আল্লাহর দর্শন ও সালাফ আস্ সালেহীনের মধ্যকার মতপার্থক্য

From Sunnipedia
Jump to: navigation, search
মেরাজ ও আল্লাহ্‌ দর্শন


  • আল্লাহর দর্শন ও সালাফ আস্ সালেহীনের মধ্যকার মতপার্থক্য

মহানবী (দ:)-এর সীরাহ-বিষয়ে লেখা সেরা গ্রন্থ ইমাম কাজী আয়ায (রহ:)-এর ‘শেফা শরীফ’ হতে নিচের সম্পূর্ন লেখাটি তুলে ধরা হলো । হযরত ইমাম নিজ গ্রন্থে লেখেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম কর্তৃক তাঁর প্রভু খোদাতা’লাকে দেখার ব্যাপারে প্রাথমিক যুগের মুসলমানদের মধ্যে মতভেদ ছিল।

সাইয়্যেদাহ আয়েশা (রা:) একে প্রত্যাখ্যান করেন; আর যখন হযরত মাসরুখ (রা:) তাঁকে প্রশ্ন করেন: ‘হে উম্মুল মো’মেনীন (বিশ্বাসীদের মা)! মহানবী (দ:) কি তাঁর প্রভু আল্লাহ পাককে (মে’রাজ রাতে) দেখেছিলেন?’

তখন তিনি উত্তর দেন: ‘তুমি যা জিজ্ঞেস করেছো, তাতে আমার মাথার চুল সব খাড়া হয়ে গিয়েছে।’ অতঃপর তিনি তিনবার বলেন, ‘তোমাকে এ কথা যে ব্যক্তি বলেছে, সে মিথ্যেবাদী।’ এরপর তিনি কুরআনে করীম থেকে তেলাওয়াত করেন নিম্নের আয়াত - “চক্ষুসমূহ তাঁকে (খোদাকে) আয়ত্ত (মানে উপলব্ধি) করতে পারে না এবং সমস্ত চক্ষু তাঁরই আয়ত্তে রয়েছে; আর তিনি-ই অতীব সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক পরিজ্ঞাত” (৬:১০৩)।

হযরত আয়েশা (রা:) যা বলেছিলেন, তার সাথে কিছু মানুষ একমত হয়েছেন এবং এটি-ও সর্বজনবিদিত যে সর্ব-হযরত ইবনে মাসউদ (রা:) ও আবূ হোরায়রা (রা:)-ও অনুরূপ কথাবার্তা বলেছিলেন; তাঁরা বলেছিলেন যে মহানবী (দ:) জিবরীল (আ:)-কেই দেখেছিলেন। তবে এই বিষয়ে এখতেলাফ তথা মতপার্থক্য বিদ্যমান।

হাদীসশাস্ত্র বিশারদ, ফুকাহা (ফকীহবৃন্দ) ও ধর্মতত্ত্ববিদদের জামা’আত (বড় দলটি) (ওপরের) ওই বক্তব্য এবং মহানবী (দ:) কর্তৃক আল্লাহতা’লার দর্শন লাভকে নাকচকারী সিদ্ধান্তটি প্রত্যাখ্যান করেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন:

মহানবী (দ:) স্বচক্ষে আল্লাহকে দেখেছিলেন;

অপরদিকে হযরত আতা (রা:) তাঁর কাছ থেকেই বর্ণনা করেন যে হুযূর পূর নূর (দ:) নিজ অন্তর (চক্ষু) দ্বারা আল্লাহকে দেখেছিলেন। হযরত আবূল আলিয়্যা বলেন যে

তিনি অন্তর (ও মস্তিষ্ক) দ্বারা দু’বার তাঁর প্রভুকে দেখেছিলেন।

ইবনে এসহাক উল্লেখ করেন যে

হযরত ইবনে উমর (রা:) তাঁকে হযরত ইবনে আব্বাস (রা:)-এর কাছে প্রেরণ করেন এই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে - মহানবী (দ:) নিজ প্রভু খোদাতা’লাকে দেখেছেন কি না। তিনি জবাব দেন, “হ্যাঁ।”

এ ব্যাপারে সর্বাধিক জ্ঞাত অভিমত হলো নবী করীম (দ:) নিজ চোখে খোদাতা’লাকে দেখেছেন। এটি হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) হতে বিভিন্ন সূত্রে রেওয়ায়াত করা হয়েছে। তিনি বলেন যে আল্লাহতা’লা হযরত মূসা (আ:)-কে (এককভাবে) বাছাই করেছিলেন তাঁর সাথে কালাম (আলাপ) করার জন্যে; হযরত ইবরাহীম (আ:)-কে ঘনিষ্ঠ বন্ধু (খলীল) হওয়ার জন্যে; আর মহানবী (দ:)-কে তাঁরই দর্শন নিজ চোখে প্রত্যক্ষ করার জন্যে।

