ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) এর কর্ম জীবন

From Sunnipedia
Jump to: navigation, search
সংক্ষেপে ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)

  • ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) এর কর্ম জীবন

উস্তাদ হাম্মাদ (রহঃ) জীবিত থাকা কালীন অবস্থায় ইমাম সাহেব ইস্তিহাদের স্তরে উপনীত হলেও তিনি কার্যত তা করেন নি । ১২০ হিজরি তে তার ইন্তিকালের পর বাগদাদে তিনি উস্তাদের স্থলাভিষিক্ত হন । তিনি শিক্ষা দানের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে উপলব্ধি করলেন যে, মুসলিম মিল্লাতের জন্য শরীয়তের বিধি বিধানের একটি সংকলন থাকা আবশ্যক । তখন পর্যন্ত লিখিত আকারে প্রয়োজনীয় বিধিমালা প্রণীত হয় নাই । তিনি স্থির করলেন যে, কুরআন ও হাদিস থেকে মুসলমানদের দৈনন্দিন জীবনের মাসাআলা সমুহ বের করে একত্রিত করবেন । যাতে প্রয়োজনের সময় সহজে সমস্যার সমাধানের নির্দেশ লাভ করা যায় । এই কাজ খুব সহজ সাধ্য ছিল না । তিনি এই কাজ সম্পন্ন করার জন্য দৃঢ় সংকল্প করলেন । আল্লাহ্‌ তায়ালা তাঁকে মুসলিম মিল্লাতের এই দায়িত্ব পালনের যোগ্য করে প্রস্তুত করেছিলেন ।

রিসালাতের জামানা ও খুলাফায়ে রাশেদিনের জামানা থেকেই ফিকাহ ইসলামীর প্রচলন হয় । কুরআন ও হাদিস থেকে সাহাবায়ে কিরাম ফিকাহের প্রস্নের উত্তর দিতেন । সাহাবাদের মধ্যে এই ব্যাপারে প্রসিদ্ধ ছিলেন হযরত আলী (রাঃ) , হযরত উসমান (রাঃ) , হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) , হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) । এনাদের মধ্যে হযরত আলী (রাঃ) ছিলেন মাস আলা ইস্তিম্বাতের দিক দিয়ে অগ্রণী । হযরত উমর (রাঃ) বলেন,

আল্লাহ্‌ যেন এমন না করেন যে, কোন কঠিন মাসআলা আমাদের সামনে আসবে আর আলী (রাঃ) আমাদের মধ্যে থাকবে না ।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন,

কোন মাস’আলা তে আমি হযরত আলী (রাঃ) এর ফতোয়া পেলে অন্য কিছুর প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না ।

ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) এর সমকাল পর্যন্ত উল্লেখিত সাহাবা কিরাম ও অন্যান্য ফিকাহ বিদ দের মাধ্যমে কুরআন ও হাদিস থেকে অনেক মাস’আলা সংগ্রহ করা হয়েছিলো । কিন্তু তা ছিল অবিন্যস্ত ও অলিখিত । ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) চাইলেন, সালফে সালেহিন দের পথ ধরে পূর্ণা ঙ্গ ফিকাহ বিন্যস্ত করতে । তিনি এই জন্য তাঁর শাগরেদ দের মধ্যে থেকে কয়েকজন বিজ্ঞ ও দক্ষ ব্যাক্তির সমন্বয়ে একটি পরিষদ গঠন করলেন । যাদের তিনি এই দায়িত্তে নিয়োজিত করেছিলেন , তাঁদের মধ্যে উল্লেখ যোগ্য ছিলেন , কাজী ইউসুফ ( রহঃ) , দাউদ তাই (রহঃ) , মুহাম্মদ শায়বানি ( রহঃ) ও জুফার ( রহঃ) । এনারা ১২১ হিজরি থেকে কাজ আরম্ভ করেন । এবং ১৫০ হিজরি তে ইমাম সাহেবের মৃত্যু পর্যন্ত তা চালু রাখেন । এই সময়ের মধ্যে ফিকহি মাস’আলার এক সুবৃহৎ সংকলন তৈরি হয়ে যায় । যাতে তাহারাতের অধ্যায় থেকে মিরাছের অধ্যায় পর্যন্ত শামিল করা হয় । এতে ইবাদতের মাস’আলা ছাড়াও দিওয়ানি , ফৌজদারি দণ্ডবিধি , লাগান, মালগুজারি , শাহাদত , চুক্তি, উত্তরাধিকার, অসিওত ইত্যাদি নানাবিধ বিষয় সংক্রান্ত আইন কানুন সন্নিবেশিত হয় । ঐতিহাসিক সুত্রে এই সংকলনে মাস’আলার সংখ্যা ১২ হাজারের অধিক । হারুন অর রশিদের বিশাল সম্রাজ্জের সর্বত্র বিচার আচার এর অনুকরণে করা হতো । তাঁর পরবর্তী কালেও এই পদ্ধতিই প্রচলিত ছিল । হানাফি ফিকাহ , কুরআন হাদিসের আলোকে মানুষের মনস্তাত্তিক ও ব্যাবহারিক প্রয়োজনের নিরিখে প্রণীত বিধায় তা কালজয়ী হয়েছে । বর্তমানে বিশ্বের মুসলিম জনগোষ্ঠীর অর্ধেকের বেশি ফিকাহ হানাফি অনুসরণ করেন । বিশেষ করে বাংলাদেশ , পাকিস্তান , ভারত , আফগানিস্তান , চীন , মধ্য এশিয়া , তুরস্ক , ইরাক , সিরিয়া তে ফিকাহ হানাফি জনপ্রিয় । ইমাম আজম আবু হানিফা ( রহঃ) এর কর্ম জীবনের উল্লেখ যোগ্য অবদানের মধ্যে ফিকাহ শাস্ত্রের সংকলন ও বিন্যাস অন্য তম শ্রেষ্ঠ অবদান । মুসলিম মিল্লাত চিরদিন তাঁর এই অবদানের কথা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করবে ।

