ইরাকি বিদ্রোহীদের মদদ দিচ্ছে কে? - (১৭ আগষ্ট ২০১৪)

From Sunnipedia
Jump to: navigation, search
মসুল দখলের পর শহরটিতে আইএস যোদ্ধাদের অবস্থান

মসুল দখলের পর শহরটিতে আইএস যোদ্ধাদের অবস্থানকোন গল্পটা বেশি বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়—আইএসের (আইসিস-এর নতুন নাম) বিদ্রোহে ইরানের নীতির প্রতিফলন, নাকি এই সুন্নি বিদ্রোহীদের ইরানের প্রতিপক্ষ সৌদি আরবের সঙ্গে সংযোগ? জুনের শেষ সপ্তাহে আইএস যোদ্ধারা ইরাকের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর মসুল দখল করেছে। এই শহরের চারপাশে অনেক তেলক্ষেত্র আছে। এর আগে তারা উত্তর-পূর্ব সিরিয়ার তেলসমৃদ্ধ এলাকাগুলোতেও নিজেদের আধিপত্য বাড়িয়েছে। তখন থেকেই বিশ্বের সংবাদমাধ্যমগুলো এই সংগঠনটির সামরিক সফলতার ঠিকুজি সন্ধান শুরু করেছে। এটা ধরে নেওয়া হচ্ছে যে ইরাকের সাবেক নুরি আল মালিকি সরকারের কর্মসূচির ব্যাপারে সুন্নিদের অসন্তোষ থাকার কারণে আইএস ইরাকে তৃণমূল পর্যায়ে একটি বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তুলতে সমর্থ হওয়ায় তাদের এত বাড়বাড়ন্ত হয়েছে। তার পরও ইরাকের সেনা কর্মকর্তাদের নাটকীয়ভাবে লেজ গুটিয়ে পালানোর ফলে তাদের পক্ষে মসুল দখল করা সহজ হয়েছে। একই সঙ্গে ভাষ্যকারেরা আইএসের অগ্রগতির পেছনের রাজনৈতিক অর্থনীতিতে আলোকপাত করছেন। মার্কিন ঘরানার চিন্তকেরা আইএসের উত্থানের পেছনে সৌদি ও উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থায়নের ব্যাপারটি আলোচনা করছেন। অন্যদিকে অনেকে আবার বলছেন, কুর্দি অধিকৃত এলাকায় কালোবাজারে তেল বিক্রির মাধ্যমে আইএস অর্থ সংগ্রহ করছে, এগুলো হচ্ছে ইরান থেকে পাঠানো অপরিশোধিত তেল। এটা অবৈধ।

আমি আইএসের যুদ্ধ অর্থায়নের দিকে নজর দিতে চাই। তার আগে এই আন্দোলনের বিচ্ছিন্নতাবাদী চরিত্র নিয়ে কিছু কথা বলা দরকার। আইএস মসুল দখলের পরই শহরটির শিয়া মসজিদ ও অন্যান্য উপাসনালয় বোমা মেরে উড়িয়ে দিয়েছে বা বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দিয়েছে। এসব ভবন ধ্বংসের ছবি বিশ্ব সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রচারিত হয়েছে। দুঃখজনকভাবে কয়েকজন পশ্চিমা সাংবাদিক ইসলামের ইতিহাসে উপাসনালয় ধ্বংস কী ভূমিকা পালন করেছে, সেদিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছেন। ক্যাথলিক খ্রিষ্টধর্ম থেকে ইসলামের পার্থক্য হচ্ছে, এসব শিয়া ও সুন্নি উপাসনালয়ে অলি-আউলিয়াদের প্রতি যে গভীর শ্রদ্ধা দেখানো হয়, তা আসলে ইসলামের মধ্যে ভিন্নমতের প্রতি সহিষ্ণুতার পরিচায়ক। ওয়াহাবী আন্দোলন মূলত সৌদি আরবেই দেখা যায় । এরা ধর্মের ব্যাপারে মধ্যস্থতা করাটা সমর্থন করে না বা অন্তত আউলিয়াদের মাজারে ইবাদত-বন্দেগি করা গ্রহণযোগ্য বলে মনে করে না।

অন্যদিকে শিয়ারা মুসলমানদের মধ্যে সংখ্যালঘু। তাদের মধ্যে মরমিবাদের চর্চা আছে, তারা এ ধরনের ভক্তি নিবেদনে অভ্যস্ত। আইএস ইরাকে যে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, তার সঙ্গে ইরানের শিয়া শাসকদের কোনো মিল নেই; বরং তাদের চরমপন্থী রাজনীতিতে সৌদি ঘরানার প্রতি আসক্তি দেখা যাচ্ছে। সৌদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ওয়াহাবি রাজতন্ত্রের নিশান ওড়াতে গিয়ে বহু শিয়া ও সুফি মাজার ধুলায় মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে।

