ওহী প্রাপ্তি থেকে হিজরতের পূর্ব পর্যন্ত

From Sunnipedia
Jump to: navigation, search
ওহীর যাত্রা শুরু - ৬১০ খৃষ্টাব্দ, বয়স - ৪০ বছর

এ সময় হেরা পর্বতের গুহায় সর্ব প্রথম ওহী নিয়ে নাযিল হন হযরত জিব্রাইল (আ.), এসে বলেনঃ “পড়ুন”। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ “আমি পড়তে জানিনা।” জিব্রাইল (আ.) তাঁকে বুকের সাথে মিলিয়ে ছেড়ে দিয়ে আবার বলেনঃ পড়ুন। তিনি একই জবাব দেন। তিনবার আলিঙ্গন করার পর তাঁর শরহে সদর বা বক্ষ প্রশস্ত হয়। এরপর তিনি পড়া শুরু করেন। সূরা ইকরার প্রথম পাঁচ আয়াত সর্ব প্রথম নাযিল হয় এবং পূর্ণাঙ্গ সূরা হিসাবে সর্ব প্রথম সূরা ফাতিহা নাযিল হয়। এ ঘটনার পর তিনি কম্পিত হৃদয়ে ঘরে ফিরে খাদীজাকে বললেন

আমাকে চাদরে জড়াও, আমাকে চাদরাবৃত কর।

একটু সুস্থ হয়ে তিনি ‘গারে হেরার’ সব ঘটনা খাদীজার কাছে খুলে বললেন। আরো বললেন : আমার জীবন নিয়ে আমি শংকিত। খাদীজা বললেন :

আল্লাহর কসম! আল্লাহ্ তা‘য়ালা কখনো আপনাকে অপদস্থ করবেন না। কারণ, আপনি আত্মীয়-স্বজনের হক আদায় করেন, আমানত রক্ষা করেন, বিপদগ্রস্তদের সাহায্য করেন, মেহমানদের আপ্যায়ন করেন, সব সময় ভাল কাজ করেন এবং পবিত্র জীবন যাপন করেন।

খাদীজার চাচাতো ভাই ওয়াকা বিন নওফল ছিলেন তাওরাত ও ইন্জিলের বিজ্ঞ আলিম। তিনি স্বামীকে নিয়ে তাঁর কাছে যান এবং হেরা গুহায় যা ঘটেছিল, তা সবই তাঁর কাছে বলেন। ওরাকা সব শুনে বলেন :

কুদ্দূস! কুদ্দূস! (জিব্রাইল, জিব্রাইল)! খাদীজা! যার হাতে আমার জীবন! তোমার কথা সত্য হলে, ইনি সেই ফিরিশ্তা, যিনি মূসা (আ.)-এর কাছে এসেছিলেন। আর ইনি শেষ নবী, যার আগমনের সুসংবাদ দিয়েছেন ঈসা (আ.)।

ওরাকা তাঁকে বলেন :

মনে রেখ, তোমাকে লোকেরা মিথ্যাবাদী বলবে, দু:খ-কষ্ট দেবে, এমনকি তোমাকে দেশ থেকে বের করে দেবে। যদি আমি ততদিন বেঁচে থাকি, তবে আমি তোমাকে সাহায্য করবো।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন :

বলেন কি? আমার সম্প্রদায় আমাকে দেশ থেকে তাড়াবে?

ওরাকা বলেন :

হ্যাঁ। আজ পর্যন্ত যত নবী-রাসূল গত হয়েছেন, তাদের কাওমের লোকেরা তাঁদের সাথে বিরোধিতা করেছে এবং তাদের অনেক দু:খ কষ্ট দিয়েছে।

এরপর ওরাকা- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কপালে চুমু দিয়ে তাঁকে বিদায় দেন।[1]

নবূওতের প্রথম তিন বছর - ৬১১, ৬১২ ও ৬১৩ খৃষ্টাব্দ, বয়স - ৪১-৪৩ বছর।

নবূওতপ্রাপ্তির পর যারা প্রথম ইসলাম গ্রহণ করেন এবং পড়ে নেনঃ “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ”। এদের মধ্যে প্রথম হলেন :

১. হযরত খাদীজাতুল কুবরা (রা.), যিনি নবী করীম (স.)-এর নবূওত প্রাপ্তির সময় পর্যন্ত দীর্ঘ পনের বছরের জীবন সাথী ছিলেন।
২. বয়স্ক পুরুষদের মধ্যে যিনি সর্বপ্রথম ইসলাম কবুল করেন, তিনি হলেন- হযরত আবু বকর সিদ্দীক।
৩. আর কিশোর যুবকদের মধ্যে যিনি দ্বীন কবুল করেন তিনি হলেন- হযরত আলী (রা.)।

উল্লেখ্য যে, প্রথম ওহী নাযিল হওয়ার পর বেশ কিছুদিন ওহী নাযিল হওয়া বন্ধ ছিল। তখন কুরায়শ কাফিররা বলতে থাকেঃ “মুহাম্মদের রব মুহাম্মদকে পরিত্যাগ করেছে।” তখন ‘সূরা দুহা’ নাযিল হয়। [2]

এরপর একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসমানের দিক থেকে হঠাৎ একটা আওয়াজ শুনলেন। তিনি উপরের দিকে তাকিয়ে জিবরাঈল (আ.)কে দেখতে পান যে, তিনি আসমান ও যমীনের মাঝখানে একটা সিংহাসনে উপবিষ্ট আছেন। তিনি ভয় বিহবল চিত্তে ঘরে ফিরে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লে- এ আয়াত নাযিল হয়ঃ

يَا أَيُّهَا الْمُدَّثِّرُ قُمْ فَأَنذِرْ

অর্থ : হে বস্ত্রে আচ্ছাদিত ব্যক্তি! উঠুন এবং ভীতি প্রদর্শন করুন।

— আল্-কুরআন, সূরা আল্-মুদ্দাস্সির; আয়াত : ১-২

হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) ইসলাম গ্রহণ করার পর জিজ্ঞাসা করেন :

ইয়া রাসূলাল্লাহ (স)! আমার কাজ কী?

