হুদায়বিয়ার সন্ধি থেকে খায়বার বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত

From Sunnipedia
Revision as of 19:41, 3 November 2015 by Khasmujaddedia1 (Talk | contribs)

(diff) ← Older revision | Latest revision (diff) | Newer revision → (diff)
Jump to: navigation, search
নবূওতের উনবিংশ বছর - ৬২৯ খৃষ্টাব্দ, ৬ষ্ঠ হিজরী, বয়স ৫৯ বছর।
হুদায়বিয়ার সন্ধি 

একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীদের বলেন :

আমি স্বপ্নে দেখেছি, আমি তোমাদের নিয়ে উমরাহ হজ্জ পালন করছি।

তাঁর সাথে যারা যেতে চায়, তিনি তাদের প্রস্তুত হতে বলেন এবং ষষ্ঠ হিজরীর যিলকাদ মাসে তিনি ১৫০০ (পনের শত) সাহাবা নিয়ে মক্কা রওয়ানা হন। তাঁরা যুল হুলায়ফায় পৌঁছে উমরার নিয়তে ইহ্রাম বাঁধেন। এ সময় রাসূলুল্লাহ (স.)-এর সাথে ৭০টি কুরবানীর উট ছিল। এ খবর মক্কায় পৌঁছলে কুরায়েশরা বাঁধা দেয়ার জন্য তৈরী হয়।

কুরায়েশদের বাঁধা দান 

মক্কার কুরায়েশরা রাসূলুল্লাহ (স.)-এর অগ্রযাত্রা প্রতিহত করার জন্য খালিদ ইবনে ওলীদকে পাঠায়, কিন্তু সে বিশাল মুসলিম বাহিনীর ভয়ে মক্কায় পালিয়ে যায়। তারা পরামর্শ করে বুদায়েল ইবনে ওরাকাকে পাঠায় মুসলমানদের উদ্দেশ্য জানার জন্য।

সে রাসূলুল্লাহ (স.)-কে জিজ্ঞাসা করে : আপনি কি জন্য এসেছেন?”

জবাবে তিনি (স.) বলেন : “আমি যুদ্ধ করতে আসিনি, বরং বায়তুল্লাহ যিয়ারত করার জন্য এসেছি। তুমি কুরায়েশদের বল, তারা যেন আমাদের মক্কা প্রবেশে বাঁধা না দেয়।”

বুদায়েল ফিরে গিয়ে কুরায়েশদের কাছে এ কথা বললে, তারা বলে : “তিনি যুদ্ধ করতে আসুন বা না আসুন, আমরা কোন অবস্থাতেই তাঁকে মক্কায় প্রবেশ করতে দেব না।”


বায়‘আতে রিদ্ওয়ান 

অবশেষে রাসূলুল্লাহ (স.) তাদের আসার কারণটি ভালভাবে বুঝাবার জন্য হযরত ‘উছমান (রা.)-কে পাঠান। তারা তাঁর কথা শুনে বলে :

তুমি যদি কা‘বা ঘর যিয়ারত করতে চাও, তো করতে পার। কিন্তু মুহাম্মদ (স.)-কে আমরা মক্কায় ঢুকতে দেব না।

হযরত উছমান (রা.) এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। এ সময় গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, কুরায়েশরা হযরত উছমানকে হত্যা করে ফেলেছে। এ খবর পেয়ে রাসূলুল্লাহ (স.) খুবই মর্মাহত ও ক্ষুব্ধ হলেন এবং তিনি সাথে সাথে কুরায়েশদের সাথে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। উদ্দেশ্য, হযরত উছমান হত্যার বদলা নেয়া। তিনি সাহাবাদের বলেন :

আমরা যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের সাথে যুদ্ধ করে ‘উছমানের হত্যার প্রতিশোধ না নেব, ততক্ষণ মদীনায় ফিরে যাব না।

তখন তিনি সাহাবাদের তাঁর হাতে জিহাদের বায়‘আত নেয়ার আহবান জানান এবং এ জন্য একটি গাছের নীচে বসেন। সাথে সাথে সকল সাহাবা এসে তাঁর হাতে হাত রেখে জিহাদের বায়‘আত গ্রহণ করেন। এ বায়‘আতই ‘বায়‘আতে রিদওয়ান’ নামে খ্যাত। (দ্র: যুরকানী, আল্ বিদায়া ওয়ান নিহায়া)।

