে সাথে রাসূলুল্লাহ (স.) তা জানতে পারেন। তিনি তখনই হযরত আবদুল্লাহ (রা.)-কে গুপ্তচররূপে তাদের এলাকায় পাঠান সঠিক খবর জানার জন্য। তিনি সে এলাকায় দু’দিন অবস্থান করার পর ফিরে এসে রাসূলুল্লাহ (স.)-কে জানান :

তারা বিশ হাজারের বিশাল এক বাহিনী তৈরী করেছে এবং তাদের স্ত্রী, সন্তানাদি ও সহায়-সম্পদ সাথে নিয়ে এসেছে।

একথা শুনে রাসূলুল্লাহ (স.) বলেন

ইনশাআল্লাহ্! আগামী দিন এগুলো মুসলমানদের মালে গণীমতে পরিণত হবে।

সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে মুসলিম বাহিনী হাওয়াযেন বাহিনীর মুকাবিলার জন্য বের হয়। যুদ্ধের ময়দানে প্রচন্ড বেগে মুসলমানরা হাওয়াযেনদের উপর আক্রমণ চালায়, ফলে তারা রনেভংগ দিয়ে পলায়ন করে। বহু সংখ্যক উট, ছাগ ও মেষ এবং প্রচুর সোনা-রূপা, এমনকি তারা তাদের স্ত্রী ও সন্তানদের রেখে চলে যায়, যা মুসলমানদের হস্তগত হয়। উল্লেখ্য যে, হোনায়েনের যুদ্ধে সত্তর জন মুশরিক মারা যায় এবং ছয় হাজার সৈন্য বন্দী হয়।[1]

তায়েফ অভিযান

হোনায়েনের যুদ্ধে আল্লাহ্ তা‘য়ালা মুসলমানদের চূড়ান্ত বিজয় দানের পর মুশরিকদের কিছু নেতা পালিয়ে তায়েফে জমায়েত হয়। বনূ ছাকীফরা তায়েফের বাসিন্দা এবং আরবের প্রধান গোত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল। মুশরিক বাহিনীর অধিপতি মালিক ইবনে আওফ তায়েফে পৌঁছে যে দুর্গে আশ্রয় নেয়, সেখানে প্রচুর খাদ্যশস্য ও রসদপত্র সংরক্ষিত ছিল, যা তাদের কয়েক বছরের জন্য যথেষ্ট ছিল। সে তার দলবল নিয়ে দুর্গের দুয়ার বন্ধ করে মুসলমানদের আগমনের প্রতীক্ষায় থাকে। দু’সপ্তাহ ধরে মুসলমানরা দুর্গ অবরোধ করে রাখে, কিন্তু এতে কোন লাভ না হওয়াতে, রাসূলুল্লাহ (স.) অবরোধ তুলে নেন এবং জীরানা নামক স্থানে পৌঁছেন।

দুধ বোন শায়েমার সাথে সাক্ষাৎ 

এ সময় মুসলিম বাহিনী বনূ সাআদ গোত্রের বজাদ নামক এক ব্যক্তিকে বন্দী করলে, তার পরিবারের এক বৃদ্ধা বলে :

আমি তোমাদের নবীর দুধ বোন, তোমরা আমাকে বন্দী করছো কেন?

তখন তারা তাকে রাসূলুল্লাহ (স.)-এর খিদমতে হাজির করলে, তিনি তার পিঠ খুলে একটা দাগ দেখিয়ে বলেন :

এই যে দেখুন, আপনি শৈশবে আমার পিঠে কামড় দিয়েছিলেন। আমি আপনার দুধ মা হালীমার কন্যা শায়মা।

— ইবনে কাছীর বর্ণিত

রাসূলুল্লাহ (স.) দেখেন, শৈশবে তিনি যার কোলে চড়ে বেড়াতেন, এ বৃদ্ধা সত্যিই সেই শায়মা। তিনি (স.) তখনই তার বন্ধন খুলে দেয়ার আদেশ দেন এবং নিজের চাদর মুবারক তাঁর বসার জন্য বিছিয়ে দেন। তিনি তাকে হাদীয়া স্বরূপ কয়েকটি উট ও দাস-দাসী প্রদান করে বলেন :