জবাবে তিনি (স.) বলেন :

আমার যে কাজ, তোমারও সেই কাজ। লোকদেরকে দ্বীন গ্রহণের জন্য দাওয়াত দাও।

উল্লেখ্য যে, তাঁর দাওয়াতে সাড়া দিয়ে পাঁচ জন প্রসিদ্ধ সাহাবী ইসলাম গ্রহণ করেন। এঁরা হলেন :

১. হযরত উসমান গণী (রা.)
২. হযরত যুবায়র (রা.)
৩. হযরত আব্দুর রহমান (রা.)
৪. হযরত তালহা ইবন উবায়দুল্লাহ (রা.) এবং
৫. হযরত সা‘আদ ইবন আবু ওক্কাস (রা.)
গোপনে দ্বীন প্রচার

এ সময় সাহাবীদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অনেক নর ও নারী ইসলাম কবুল করেন। তাঁরা ছিলেন :

১. হারিসের মেয়ে লুবাবা (রা.)। ইনি ছিলেন হযরত আব্বাস (রা.)-এর স্ত্রী। মহিলাদের মধ্যে হযরত খাদীজা (রা.)-এর পর তিনি ইসলাম কবুল করেন।
২. হযরত খাব্বাব (রা.) যিনি সর্বপ্রথম মুসলমান হওয়ার কথা কুরায়শদের কাছে প্রকাশ করেন। ফলে, তারা তার উপর অত্যাচারের ষ্টীম রোলার চালায়। তাকে তপ্ত আগুনের উপর শুইয়ে বুকে পাথর চাপা দেয়।
৩. হযরত যায়দ ইবন সায়ীদ (রা.)। ইনি হযরত উমরের বোন ফাতিমার স্বামী ছিলেন।
৪. হযরত ‘আব্দুল্লাহ ইবন মাস‘উদ (রা.), যিনি সব সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে থাকতেন।
৫. হযরত উসমান ইবন মাযউন (রা.), যিনি বদরের যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। মুহাজিরদের মধ্যে মদীনায় তিনি সর্ব প্রথম ইন্তিকাল করেন এবং ‘জান্নাতুল বাকীতে’ তাঁকে দাফন করা হয়।
৬. হযরত আরকম (রা.)। সাফা পাহাড়ের পাদদেশে তাঁর বাড়ী ছিল। প্রথম দিকে রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বাড়ীতে মুসলমানদের শিক্ষা দিতেন এবং গোপনে ইসলাম প্রচার করতেন।
৭. হযরত আবু সালিমা (রা.), যিনি সবার আগে হিজরত করেছিলেন।
৮. হযরত আবু উবায়দা (রা.), যিনি প্রথমে হাব্শা ও পরে মদীনায় হিজরতকারী ছিলেন।
৯. হযরত কুদামা (রা.)। ইনি হযরত উমর (রা.)-এর ভগ্নী সুফিয়ার স্বামী ছিলেন। তিনি উভয় হিজরতে এবং বদরের যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলেন।
১০. হযরত ‘উবায়দা (রা.)। তিনি রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচা হারিসের পুত্র ছিলেন। তিনি মদীনায় হিজরত ও বদর যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছিলেন।
১১. হযরত জাফর (রা.)। ইনি হযরত আলী (রা.)-এর ভাই ছিলেন এবং মুতার যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন।
১২. আব্দুল্লাহ ইবন জহশ (রা.)। যিনি উহুদ যুদ্ধে শহীদ হন এবং হাময়ার সাথে একই কবরে সমাধিস্থ হন।
১৩.জহশের পুত্র আবূ আহমদ (রা.)। ইনি হযরত যয়নব (রা.)-এর ভাই ছিলেন।
১৪. উসমান ইবন মাযউনের পুত্র সায়িব (রা.)। ‘বুওয়াত’ যুদ্ধের সময় রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে মদীনার শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন।
১৫. হযরত উমায়র ইবন আবু ওক্কাস (রা.), ইনি সা‘দ ইবন আবূ ওক্কাসের ভাই ছিলেন। তিনি বদর যুদ্ধে শহীদ হন।
১৬. হযরত আবু বকর (রা.)-এর কন্যা আসমা (রা.)। তিনি হযরত আবদুল্লাহ ইবন যুবায়েরের মাতা ছিলেন।
১৭.হযরত খালিদ ইবন হিয়াম (রা.)। ইনি হযরত খাদিজা (রা.)-এর ভাইয়ের ছেলে ছিলেন।
১৮.হযরত আম্মার ইবন ইয়াসির (রা.)। যিনি সিফ্ফীনের যুদ্ধে নিহত হন।
১৯. হযরত হুযায়ফা (রা.)। যিনি হাব্শা ও মদীনা উভয় হিজরতে এবং বদরের যুদ্ধে শরীক ছিলেন।
২০.হযরত সুমাইয়া (রা.) ইনি হযরত ‘আম্মার ইবন ইয়াসিরের মা ছিলেন। ইনি মহিলাদের মধ্যে সর্ব প্রথম শহীদ হন। আবূ জেহেল তাঁর লজ্জাস্থানে বর্শাঘাত করে, ফলে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।