সন্ধি চুক্তি সম্পাদন 

তৃতীয় দিনে হযরত ‘উছমান (রা.) ফিরে আসেন। মুশরিকরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে সাহাবাদের জিহাদের বায়‘আতের খবর পেয়ে খুবই ঘাবড়ে যায়। ফলে, তারা তাঁর সাথে সন্ধি করার সিদ্ধান্ত নেয়। সন্ধির শর্ত ছিল এরূপ :

১. মুসলমানগণ এবারকার মত ‘উমরাহ না করে মদীনায় ফিরে যাবে।
২. আগামী বছর তারা ‘উমরাহ করতে পারবে, কিন্তু তিন দিনের বেশী মক্কায় অবস্থান করতে পারবে না।
৩. ‘উমরাহ করার সময় তারা যুদ্ধাস্ত্র নিয়ে আসতে পারবে না। শুধু কোষাবদ্ধ তরবারি আনতে পারবে, যা খুলতে পারবে না।
৪. মক্কায় যে সমস্ত মুসলমান আছে, মুহাম্মদ (স.) তাদের মদিনায় নিয়ে যেতে পারবে না।
৫. মদীনার কোন লোক মক্কায় আসলে, তাকে মুহাম্মদের কাছে ফেরত দেয়া হবে না; কিন্তু মক্কার কোন লোক যদি মদীনায় গিয়ে আশ্রয় নেয়, তবে তাকে ফেরত দিতে হবে।
৬. আরবদের যে কোন গোত্র কুরায়শদের সাথে অথবা মুহাম্মদের সাথে স্বাধীনভাবে সন্ধিসূত্রে আবদ্ধ হতে পারবে।
৭. দশ বছরের জন্য কুরায়েশ ও মুসলমানদের মধ্যে যুদ্ধ বিগ্রহ স্থগিত থাকবে। সন্ধিপত্র লেখা হলে উভয়পক্ষ তাতে স্বাক্ষর করে। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাথে নেয়া কুরবানীর পশু যবেহ করেন এবং মাথা মুন্ডন করে ফেলেন।
‘ফত্হ মুবীন’ 

এরপর তিনি (স.) হুদায়বিয়া থেকে মদীনায় ফিরে যান। পথিমধ্যে বিজয়ের সংবাদবাহী ‘সূরা ফাতাহ্’ নাযিল হয়। আল্লাহ্র বাণী :

নিশ্চয় আমি আপনাকে প্রকাশ্য বিজয় দান করেছি।

— আল্-কুরআন, সূরা ফাত্হ, আয়াত : ১

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন সাহাবীদের কাছে এ আয়াত তেলাওত করে শুনান, তখন সবাই খুশী হন।

দিকে দিকে গেল দ্বীনের আহবান 

হুদায়বিয়ার সন্ধির পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরায়েশদের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হন। এ সময় তিনি ইসলামের বাণী সমস্ত দুনিয়ায় ছড়িয়ে দেয়ার মনস্থ করেন। তিনি তৎকালীন দুনিয়ার বৃহৎ শক্তিগুলোর কাছে দ্বীনের দাওয়াতপত্র নিয়ে দূত পাঠাবার সিদ্ধান্ত নেন। এ জন্য তিনি বড় বড় সাম্রাজ্যের রাজা-বাদশাহদের কাছে চিঠি লিখেন। তাতে লেখা হলো :

ইসলাম গ্রহণ করে আমার নবূওত মেনে নাও। তাহলে আল্লাহ্ পাক তোমাকে সার্বিক বিপদাপদ থেকে মুক্ত রাখবেন।

একটি চিঠি লেখা হলো- রোম সম্রাট হেরাক্লিয়াসের কাছে। তার সাম্রাজ্য এতো বিশাল ছিল যে, অন্যান্য রাজা-বাদশাহরা তার ভয়ে ভীত থাকতো। দ্বিতীয় পত্র পাঠান তিনি (স.) পারস্য সম্রাট খসরুর কাছে। তারও বিশাল সাম্রাজ্য ছিল। তাকেও সব রাজা-বাদশাহরা ভয় করতো। তিনি আরেকটি চিঠি পাঠান। মিশর অধিপতি মুকাত্তকীসের কাছে। অপর একটি চিঠি লিখেন তিনি (স.) বাহ্রাইনের বাদশা মুন্যির ইবনে সাওয়ার কাছে। তেমনি তিনি (স.) আরেকটি চিঠি লেখেন আবিসিনিয়ার বাদশা নাজ্জাশীর কাছে।