আপনি ইচ্ছা করলে আমার বাড়ীতে চলুন, আমি সসম্মানে আপনার খিদমত করবো। আর যদি নিজ বাড়ী যেতে চান, তবে আমি আপনাকে সেখানে পৌঁছে দেব। শায়মা নিজ বাড়ীতে যাবার ইচ্ছা প্রকাশ করলে, রাসূলুল্লাহ (স.) সে ব্যবস্থা করে দেন।

— ৩৬. সহীহুল বুখারী, ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা ৬১৯

তায়েফ অবরোধ 

হোনায়েন যুদ্ধক্ষেত্রের পলাতক অধিকাংশ শত্রু তায়েফে এসে আশ্রয় নেয়। এজন্য রাসূলুল্লাহ (স.) তায়েফ অবরোধ করেন। দীর্ঘ আঠার দিন সেখানে অবস্থানের পর রাসূলুল্লাহ (স.) অবরোধ উঠিয়ে নেন। তায়েফ থেকে মুসলিম বাহিনী জীরানা পৌঁছলে মালে গনীমত বন্টন করা হয়। এর মধ্যে ছিল ছয় হাজার কয়েদী, চল্লিশ হাজার বকরী, চব্বিশ হাজার উট এবং প্রচুর সোনা-রূপার অলঙ্কার।

এ সময় হাওয়াযীন গোত্রের লোকেরা রাসূলুল্লাহ (স.)এর কাছে হাজির হয়ে বলে :

আমাদের প্রতি সদয় ব্যবহার করুন।

তিনি জিজ্ঞাসা করেন :

তোমরা কোনটি চাও? স্ত্রী-পুত্রদেরকে, না তোমাদরে ধনসম্পদকে?

তারা তাদের স্ত্রী ও সন্তানদের ফেরৎ চায়। সেমতে রাসূলুল্লাহ (স.) সমস্ত কয়েদীদের মুক্ত করে দেন। নবী করীম (স.) জীরানা থেকে ওমরা আদায়ের নিয়তে মক্কায় যান এবং ওমরা পালন শেষে সাহাবীদের নিয়ে মদীনায় ফিরে যান। [2]

তবূক অভিযান 

নবম হিজরীর অন্যতম বিশেষ ঘটনা তবূক অভিযান। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের এটিই সর্বশেষ যুদ্ধবিগ্রহ।[3] তায়েফ অভিযান থেকে মদীনায় ফিরে রাসূলুল্লাহ (স.) জানতে পারেন যে, রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াস মদীনা আক্রমণের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং তাদের অগ্রবর্তী সেনাদল ‘বেলফা’ পর্যন্ত পৌঁছেছে।

এ খবর জেনে রাসূলুল্লাহ (স.) সাহাবাদের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণের জন্য নির্দেশ দিয়ে বলেন : রোমানদের বাধা দেয়ার জন্য সিরিয়াতে অভিযান চালাতে হবে। প্রায় চল্লিশ হাজার সৈন্যের এক বিরাট বাহিনী যুদ্ধের জন্য সংগৃহীত হয়, যার মাঝে দশ হাজার ছিল অশ্বারোহী সৈন্য। যুদ্ধের ব্যয় নির্বাহের জন্য রাসূলুল্লাহ (স.) সাহাবীদের মুক্ত হস্তে দান করার নির্দেশ দিলে, হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) তাঁর সকল সম্পদ নিয়ে এসে তাঁর খিদমতে পেশ করেন।

রাসূলুল্লাহ (স.) জানতে চান, তুমি তোমার পরিবারের জন্য কী রেখে এসেছ?

জবাবে তিনি বলেন : “তাদের জন্য আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলকে রেখে এসেছি।”

হযরত ‘ওমর (রা.) তাঁর সম্পদের অর্ধেক এনে রাসূল্লুাহ (স.)-এর খিদমতে পেশ করেন। সবচেয়ে বেশী সম্পদ দান করেন হযরত ‘উসমান (রা.)। তিনি এক হাজার দীনার, তিনশত সুসজ্জিত উট ও পঞ্চাশটি ঘোড়া প্রদান করেন। মুসলমানদের এ বিপুল সমরায়োজন দেখে খৃষ্টান শক্তি ঘাবড়ে যায় এবং তারা একথা রোম সম্রাটকে জানালে তার যুদ্ধ সাধ মিটে যায় এবং সে তার সৈন্যদল নিয়ে তখনই ফিরে যায়।