এছাড়া আসীমের কন্যা আসমা, সালামার কন্যা আস্মা, হযরত ‘উমরের বোন ফাতিমা (রা.)সহ অনেকে ইসলাম কবুল করেন। উল্লেখ্য যে, আবুল আরকমের পুত্র আরকম (রা.) এগার জনের পর পবিত্র ইসলাম কবুল করেন। সাফা পাহাড়ের পাদদেশে তাঁর বাসস্থান ছিল। সেখানে বসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোপনে নওমুসলিমদের শিক্ষা দিতেন। এভাবে তিন বছর পর্যন্ত তিনি (স.) হযরত আরকমের বাড়ীতে বসে গোপনে দ্বীনের তাব্লীগ ও প্রচারের কাজ সম্পন্ন করেন।

নবূওতের চতুর্থ বছর - ৬১৪ খৃষ্টাব্দ, বয়স - ৪৪ বছর - প্রকাশ্যে দ্বীন প্রচারের নির্দেশ

এ সময় আল্লাহর তরফ থেকে প্রকাশ্যে দ্বীন প্রচারের নির্দেশ আসে, যেমন আল্লাহর বাণী :

فَاصْدَعْ بِمَا تُؤْمَرُ وَأَعْرِضْ عَنِ الْمُشْرِكِينَ

অর্থ : হে নবী! আপনার প্রতি যে নির্দেশ দেয়া হয়, তা প্রকাশ্যে প্রচার করুন এবং মুশরিকদের পরোয়া করবেন না।

— আল্-কুরআন, সূরা হিজর, আয়াত : ৯৪

আল্লাহ্ তা‘য়ালার আরো নির্দেশ :

وَأَنذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ

অর্থ : “হে নবী! আপনি আপনার নিকট আত্মীয়দের সতর্ক করুন।

— আল্-কুরআন, সূরা শূআরা; আয়াত : ২১৪

আল্লাহ্ তা‘য়ালার তরফ থেকে নির্দেশ পাওয়ার পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাফা পাহাড়ের উপর উঠে তার গোত্রের লোকদের ডাকতে লাগলেন

হে কুরায়েশরা! হে কুরায়েশ সম্প্রদায়!

তারা জিজ্ঞাসা করলো : কি ব্যাপার মুহাম্মদ! সবাইকে ডাকছ কেন?

তিনি (স.) বললেন : আমি যদি বলি যে, এ পাহাড়ের পেছনে একদল শত্রু আছে, যারা তোমাদের উপর হামলা করবে, তা কি তোমরা বিশ্বাস করবে?

তারা সবাই বললো : হাঁ, কেন করব না? আমরা তো তোমাকে কখনো মিথ্যা বলতে শুনিনি।

তখন তিনি বলেন : আমি তোমাদের এক কঠিন আযাব সম্পর্কে সতর্ক করছি, যা শীঘ্রই তোমাদের ওপর আপতিত হবে। হে কুরায়েশ দল! তোমরা নিজেদের জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও। তোমরা বল : “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ। তোমরা জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে।

একথা শুনে আবু লাহাব বলে : তাব্বানলাকা। তুমি ধ্বংস হও। এ জন্যেই কি তুমি আমাদের এখানে জড়ো করেছ।

এরা জবাবে আল্লাহ্ তা‘য়ালা আবূ লাহাবের করুণ পরিণতির খবর জানিয়ে নাযিল করেন :

تَبَّتْ يَدَا أَبِي لَهَبٍ وَتَبَّ (1) مَا أَغْنَىٰ عَنْهُ مَالُهُ وَمَا كَسَبَ

অর্থ : আবু লাহাবের দুটো হাত ধ্বংস হোক এবং সে নিজেও ধ্বংস হোক। তার ধন-সম্পদ এবং সে যা উপার্জন করেছে, তা তার কোন কাজে আসেনি।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত দিতে শুরু করেন। তখন কুরায়শ কাফিররা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে এবং তারা এ কাজে বাধা দেওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

হক ও বাতিলের দ্বন্দ্ব শুরু

এ পর্যায়ে কুরায়েশ নেতারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচা আবু তালিবের কাছে উপস্থিত হয়ে বলে

হয় আপনি আপনার ভাতিজাকে সামলান, নয়তো মাঝখান থেকে সরে দাঁড়ান। তখন আমরাই তার সাথে বুঝাপড়া করবো।

একথা শুনে আবু তালিব তাদের নম্রভাবে বুঝিয়ে শুনিয়ে বিদায় দেন। এরপর তিনি নবী করীম (স.) কে বলেন

ভাতিজা! তোমার খান্দানের বড় বড় নেতারা আশা করে যে, তুমি তাদের দেবতাদের মন্দ বলবে না, আর তারাও তোমার আল্লাহ্কে মন্দ বলবে না।

জবাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : চাচা! আমি কি তাদের সেদিকে ডাকব না, যা প্রতীমাদের থেকে উত্তম?

আবু তালিব বলেন : তুমি তাদের কিসের দিকে ডাকতে চাও?