চিঠির প্রতিক্রিয়া 

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চিঠি পাওয়ার পর রোমক সম্রাট হেরাক্লিয়াস খুবই সন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। তিনি তা তাঁর চোখে ও মাথায় বুলান এবং এ সত্যতা মেনে নেন যে, রাসূলুল্লাহ (স.)-ই পূর্ববর্তী ঐশীগ্রন্থসমূহে বর্ণিত সত্য রাসূল। এরপরও তিনি ইসলাম গ্রহণ করেননি। কারণ, তিনি ভয় পান যে, মুসলমান হলে তার স¤প্রদায় ক্ষেপে গিয়ে তাকে সিংহাসনচ্যুত করবে।

মিশরের সম্রাট মুকাত্তকীস রাসূলুল্লাহ (স.)-এর পত্রকে যথেষ্ট সম্মান প্রদর্শন করেন। কিন্তু তিনি ইসলাম গ্রহণ করেননি। তবে তিনি রাসূলুল্লাহ (স.)-এর জন্য বিশেষ ধরণের কিছু হাদিয়া পাঠান। যাতে ছিল দুটি বাঁদী, একটি খচ্চর এবং কিছু মূল্যবান কাপড়।

বাহ্রাইনের বাদশাহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পত্র পেয়ে তা সসম্মানে গ্রহণ করেন এবং সাথে সাথে ইসলাম কবুল করে মুসলমান হয়ে যান।

পারস্য সম্রাট খসরু রাসূলুল্লাহ (স.)-এর চিঠি পেয়ে ক্ষিপ্ত হয় এবং সে তা ছিঁড়ে টুকরা টুকরা করে ফেলে দেয়। এরপর সে তার গভর্নরকে নির্দেশ দেয় রাসূলুল্লাহ (স.)-কে গ্রেফতার করে তার নিকট উপস্থিত করতে। গভর্নর বাযানের দু’জন দূত রাসূলুল্লাহ (স.)-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে তাদের ইচ্ছা প্রকাশ করলে, তিনি (স.) বলেন : খসরু পারভেজ? সে তো বেঁচে নেই। যাও, বাযানকে গিয়ে বল, শীঘ্রই পারস্যের রাজধানী ইসলামের রাজ্যভুক্ত হবে।

উল্লেখ্য যে, পারস্য সম্রাট খসরু রাসূলুল্লাহ (স.)-এর পত্র ছিঁড়ে ফেলেছে, এ খবর পেয়ে তিনি (স.) বলেন :

হে আল্লাহ্! তুমি তার সাম্রাজ্যকে টুকরা টুকরা করে দাও।

ফলে, তা-ই হয়।

আবিসিনিয়ার সম্রাট নাজ্জাশী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওযাসাল্লামের পত্র দেখা মাত্র তা গ্রহণের জন্য দাঁড়িয়ে যান। এরপর পত্রখানা প্রথমে মাথায় রাখেন, তারপর চোখে লাগান, পরে তাতে চুমু খান এবং পত্র পাঠের সাথে সাথে ইসলাম কবুল করে পড়ে নেন : “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ।” রাসূলুল্লাহ (স.) নাজ্জাশীর কাছে দু’খানা পত্র প্রেরণ করেন। তাঁর (স.) পত্র বাহক ছিলেন হযরত আমর ইবন উমাইয়া যুমরী (রা.)। রাসূলুল্লাহ (স.)-এর প্রথম পত্র ছিল ইসলামের দাওয়াত সম্বলিত। আর অপর পত্রটিতে দু’টি বিষয় ছিল :

১. একটি ছিল, সেখানকার মুহাজির মুসলমানদের মদীনায় প্রেরণ করা; আর-
২. দ্বিতীয়টি ছিল, আবু সুফিয়ানের কন্যা উম্মে হাবীবার সম্মতিক্রমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে তাঁর বিয়ে সম্পন্ন করা, যা সম্রাট নাজ্জাশী যথাযথভাবে সম্পন্ন করেন।

রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দ্বিতীয় নির্দেশ পালনের জন্য সম্রাট দু’টো জাহাজের ব্যবস্থা করে সেখানকার মুহাজির মুসলমানদের মদীনায় পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। এ কাফেলায় উম্মুল মু’মেনিন হযরত উম্মে হাবীবা (রা.)ও ছিলেন। তাঁরা মদীনায় পৌঁছলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কিরাম তাঁদের আন্তরিক অভ্যর্থনা জানান।

তথ্যসূত্র

  • বিশ্বনবীঃ সন-ভিত্তিক জীবন তথ্য! (লেখকঃ ডক্টর আ.ফ.ম. আবু বকর সিদ্দীক)