তবূকে পৌঁছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে কয়েকদিন অবস্থান করেন এবং শত্রুসৈন্যদের জন্য অপেক্ষা করেন। শত্রুবাহিনী মুসলিম বাহিনীর অগ্রসর হওয়ার খবর পেয়েই বিনা যুদ্ধে পালিয়ে যায়। ফলে, যুদ্ধ হলো না বটে, তবে মুসলমানদের বিরাট লাভ হলো। তা এই যে, রোমক বাহিনীর পালিয়ে যাওয়ার ফলে মুসলিম শক্তির যে প্রভাব সৃষ্টি হলো, তাতে পার্শ্ববর্তী সব এলাকার গোত্রগুলো দলে দলে এসে রাসূলুল্লাহ (স.)-এর আনুগত্য মেনে নিল ও জিযিয়া কর দিতে সম্মত হলো। [4]

এভাবে এ অভিযানে বিনাযুদ্ধে তবূক এলাকায় মুসলমানদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। যেহেতু এ অভিযানের শেষ গন্তব্য স্থান ছিল তবূক, তাই এর নাম হলো- তবূকের অভিযান। এ অভিযানই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের পরিচালিত সর্বশেষ মুবারক অভিযান।[5]

হজ্জে আকবর 

আকবর শব্দের অর্থ বড় হজ্জ। ইসলামী বিধানে হজ্জ দু’প্রকার :

(ক) ছোট হজ্জ, যা উমরাহ নামে প্রসিদ্ধ।
(খ) বড় হজ্জ- যা সবার মাঝে হজ্জ নামে খ্যাত।

নবম হিজরীর শেষভাবে যখন হজ্জের সময় আসে, তখন রাসূলুল্লাহ (স.) খাঁটি ইসলামী প্রথায় হজ্জের বিষয় শিক্ষা দেয়ার জন্য হযরত আবু বকর (রা.)-এর নেতৃত্বে ৩০০ শত হজ্জযাত্রীর একটি কাফেলা মদীনায় প্রেরণ করেন। কুরবানীর জন্য রাসূলুল্লাহ (স.) তাদের সাথে ১০টি উট প্রেরণ করেন এবং আবু বকর (রা.) নিজেও কুরবানীর জন্য ৫টি উট সংগে নেন। হযরত আবু বকর (রা.)-এর কাফেলা মদীনা থেকে রওয়ানা হওয়ার পরই আল্-কুরআনের এই আয়াত নাযিল হয় :

হে মুমিনগণ! মুশরিকরা তো অপবিত্র। সুতরাং তারা যেন এ বছরের পর মসজিদে হারামের কাছে না আসে।

— আল্-কুরআন, সূরা তাওবা, আয়াত : ২৮

আল্-কুরআনের এ আয়াত নাযিল হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আলী (রা.)-কে মক্কায় প্রেরণ করেন, যাতে তিনি এ ঘোষণা সকল হজ্জ বা তীর্থযাত্রীদের জানিয়ে দেন। সেমতে হযরত আবু বকর (রা.) আমীরে হজ্জ হিসাবে খুতবা পাঠ করেন এবং সকলকে হজ্জ্রে অনুষ্ঠান আদায়ের পদ্ধতি শিক্ষা দেন, আর হযরত আলী (রা.) সূরা বারা‘আতের ৪০টি আয়াত তেলাওত করে শুনান এবং ঘোষণা করেন :

১. মুসলমান ব্যতীত আর কোন ধর্মের অনুসারী জান্নাতে যাবে না।
২. এখন থেকে আর কেউ উলঙ্গ অবস্থায় কা‘বা শরীফ তাওয়াফ করতে পারবে না।
৩. এখন থেকে আর কোন অমুসলিম কা‘বা শরীফের হজ্জ আদায় করতে পারবে না।
৪. যাদের সাথে রাসূলুল্লাহ (স.) নির্দিষ্টকালের জন্য চুক্তি করেছেন, তা নির্ধারিত সময় পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। আর যাদের সাথে অনির্দিষ্ট কালের জন্য চুক্তি করেছেন, আজ থেকে ৪ মাস পর্যন্ত তাদের সময় দেয়া হলো, এরপর তাদের চুক্তি বাতিল বলে পরিগণিত হবে। [6]
নবূওতের তেইশ বছর - ৬৩৩ খৃষ্টাব্দ, ১০ম হিজরী, বয়স ৬৩ বছর।
বিদায় হজ্জ 