তিনি বলেন: আমি চাই, তারা বলুক : লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলূল্লাহ।

একথা শুনে কুরায়শ নেতারা ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁকে হুমকী-ধমকী দিয়ে চলে যায়। [3]

আপোষের ব্যর্থ প্রয়াস ও প্রলোভন

কুরায়েশ নেতারা মনে করে যে, মুহাম্মদ (স.)-কে সম্মান, সম্পদ ও সর্দারীর প্রলোভন দিয়ে দলে আনা যাবে, তাই তারা তাঁকে বলে

যদি তুমি সম্পদ চাও, তাহলে আমরা তোমাকে এতো বেশী সম্পদ দেব, যাতে তুমি শ্রেষ্ঠতম ধনী হও। আর যদি তুমি সম্মান চাও। তাহলে আমরা তোমাকে বড় নেতা মেনে নেব। আর যদি তুমি সুন্দরী মেয়েদের বিয়ে করতে চাও তাহলে সে ব্যবস্থা ও আমরা করব।

জবাবে তিনি বলেন

তোমরা যে প্রস্তাব দিয়েছ, তা পূর্ণ করা তোমাদের পক্ষে সম্ভব। শুনে রাখ, যদি তোমরা আমার ডান হাতে সূর্য এবং বাম হাতে চন্দ্র এনে দাও, এবং সত্য দ্বীন প্রচার থেকে বিরত থাকতে বল, তবুও আমি সত্য প্রচারে বিরত থাকবো না।

[4]

হত্যার পরিকল্পনা 

উল্লেখ্য যে, একদা আবু জেহেল শপথ করে বলে : যখন মুহাম্মদ (স.) নামাযে মগ্ন হবে, তখন একটি ভারী পাথর মেরে তার মাথা চূর্ণ করে দেব। ভোর হওয়া মাত্র আবু জেহেল একটা ভারি পাথর নিয়ে কা’বার পাশে বসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অপেক্ষায় রইলো। নবী করীম (স.) যখন নামাযরত অবস্থায় সিজদায় গেলেন, তখন আবু জেহেল পাথর নিয়ে তাঁর দিকে এগিয়ে গেল। হঠাৎ লোকেরা দেখতে পেল, আবু জেহেল পিছিয়ে এসেছে এবং তার চেহারা বিবর্ণ হয়ে গেছে; তার চোখ ঘোলা হয়ে গেছে। লোকেরা তাকে প্রশ্ন করলো : তোমার কী হয়েছে? সে হাঁপাতে হাঁপাতে জবাব দিল :

বল কি, আমি যা দেখলাম, তা কি তোমরা দেখতে পাওনি? যখনই আমি মুহাম্মদের দিকে গেলাম, তখনই এক ভয়ানক উট মুখ হা করে আমার দিকে ছুটে এলো। সে আমাকে গিলে ফেলতে উদ্যত হয়। আমি তা দেখেই তো ভয়ে পিছিয়ে এলাম। তা না হলে তো বাঁচাই মুশকিল হতো!

দুর্বল মুসলমানদের উপরনির্যাতন 

কুরায়েশ কাফিররা এরূপ সিদ্ধান্ত নেয় যে, তারা এবার দুর্বল মুসলমানদের ওপর নির্যাতন চালাবে। এ সিদ্ধান্তের পর কোন কোন মুশরিক তাদের মুসলমান দাস ও দাসীর ওপর এরূপ ভয়ানক নিপীড়ন চালালো, যা শুনলে শরীর ও শিউরে ওঠে, গায়ের লোম খাড়া হয় এবং চরম পাষাণ অন্তর ও কেঁপে ওঠে। তাদের বন্দীশালায় বন্ধ করে ক্ষুত পিপাসায় কষ্ট দিতো, রৌদ্রতপ্ত পাথর ও বালুর ওপর শোয়ায়ে রাখতো এবং অগ্নিদগ্ধ লৌহ শলাকা দিয়ে তাদের দেহ খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে জর্জরিত করে পানিতে ডুবিয়ে রাখতো। এঁদের মধ্যে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের কয়েকজনের নাম হলো : হযরত আম্মার ইবন ইয়াসির (রা.), তাঁর পিতা ইয়াসির (রা.) এবং তাঁর মাতা সুমাইয়া (রা.) তাঁরা প্রথমেই ইসলাম কবুল করেছিলেন। মাখযুম গোত্রের লোকেরা তাদের উপর অমানুষিক নির্যাতন শুরু করে। তারা তপ্ত দুপুরে যখন মরুভূমির পাথর ও বালু আগুন হয়ে যেত, তখন তাদের উলঙ্গ করে তাতে শুইয়ে দিত। কখনো তাদের আগুনের উপর ফেলতো, কখনো পানিতে নিয়ে চুবাতো। তাদের এ অবস্থা দেখে নবী (স.) বলতেন :

হে ইয়াসির পরিবার! সবর কর, তোমাদের জন্য রয়েছে জান্নাত।

হযরত বেলাল (রা.)

তিনি গোপনে ইসলাম কবুল করেন। তাঁর মনিব ছিল উমাইয়া ইবন খাল্ফ। ইসলাম গ্রহণ করার ফলে তাঁর উপর অত্যাচারের ষ্টিম রোলার চালান হয়। তাঁর গলায় রশি বেঁধে মক্কার যুবকদের হাতে তাকে সমর্পণ করা হতো। ইচ্ছামত মারধর করা হতো। তপ্ত দুপুরে মরুভূমিতে নিয়ে বুকের উপর গরম পাথর চাপা দিয়ে বলা হতো :

এখনো মুহাম্মদের দ্বীন ত্যাগ করে লাত, মানাত ও ওজ্জার পূজা করতে রাজী হয়ে যাও। অন্যথায় এভাবেই তোমাকে হত্যা করা হবে।

হযরত বেলাল (রা.) এ চরম কষ্ট ও নির্যাতন সহ্য করতেন এবং বলতেন :

আহাদ! আহাদ! আল্লাহ্ এক তিনি এক।

হযরত খাব্বাব(রা.)