তো আইএসের সামরিক সফলতার রাজনৈতিক অর্থনীতি আমাদের কী ধারণা দেয়? কোন ঘরানার প্রতি তাদের আসক্তি রয়েছে? প্রথমত, একদিক থেকে আইএসের কৌশলকে মহৎ বলা যেতে পারে। অ্যাঙ্গোলার গৃহযুদ্ধে ইউনিটা হীরার খনি থেকে হীরা তুলে তা বিক্রি করে সংগঠন চালাত, কিন্তু আজ পর্যন্ত কেউই অপরিশোধিত তেল তুলে সেটাকে রাজস্বের প্রধান উৎস বানাতে পারেনি। একদল প্রশিক্ষিত যোদ্ধা তৈরির জন্য আইএস মূলত সৌদি অর্থদাতাদের ওপর নির্ভর করেছে। তারপর তারা সিরিয়া ও ইরাকের যেখানে তেলক্ষেত্র ও শোধনাগার আছে, সুদির্নিষ্টভাবে সেসব এলাকায় হামলা চালায়। বাইজির তেল পরিশোধনাগার ঘেরাও করে আইএস ইরাকের তেলক্ষেত্রগুলোর ওপর দেশটির নিয়ন্ত্রণের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে। ইরাকের চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ তেল এই শোধনাগারে শোধন করা হয়। অন্যদিকে মসুল দখল করার পর আইএসের যোদ্ধারা ইরাকের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি সাবসিডিয়ারি থেকে ৪৫০ মিলিয়ন ডলার লুট করেছে। এই অর্থের প্রায় পুরোটাই তেল উত্তোলন থেকে পাওয়া। অনেক ভাষ্যকারের মতে, তেল চোরাচালান থেকে আইএসের দৈনিক আয় এক মিলিয়ন ডলার।

তার মানে আইএস ‘ধর্মীয় ভাবধারায় উজ্জীবিত’ একটি সুন্নি চরমপন্থী দল, যাদের লক্ষ্য জাগতিক: মধ্যপ্রাচ্যের দুটি দেশের তেলসম্পদের দখল নিয়ে খেলাফতের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। এটি হবে একটি ইসলামি রাষ্ট্র, যেখানে একটি কেন্দ্রীয় ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ থাকবে। যুদ্ধের অর্থের জন্য তেলের ওপর নির্ভর করাটা বিদ্রোহী আন্দোলনের ক্ষেত্রে মহান ব্যাপারই বটে, তবে মধ্যপ্রাচ্যের প্রেক্ষাপটে এটা কোনো অনন্য ব্যাপার নয়। সেই সত্তরের দশক থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ অধিকাংশ দেশই অপরিশোধিত তেল থেকে উপার্জনের একটি বড় অংশই আন্তর্জাতিক বাজার থেকে অস্ত্র কেনায় ব্যয় করেছে। শাহের ইরান সত্তরের দশকে এই বাণিজ্যে ছিল।

কিন্তু ১৯৭৩-এর তেলসংকটের সময় থেকে সৌদি আরবের ওয়াহাবি রাজত্ব এই বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করছে। যেমন, আশির দশকের সৌদি আরব ও যুক্তরাজ্যের মধ্যকার তেলের বিনিময়ে অস্ত্র চুক্তি, যাকে বলা হয় আল ইয়ামাহা চুক্তি। ২০১০ সালে সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ৬০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র চুক্তি হয়, এটাই এযাবৎকালের সর্বোচ্চ অঙ্কের অস্ত্র চুক্তি।

২০১৪ সালে ইরাক বাঁচার উপায় খুঁজছে মরিয়া হয়ে। বিশ্ব সংবাদমাধ্যমের একটি অংশ ইতিমধ্যে বলছে, দেশটি তিন অংশে বিভক্ত হয়ে পড়বে—সুন্নি, কুর্দি ও শিয়া। আবার অনেক ভাষ্যকার বলছেন, এখন যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ইরানের দিকে নজর দেওয়া, এতে ইরাক তার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে পারবে। তার পরও যুক্তরাষ্ট্র ও তার পশ্চিমা মিত্ররা ওয়াহাবি রাষ্ট্রের সেবায় নিয়োজিত আছে। পশ্চিমারা গণতন্ত্রের জন্য গলা ফাটালেও সৌদি আরবে যে শিয়াদের দাবিয়ে রাখা হয়েছে, এ নিয়ে তারা কিছুই বলে না। ৪০ বছর ধরে তারা সৌদি আরবকে তেলের বিনিময়ে মারণাস্ত্র সরবরাহ করে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র আবার বড় ভাইয়ের মতো আচরণ করছে, তারা নুরি আল মালিকিকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক পদক্ষেপ নিতে বলেছিল, যাতে দেশটির সংখ্যালঘু সুন্নিদেরও মূলধারায় নিয়ে আসা যায়। ইরাকে শিয়ারা সংখ্যাগুরু হওয়া সত্ত্বেও সুন্নি আইএসের এই প্রবল প্রতাপ দেশটির মানুষেরা ভালোভাবে নেয়নি। ফলে, এই দ্বন্দ্ব মেটাতে না পেরে নুরি আল মালিকি শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করেছেন। অনেকে বলছেন, এতে সংকটের সমাধান হবে।

কিন্তু শুধু এর মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হবে কি না, সে কথা বলা মুশকিল। কথা হচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় মিত্র সৌদি আরব যে বহুদিন ধরে তার দেশের সংখ্যালঘু শিয়াদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করছে, সে জন্য কি দেশটিকে কখনো সমালোচনা করা হয়েছে? ওয়াহাবিরা যে ইসলামের মধ্যকার বৈচিত্র্যকে টুঁটি চেপে মেরে ফেলতে চায়, সে জন্য কি কখনো এদের সমালোচনা করা হয়েছে? মধ্যপ্রাচ্যের গণতন্ত্র, খাদ্যনিরাপত্তা ও জনকল্যাণের জন্য উল্লিখিত বিনিময়–বাণিজ্য কত বড় ক্ষতি বয়ে আনছে, সেটা কি তারা কখনো ভেবেছে?

তথ্যসূত্র