আল্লাহ্ তা‘য়ালা তাঁর দ্বীনের পূর্ণতা প্রদান করেন। ইসলামের প্রচার ও প্রসার চরম শিখায় পৌঁছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিয়ে আসা সত্য দ্বীনের প্রসার চারিদিকে ঘটে। এ সময় দলে দলে লোক চারদিক থেকে এসে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। রাসূলুল্লাহ (স.)-এর অনুসারীদের সংখ্যা হু হু করে বাড়তে থাকে। দূর দূরান্তের এলাকা পর্যন্ত কুফর ও শিকর থেকে মুক্ত হয়। আল্লাহর একত্ববাদ ও তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণার ধ্বনিতে সব দিক মুখরিত হয়ে উঠে।

রাসূলূল্লাহ (স.)-এর কথা ও কাজের মাঝে ইসলামের যাবতীয় বিধি-বিধান ও রীতিনীতি প্রচারিত ও প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। তিনি (স.) ৯ম হিজরীতে হযরত আবু বকর (রা.) ও হযরত আলী (রা.)-কে মক্কায় পাঠিয়ে ঘোষণা করান যে, এ পূণ্যভূমিতে আর কুফর ও শির্কের স্থান নেই এবং কাফির ও মুশরিকদের পদচারণা থেকে এ পূণ্যভূমি মুক্ত ও পবিত্র থাকবে। কারণ, সত্যের প্রদীপ প্রজ্বলিত হয়েছে, তাই অসত্যের আধার দূরীভূত হবেই। এখন সময় হলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পূর্ণাঙ্গ ইসলামী পদ্ধতিতে হজ্জ আদায় করে, তা সমস্ত জগতকে শিখিয়ে দেয়া। সেজন্য তিনি ১০ম হিজরীতে হজ্জ আদায় করার ইচ্ছা প্রকাশ করলে, সর্বত্র ঘোষিত হয় যে, আল্লাহর নবী হজ্জ করার জন্য মক্কায় যাবেন। ফলে চারদিক থেকে দলে দলে লোক তাঁর সাথে হজ্জে যাবার জন্য তৈরী হয়।

অবশেষে ১০ম হিজরীর ২৫শে যিলকাদ শনিবার তিনি লক্ষাধিক সাহাবীদের নিয়ে মদীনা থেকে রওনা হন এবং নয় দিনে পথ অতিক্রম করে তিনি ১০ম হিজরীর ৪ঠা যিলহজ্জ রোববার মক্কায় প্রবেশ করেন। এ সফরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবিত ৯ জন স্ত্রীর সবাই শরীক হন এবং তাঁর একমাত্র জীবিত কন্যা ফাতিমা (রা.)ও তাঁর সাথে যান। হযরত আলী (রা.) ইয়ামানে ছিলেন, তিনিও মক্কায় এসে রাসূলূল্লাহ (স.)-এর সাথে মিলিত হন। মক্কায় এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজ্জ আদায় করেন এবং লোকদের হজ্জের প্রতিটি বিধান শিক্ষা দেন।

বিদায় হজ্জের ভাষণ 

এরপর তিনি আরাফার ময়দানে সোয়া লক্ষ সাহাবীকে সম্বোধন করে বলেন : “হে লোক সকল! আমি যা বলি তা শোন! হয়তো এ বছরের পর আর তোমাদের সাথে এখানে আমার দেখা নাও হতে পারে। হে জনমন্ডলী! তোমাদের একের জান ও মাল অন্যের জন্য এরূপ নিষিদ্ধ, যেরূপ এ মাস ও দিনটি নিষিদ্ধ। জাহেলী যুগের সকল রীতিনীতি আমার পদতলে পিষ্ট হলো। সুদের ব্যাপারে তিনি বলেন : তোমরা শুধু মূলধন নিতে পারবে। সর্বপ্রথম আমি আব্বাস ইবন আব্দুল মোত্তালেবের সুদ বাতিল করলাম। জাহেলী যুগের সকল খুনের জন্য ক্ষমা ঘোষণা করলাম। তাই আমি সর্ব প্রথম রবীআ ইবনে হারেছ ইবনে আব্দুল মোত্তালেবের হত্যার যে দায় বনী হুযায়েফদের ঘাড়ে রয়েছে, আমি তা থেকে তাদের মুক্তি দিলাম।