তিনি প্রথম দিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে বায়‘আত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করে। তাঁর মনিবের নাম ছিল উম্মে আন্মার। তাঁকে যেভাবে শাস্তি দেয়া হতো, তা ছিল এরূপ :

তারা জ্বলন্ত অঙ্গার মাটিতে বিছিয়ে, তার উপর তাঁকে চিৎ করে শোয়াত এবং কয়েকজন পাষন্ড তাঁর বুকে পা দিয়ে তাঁকে চেপে ধরে রাখতো। যখন পিঠের নীচের অঙ্গারগুলো নিভে যেত, তখন তারা তাঁকে ছেড়ে দিত।

একবার হযরত খাব্বার (রা.) এ ঘটনা হযরত ‘উমর (রা.)-এর কাছে বর্ণনা করলে, তিনি তাঁর পিঠের কাপড় উঁচু করে দেখতে পান যে, সেই দহনের চিহ্ন তাঁর সারা পিঠে ধবল কুষ্ঠের ন্যায় বিদ্যমান আছে। [5]

নবূওতের পঞ্চম বছর - ৬১৫ খৃষ্টাব্দ; বয়স - ৪৫ বছর। হাব্শায় হিজরত 

কুরায়শদের জুলুম-নির্যাতন যখন চরমে পৌঁছে, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাথীদের হিজরতের অনুমতি দেন। তাঁরা জিজ্ঞাসা করেন :

ইয়া রাসূলাল্লাহ (স)! আমরা কোথায় যাব?

তিনি তাঁদের হাবশায় হিজরতের অনুমতি দেন। কারণ, সেখানকার বাদশা খৃষ্টান হলেও ন্যায়পরায়ণ ছিলেন। তাঁর দেশে কোন অন্যায় অবিচার ছিল না। দেশবাসী তার সুশাসনে শান্তিতে কাটাত। কুরায়েশরা ব্যবসার জন্য সে দেশে যেত।

প্রথমবারে যারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াস্লাামের অনুমতি নিয়ে হাবশায় যায়, তাদের সংখ্যা ছিল ষোল। তার ভেতর ১২ জন পুরুষ ও ৪ জন নারী ছিল। এ দলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কন্যা রোকাইয়া (রা.) এবং তাঁর স্বামী হযরত উসমান ইবনে আফ্ফান (রা.)ও ছিলেন। নবূওতের পঞ্চম বছর, রজব মাসে তাঁরা ‘শুআয়বা’ বন্দর হতে জাহাজে আরোহন করে আবিসিনিয়া (হাবশা) অভিমুখে যাত্রা করেন। এর কিছুদিন পর হযরত জাফর (রা.)-এর নেতৃত্বে ৮৩ জন নর-নারী আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। কুরায়েশ নেতারা তাদের ফিরিয়ে আনার জন্য চেষ্টা করে ব্যর্থ হয় এবং তারা হতাশ হয়ে আবিসিনিয়া ত্যাগ করে। আর এভাবে ইসলামের জ্যোতি এশিয়া ছেড়ে আফ্রিকা মহাদেশের মরুভূমিতে ছড়িয়ে পড়ে।

নবূওতের ষষ্ঠ বছর - ৬১৬ খৃষ্টাব্দ, বয়স - ৪৬ বছর। হযরত হামযা (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণ

কুরায়েশ প্রতিনিধিরা আবিসিনিয়া থেকে ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসায়, তারা ক্ষোভে, দু:খে মুহ্যমান হয়ে পড়ে। এবার তাদের ক্রোধ কেন্দ্রীভূত হয় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিয়ে। তারা তাঁর প্রাণনাশের সংকল্প করে। আর এ কাজে অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করে আবু জেহেল। নবূওতের ষষ্ঠ বছরে একদিন আবু জেহেল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সাফা পাহাড়ের কাছে দেখতে পেয়ে সে উম্মাদের মত তাঁকে গালিগালাজ করে, তাঁর দেহে নাপাক গোবর ছুঁড়ে মারে এবং সব শেষে একটা পাথর ছুড়ে মেরে তাঁর মাথা ফাঁটিয়ে দেয়। আঘাতের ফলে তাঁর দেহ রক্তে রঞ্জিত হয়ে যায়। এ অবস্থায় তিনি ঘরে ফিরে যান। একজন ক্রীতদাসী এ ঘটনা দেখে, তা তাঁর চাচা হামযার কাছে বলে দেয়। যখন তিনি জঙ্গলে শিকার করা থেকে ফিরছিলেন।

দাসীর কথা শুনে তিনি গর্জন করে উঠে বললেন : কী! এতো বড় স্পর্ধা। মুহাম্মদের গাঁয়ে হাত! আমার ভাতিজা কার কী ক্ষতি করেছে? কী অপরাধ করেছে?

এরপর হযরত হামযা অত্যন্ত ক্রুদ্ধ ও উত্তেজিত হয়ে সোজা কা‘বা ঘরে গেলেন এবং আবু জেহেলের মাথায় ধনুক দিয়ে প্রচন্ড আঘাত করে বললেন : শয়তান! মুহাম্মদের গায়ে হাত দিয়েছিস? জানিস না, সে আমার ভাতিজা?