ইমাম আবু হানিফার (রহঃ) উস্তাদ গণের মধ্যে ৭ জন ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর সাহাবা এবং ৯৩ জন ছিলেন তাবেঈন । চরিতকারদের মতে তাঁর উস্তাদের সংখ্যা চার হাজারের অধিক । তিনি সেই সময়কার যাবতীয় জ্ঞান আহরন করেছিলেন । এমন কোন ক্ষেত্র ছিল না, যেখানে তিনি স্বাচ্ছন্দ্যে পদচারনা করতে পারতেন না । প্রকৌশলী ও প্রযুক্তিবিদদের মধ্যে তাঁর স্থান ছিল সবার উপরে । বাগদাদ কে মুসলিম সম্রাজ্জ্যের রাজধানী র উপযোগী করে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান চিরদিন ভাস্বর হয়ে থাকবে । জ্ঞান আহরন ও বিতরণের ক্ষেত্রে তিনি যে নজির স্থাপন করে গেছেন, তা রীতিমত বিস্ময়কর । ব্যাবহারিক জীবনের জন্য ফিকাহ'র মাস’আলা সংগ্রহ সংকলন করে একদিকে যেমন তিনি মুসলিম মিল্লাতের একটি অভাব পূরণ করেন । ঠিক তেমনি এলমে কালামের ভিত্তি রচনা করে আর একটি প্রয়োজন মেটান । ফিকাহের ক্ষেত্রে তাঁর পদ্ধতি হানাফি মাজহাব এবং কালামের ক্ষেত্রে মাতুরিদিয়া মাজহাব হিসেবে খ্যাত । ইমাম শাফেঈ (রহঃ) বলেন,

সকল মানুষ তিন জনের অনুগামী । তাফসীরে মুকাতিল ইবনে সুলাইমানের ; কবিতায় জুহাইর ইবনে আবু সুল মার এবং কালামের ক্ষেত্রে আবু হানিফা (রহঃ) ।

— ইবনে খাল্লিকানঃ অফাইয়াত ৪/৩৪১

ইবনে কাছির “ আল বিদায়া অয়ান নিহায়া” গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে , ইমাম শাফেঈ বলেছেনঃ

যে কেউ ফিকাহ জানতে ইচ্ছা করে , সে আবু হানিফার (রহঃ) মুখাপেক্ষী ।

— আল বিদায়া অয়ান নিহায়া, ১০/১০৭

তথ্য সুত্র

  • আল আশ’আরীঃ আল মালাকাত , ১/ ১৩৮-১৩৯
  • ইবনে নদিমঃ আল ফিহ রস্তি, ২০১
  • ইবনে আব্দিল বার – আল ইন তিকা , ১২১ -১৭৫
  • ইবনুল কাছির – আল লুবাব , ১/৩২৫
  • ইবনে কাছির – আল বিদায়া অয়ান নিহায়া, ১০/১০৭
  • ইবনে খাল্লিকান – আল অফাইয়াত ( বুলাক ), ২/২১৫-২১৯
  • ইবনে তুগরী বুরদি – আন নুজুম আজ জাহিরা , ২/১২-১৫
  • আল ফাশারী – আল যাওয়া হির , ১/২৬-৩২
  • আল খাতিব – তারিখ বাগদাদ , ১৩/ ৩২৩-৪৫৪
  • আল ইয়া ফিঈ – মারায়াতুল জিনান , ১/৩০৯ -৩১২
  • আজ জাহাবি- তাজকিরাতুল হুফফাজ , ১৬৮-১৬৯
  • আশ শিরাজি – তাবাকাত আল ফুকাহা, ৬৭-৬৮
  • ডঃ এ কে এম আইয়ুব আলী – আকিদাতুল ইসলাম , ৮৬- ২৫৯
  • মুহাম্মদ শহিদুল্লাহঃ codification of muslim law: 1950-1955, pp 369-378