এরপর তিনি স্বামী-স্ত্রীর হক সম্পর্কে স্বামীদের সতর্ক করে দিয়ে বলেন :

তাদের উপর তোমাদের যেমন হক আছে, তোমাদের উপর তাদেরও তেমন হক আছে। তোমরা সব সময় স্ত্রীর অধিকার সংরক্ষণের ক্ষেত্রে আল্লাহ্কে ভয় করবে।

হে আমার উম্মতগণ! আমি তোমাদের কাছে যা রেখে যাচ্ছি তা তোমরা দৃঢ়ভাবে ধারণ করবে; তাহলে তোমরা কখনো গুমরাহ ও পথভ্রষ্ট হবে না। আর তা হলো- আল্লাহর কুরআন এবং তাঁর নবীর সুন্নাহ্। নিশ্চিত জেনো, আমার পর আর কোন নবী নেই। আমিই শেষ নবী। আজ যারা এখানে উপস্থিত আছ, তারা অনুপস্থিত সব মুসলমানের কাছে আমার এ বাণী পৌঁছে দেবে।

এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সমবেত সকলকে উদ্দেশ্য করে প্রশ্ন করেন :

আমি কি তোমাদের কাছে আল্লাহর বাণী পৌঁছে দিয়েছি?

তারা জবাব দেন : হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ!

তখন তিনি (স.) আকাশের দিকে তাকিয়ে বলেন : হে আল্লাহ্! তুমি সাক্ষী থাকো।”

এ সময় এখানে রাসূলুল্লাহ (স.)-এর উপর এ আয়াত নাযিল হয় :

আজ আমি তোমাদের জন্য দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং আমার নিয়ামতকে তোমাদের উপর পূর্ণ করে দিলাম; আর আমি ইসলামকে তোমাদের দ্বীন হিসাবে মনোনীত করলাম।

— আল্-কুরআন, সূরা আল্-মায়িদা, আয়াত : ৩

এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করুন স্নেহমাখা দৃষ্টিতে উপস্থিত জনসমুদ্রের প্রতি তাকিয়ে বলেন :

বিদায়! বন্ধুগণ, বিদায়!!

এরপর ১০ই যিলহজ্জ তিনি (স.) মীনায় পৌঁছে কুরবানী করেন। তারপর তিনি মাথা মুন্ডন করেন। অবশেষে তিনি বিদায়ী তাওয়াফ শেষ করে যিলহজ্জ মাসের শেষ দিকে মদীনার দিকে রওয়ানা হন এবং যথাসময়ে মদীনায় প্রত্যাবর্তন করেন।[7]

তথ্যসূত্র

  1. আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া, সীরাতে হালবিয়া, ইবনে হিশাম
  2. সীরাতে হালবিয়া, ইবনে হিশাম, ইবনে সা‘দ
  3. তবূক অভিযানই রাসূলুল্লাহ (স.)-এর জীবনের শেষ যুদ্ধ অভিযান। তিনি সর্বমোট ২৭টি যুদ্ধে যোগদান করেন এবং ৯টিতে সক্রীয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।
  4. ইবনে জারীর, তাবারী, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া
  5. তারীখুল কামিল, ইবনে জারীর
  6. সহীহুল বুখারী ২য় খন্ড পৃ. ৬২৬; সহীহ মুসলিম, ১ম খন্ড, পৃ. ৪৩৫।
  7. ইবনে জারীর, তাবারী; সীরাতে হালবিয়া, আল্ বিদায়া ওয়ান নিহায়া
  • বিশ্বনবীঃ সন-ভিত্তিক জীবন তথ্য! (লেখকঃ ডক্টর আ.ফ.ম. আবু বকর সিদ্দীক)