আবু জেহেল বললো : ধর্মের জন্য একাজ করেছি

উত্তরে হামযা বললো: ধর্মের জন্য? তবে শোন, এখনই আমি মুহাম্মদের ধর্ম গ্রহণ করলাম। তিনি বললেন : “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ।”

হযরত ওমর (রা.)-এর ইসলাম গ্রহণ 

একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরূপ দু‘আ করেন : “ইয়া আল্লাহ্! আবু জেহেল ও ওমর - এ দুয়ের মধ্যে তোমার নিকট যে অধিকপ্রিয়, তার দ্বারা তুমি পবিত্র ইসলামকে সম্মানিত কর।” [6] উল্লেখ্য যে, এ দু‘আ হযরত ওমর (রা.)-এর শানে কবুল হয়। হযরত হামযা (রা.) ইসলাম কবুল করার ফলে আবু জেহেল ভীষণ ক্রুদ্ধ হয়। সে ক্ষিপ্ত হয়ে প্রকাশ্য মজলিসে ঘোষণা দেয়

যে ব্যক্তি মুহাম্মদকে হত্যা করে তাঁর মাথা আমার কাছে এনে দেবে, আমি তাকে একশত উট পুরস্কার দেব।

পুরস্কারের লোভে ওমর তরবারি হাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাথা কাটার জন্য বের হলেন। হঠাৎ পথিমধ্যে নাঈমের সাথে দেখা। নাঈম তার দোস্ত। জিজ্ঞাসা করলো :

কিহে ওমর, খবর কি? কোথায় চলেছ খোলা তরবারি হাতে নিয়ে।

উত্তরে ওমর বললো : সে ব্যক্তিকে হত্যা করতে যাচ্ছি, যে বলে আল্লাহ্ এক।

রাগান্বিত ওমর ও তার কথা শুনে নাঈম (রা.) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে খুবই উদ্বিগ্ন হলেন। তার মনকে অন্য দিকে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য সে বললো : তোমার বোন ফাতিমা এবং তার স্বামী সাঈদ ইসলাম কবুল করেছে, এ খবর কি তুমি রাখ? আগে নিজের ঘরের খবর নেও, পরে মুহাম্মদের মাথা কেটো!

কী! আমার বোন ইসলাম গ্রহণ করেছে? এত বড় স্পর্ধা? আচ্ছা, আগে তার খবর নেই। সাথে সাথে ওমর তার ভগ্নীপতির বাড়ীর দিকে ছুটলেন। ওমর যখন বোনের বাড়ীতে গিয়ে পৌঁছলেন, তখন সাঈদ ও ফাতিমা ‘সূরা ত্বা-হা’ পাঠ করছিলেন। কুরআন পাক তেলাওতের শব্দ শুনে ওমর জোরে জোরে দরজা ধাক্কাতে থাকে। ঘর থেকে জিজ্ঞাসা করে :

কে দরজা ধাক্কাচ্ছে? কে?

ওমর জবাব দেয় : আমি খাত্তাবের পুত্র ওমর। সে জিজ্ঞাসা করে : তোমরা এতক্ষণ কি পড়ছিলে? আমি জানতে পেরেছি, তোমরা বাপ-দাদার ধর্ম ছেড়ে মুহাম্মদের ধর্ম গ্রহণ করেছ। বেদ্বীন হয়ে গেছ।

সাঈদ জবাবে বলেন : বাপ-দাদার ধর্মে যদি সত্য না থাকে, আর অন্য ধর্মে যদি তা পাওয়া যায়, তাহলে তা গ্রহণ করা যাবে না কেন ?

একথা শুনে ওমর তার ওপর ঝাপিয়ে পড়ে এবং বেদম মার শুরু করে দেয়। ফাতিমা স্বামীকে বাঁচাতে গেলে ওমর তাকেও মারধর করে।

সে মারের চোটে ফাতিমার মাথা ফেটে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হলে, সে ওমরকে বলে, আমরা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান এনেছি। জীবন গেলেও আমরা তা পরিত্যাগ করবো না। তোমার যা খুশী করতে পার।

ওমর তখন নরম সুরে বললেন : দেখি, তোমরা কী পাঠ করছিলে?

ফাতিমা বললেন : তুমি অপবিত্র। অপবিত্র হাতে কুরআন স্পর্শ করা যায় না, তাই আগে গোসল ও পরে ওযু কর।

ওমর ওযু করলে ফাতিমা (রা.) কুরআনের সেই লিখিত অংশ তার হাতে দেন, যা পাঠ করে তিনি মুগ্ধ হন এবং বলেন : কি চমৎকার ও কত মর্যাদাকর এ পাক কালাম! কোথায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম? আমি অক্ষনি তাঁর কাছে গিয়ে ইসলাম কবুল করবো।

এ সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আরকাম (রা.)-এর ঘরে অবস্থান করছিলেন। ওমর সেখানে প্রবেশ করলে তিনি (স.) জিজ্ঞাসা করেন : হে ওমর! কি মনে করে আসলে? জবাবে ওমর বলেন : পবিত্র দ্বীন-ইসলাম কবুল করার জন্য এসেছি। সাথে সাথে তিনি বায়আত গ্রহণ করে পড়েন- “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ।”

ইসলাম গ্রহণের পর ওমর (রা.) বলেন : ইয়া রাসূলাল্লাহ (স)! সত্য দ্বীন কবুল করার পর ঘরে বসে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগী করবো, তা হবে না। আল্লাহর ঘরে হাজির হয়ে উচ্চকণ্ঠে বললো : আল্লাহু আকবর।

রাসূলুল্লাহ (স.) হযরত ওমর (রা.)-এর ঈমানী জয্বা দেখে খুশী হলেন এবং খোলাখুলিভাবে আল্লাহর ঘরে হাজির হয়ে ইবাদত করার অনুমতি দিয়ে তাঁকে ‘আল্-ফারুক’ উপাধিতে ভূষিত করেন। কারণ, আল্লাহ্ তা‘য়ালা তাঁর দ্বারাই হক ও বাতিলের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য নির্ণয় করে দেন। [7] [8]