কুরঅান মজীদেই বিধৃত হয়েছে এর সমর্থনে প্রামাণ্য দলিল:

তবে কি তোমরা তাঁর সাথে তিনি যা দেখেছেন তা নিয়ে বিতর্ক করছো? এবং তিনি তো ওই জ্যোতি দু’বার দেখেছেন।”

— ৫৩:১২-১৩; মুফতী আহমদ এয়ার খান সাহেব কৃত ‘নূরুল এরফান’

আল-মাওয়ার্দী বলেন:

এ কথা বলা হয় যে আল্লাহ পাক তাঁর দর্শন ও কালাম তথা কথপোকথনকে হযরত রাসূলে করীম (দ:) ও হযরত মূসা (আ:)-এর মধ্যে ভাগ করে দেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া আলেহি ওয়া সাল্লাম দু’বার আল্লাহতা’লাকে দেখেন এবং দুবার মূসা (আ:)-এর সাথে কথা বলেন।

আবূল ফাতহ রাযী ও আবূল্ লায়েস্ সামারকন্দী বর্ণনা করেন সর্ব-হযরত কাআব আল-আহবার (রহ:) ও আবদুল্লাহ ইবনে হারিস (রহ:) হতে; তাঁরা বলেন যে হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) ও কাআব (রহ:) এ ব্যাপারে একমত হয়েছেন। হযরত ইবনে আব্বাস (রা:) বলেন:

আমরা, বনূ হাশিম গোত্র, বলি যে মহানবী (দ:) তাঁর প্রভু খোদাতা’লাকে দু’বার দেখেছিলেন। হযরত কাআব (রহ:) বলেন: আল্লাহু আকবর, যতোক্ষণ না পর্বতমালা তাঁর (কথার) প্রতিধ্বনি করেছিল।

তিনি আরও বলেন,

আল্লাহ পাক তাঁর দর্শন ও কালাম তথা কথপোকথনকে হযরত রাসূলে করীম (দ:) ও হযরত মূসা (আ:)-এর মধ্যে ভাগ করে দেন।

শারিক বর্ণনা করেন যে হযরত আবূ যর্র (রা:) ওপরোক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন:

মহানবী (দ:) তাঁর প্রভু খোদাতা’লাকে দেখেছিলেন।

(এসলাফ-বৃন্দের অন্যতম) ইমাম সামারকন্দী (রহ:) সর্ব-হযরত মোহাম্মদ বিন কা’আব আল-কুরদী (রহ:) ও রাবিউ’ ইবনে আনাস (রহ:) হতে বর্ণনা করেন যে রাসূলুল্লাহ (দ:)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: আপনি কি আপনার প্রভুকে দেখেছেন? তিনি জবাবে বলেন: আমি আমার অন্তর (চক্ষু) দ্বারা তাঁকে দেখেছি, কিন্তু চোখ দ্বারা দেখিনি | এই এসনাদ নির্ভরযোগ্য নয়, যেটি মহানবী (দ:) পর্যন্ত ফেরত পৌঁছেনি; অধিকন্তু, মহানবী (দ:) যে স্বচক্ষে আল্লাহতা’লাকে দেখেছিলেন, তা দলিল দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

আমরা আহলুস্ সুন্নাহভুক্ত মুসলমানবৃন্দ ‘সালাফী’দের মতো মৌলিক লিপিকে জাল করি না, আর তাই আমাদের সততা সেগুলোকে পরিবর্তন না করেই উপস্থাপনের দাবি আমাদের কাছে পেশ করে থাকে]। মালেক ইবনে ইউখামির (রহ:) বর্ণনা করেন হযরত মু’য়ায ইবনে জাবাল (রা:) হতে; তিনি মহানবী (দ:) হতে বর্ণনা করেন, যিনি এরশাদ ফরমান:

আমি আমার প্রভু খোদাতা’লাকে দেখেছি এবং তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘ওহে মোহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম), ফেরেশতাকুল কী বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছে?’

— আল-বোখারীর সূত্রে একদম সহীহ হাদীস

আবদুর রাযযাক ইবনে হামমাম (ইমাম বোখারীর শায়খ ও ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের মতে সেরা মোহাদ্দীস) বর্ণনা করেন যে ইমাম হাসান বসরী (রহ:) আল্লাহর নামে শপথ করে বলতেন, মহানবী (দ:) (মে’রাজ রাতে) আল্লাহকে দেখেছিলেন। [ইমাম কাজী আয়ায প্রণীত ‘শেফা শরীফ’ গ্রন্থের উদ্ধৃতি এখানে শেষ হলো]

তথ্যসূত্র