নবূওতের সপ্তম, অষ্টম ও নবম বছর - ৬১৭-৬১৯ খৃষ্টাব্দ; বয়স - ৪৭-৪৯ বছর। বয়কট পর্ব 

মুসলমানদের সংখ্যা ও শক্তি বৃদ্ধি হতে দেখে কুরায়েশরা এরূপ সিদ্ধান্ত নেয় যে, মুহাম্মদ (স.) ও তাঁর অনুসারী এবং তাঁর সাহায্যকারীদের কঠোর বয়কটের মাধ্যমে শায়েস্তা করতে হবে। তাদের সাথে মেলামেশা, লেন-দেন, কেনা-বেচা, বিয়ে-শাদী সবই বন্ধ রাখা হবে। মোটকথা, তাদের সাথে কোন ধরনের সম্পর্ক রাখা যাবে না। তারা নবূওতের সপ্তম বছর, ১লা মুহাররম এক সভার মাধ্যমে স্থির করে যে, এ বয়কট ততক্ষণ পর্যন্ত বলবৎ থাকতে, যতক্ষণ না তারা স্বেচ্ছায় মুহাম্মদ (স.)-কে কুরায়েশ কাফিরদের হাতে সমর্পণ করবে। তারা এটা লিখে কাবা ঘরের সাথে টানিয়ে দেয়। [9]

শিআবে আবু তালিবে অন্তরীন জীবন 

কুরায়েশদের বৈরীভাব লক্ষ্য করে আবু তালিব হাশিম ও মুত্তালিব গোত্রের সাথে পরামর্শ করে স্থির করেন যে, তারা মুহাম্মদ (স.)ও তাঁর সাথীদের নিয়ে শিআবে আবু তালিবে অবস্থান করবেন। এটি শহর থেকে একটু দূরে অবস্থিত এবং বেশ সুরক্ষিত ছিল। সেখানে এক সাথে থাকলে বিপদ কম হবে এবং অন্যান্য সুযোগ পাওয়া যাবে। উল্লেখ্য যে, পরামর্শ অনুযায়ী তা-ই করা হলো। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীদের নিয়ে বনি-হাশিম ও বনি-মুত্তালিবগণ সেই গিরি দুর্গের মধ্যে আত্মনির্বাসিত হন, যেখানে তারা দীর্ঘ দু’বছর অনেক দু:খ কষ্টের মধ্যে অতিবাহিত করেন।

এ সময় কুরায়শ কাফিররা মুসলমানদের উপর অমানুষিক অত্যাচার ও নিষ্ঠুরতার পরিচয় দেয়। বাহির থেকে তাদের কাছে যাতে কোন খাদ্য-শস্য না পৌঁছে, তারা সে ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ক্ষুধার যন্ত্রনায় তারা গাছের পাতা, শুকনো চামড়া ভিজিয়ে খেয়ে মানবেতর জীবন যাপন করে। ছোট শিশু ও মহিলাদের করুণ কান্নায় আল্লাহর আরশ পর্যন্ত প্রকম্পিত হয়, কিন্তু কুরায়েশ কাফিরদের পাষাণ হৃদয় তাতে এতটুকু বিচলিত হয়নি। অবশেষে আল্লাহ্ তা‘য়ালা তাদের মতো বিভেদ সৃষ্টি করে দেন এবং কিছু ব্যক্তির মধ্যে শুভবুদ্ধি সৃষ্টি করেন, যারা বয়কটের বিরোধিতা শুরু করে। এ সাথে তারা সম্মিলিতভাবে বয়কটের পক্ষে যে প্রতিজ্ঞাপত্র তৈরী করে কাবা ঘরের দেয়ালের সাথে ঝুলিয়ে রেখেছিল, আল্লাহর হুকুমে পোঁকায় খেয়ে তা নষ্ট করে দেয়। একথা শুনে অনেকে বলে :

যদি এটি সত্য হয়, তবে মুহাম্মদ (স.) আল্লাহর রাসূল, এতে কোন সন্দেহ নেই।

এভাবে দীর্ঘ দু’বছর তাঁরা অন্তরীন বা বন্দী থাকার পর সেখান থেকে বের হয়ে আসেন এবং আবার ইসলাম প্রচার শুরু করেন।

[10]

নবূওতের দশম বছর - ৬২০ খৃষ্টাব্দ, বয়স ৫০ বছর। আবু তালিবের মৃত্যু 

গিরিসঙ্কটের কারাগার থেকে মুক্তি লাভের পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কয়েক দিন শান্তিতে ছিলেন। হঠাৎ আবু তালিব অসুস্থ হয়ে পড়েন। কারা জীবনের কঠোরতা তাঁর সহ্য হয়নি। গিরিসঙ্কট থেকে বের হওয়ার ছয় মাস পরেই আবু তালিবের মৃত্যু হয়। এ সময় তার বয়স ছিল ৮০ বছর। জীবনের শুরু থেকে যিনি ছায়ার মত সব সময় তাকে বিপদ-আপদে সাহায্য করে, তাঁর ইন্তিকালে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুবই ব্যথাহত হন।

খাদিজার মৃত্যু 

চাচার শোক ভুলতে না ভুলতেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পূণ্যময়ী ও প্রাণপ্রিয় স্ত্রী খাদিজাতুল কুব্রা (রা.) অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং আবু তালিবের মৃত্যুর কয়েক দিন পরেই তিনি চির নিদ্রায় নিদ্রিত হন। উল্লেখ্য যে, হযরত খাদিজাতুল কুব্রা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শুধু প্রিয়তমা স্ত্রী ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন তাঁর দাম্পত্য জীবনের পঁচিশ বছরের সুখ-দু:খের সাথী, বিপদ-আপদে সর্বক্ষণ সাহায্যকারী, তিনি সবার আগে দ্বীন-ইসলাম কবুল করেন। আবু তালিব এবং হযরত খাদীজা (রা.)[11] -এর মৃত্যুতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শোক সাগরে নিমজ্জিত হন। এজন্য তিনি এ বছরটিকে “আমুল-হয্ন” বা ‘শোক বর্ষ’ বলে অভিহিত করেন।

মর্মান্তিক তায়েফ সফর 

মুশরিকদের জুলুম অত্যাচার যখন সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন নবূওতের দশম বছরে তিনি যায়েদ ইবনে হারেছাকে নিয়ে তায়েফ চলে যান। মক্কা থেকে ৬০ মাইল দূরে অবস্থিত তায়েফ নগরী একটি সুজলা, সুফলা, শস্য-শ্যামলা দেশ।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানকার নেতাদের সাথে সাক্ষাৎ করে তাদেরকে সত্য ধর্ম ইসলাম গ্রহণ করার জন্য আহবান করলে, তারা তা প্রত্যাখ্যান করে এবং অশোভন আচরণ করে বলে : “হুঁ! আল্লাহ্ বুঝি আর কাউকে খুঁজে না পেয়ে তোমাকে নবীরূপে পাঠিয়েছেন।”

কেউ বললো : “দেখ! দেখ! আল্লাহর নবী কি এমন করে পায়ে হেঁটে আসে ?”

কেউ বললো : “আমি তোমার সাথে তথাই বলতে চাই না। কারণ, যদি তুমি সত্যিই আল্লাহর রাসূল হও, তাহলে তোমার দাবী অস্বীকার করলে ক্ষতি হবে। পক্ষান্তরে যদি তোমার দাবী মিথ্যা হয় তাহলে এমন ভন্ড মিথ্যাবাদীর সাথে কথা বলার প্রয়োজন নেই।”


তাদের কথা শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিরাশা হলেন। তাঁকে শহর থেকে বের করে দেয়ার জন্য তারা দুষ্টু ছেলে-পিলে, গুন্ডা-বদমায়েশদের লেলিয়ে দেয়। তারা দল বেধে সব দিক থেকে তাঁর উপর ইট, পাটকেল ও পাথর মারতে থাকে। হযরত যায়েদ (রা.) তাঁকে বাঁচাতে গিয়ে আহত হন এবং নবী (স.)-এর অবস্থা এমন হয় যে, তাঁর সমস্ত শরীর পাথরের আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত হয় এবং ফিনকি দিয়ে রক্ত ঝরে। এমনকি তাঁর উভয় জুতা দেহের প্রবাহিত রক্তে পরিপূর্ণ হয়ে যায়। এতো কষ্ট পাওয়া সত্ত্বেও তিনি তাদের হিদায়েতের জন্য দু‘আ করেন।

তায়েফ থেকে মক্কা প্রত্যাবর্তন 

এ সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বিশিষ্ট কুরায়েশ নেতা মুত্ইম ইবন আদী নিরাপত্তা প্রদান করেন। তখন তিনি ব্যাপকভাবে ইসলামের দাওয়াত দেয়া শুরু করেন।

হযরত সাওদা (রা.)-এর সাথে বিবাহ 

তায়েফ থেকে মক্কাতে ফিরে আসার পর তিনি (স.) হযরত সাওদা (রা.)-এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। সাওদা (রা.) এবং তাঁর স্বামী আগেই ইসলাম কবুল করেন এবং আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। সেখানেই তাঁর স্বামী ইন্তিকাল করলে সওদা (রা.) বিপদে পড়েন। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে স্ত্রীরূপে গ্রহণ করে তাঁর নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেন।

হযরত আয়েশা (রা.)-এর সাথে বিবাহ 

হযরত আবু বকর (রা.)-এর ইচ্ছা ছিল আল্লাহর রাসূলের সাথে রক্তের সম্পর্ক স্থাপন করা। তাই তিনি খাদীজা (রা.)-এর ইনতিকালের পর তাঁর মেয়ে আয়েশাকে বিবাহ করার জন্য অনুরোধ করেন। তিনি তাঁর এ বাসনা পূর্ণ করেন এবং তখনই বিবাহের ‘আকদ’ সম্পন্ন হয়। এ সময় আয়েশা (রা.)-এর বয়স ছিল মাত্র ৭ বছর। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ৯ বছর বয়সের সময় তাকে ঘরে তুলে নেন।

বিভিন্ন গোত্রের কাছে ইসলাম প্রচার 

বিভিন্ন গোত্রের লোকেরা যখন উকাজ, মাজিন্না প্রভৃতি মেলায় সমবেত হতো, তখন তিনি তাদের কাছে দ্বীনের দাওয়াত দিতেন। এ সময় মদীনার খাজরাজ বংশের ৬ ব্যক্তি ইসলাম কবুল করেন।

মিরাজ 

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনের প্রসিদ্ধ ও অলৌকিক ঘটনা মিরাজ। অন্তরীণ থেকে মুক্তি পাওয়ার পর নবূওতের দশম সনেই সংঘটিত হয়েছিল, যা বিশ্বজগতের ইতিহাসে আর কখনো ঘটেনি। যার সংক্ষিপ্ত বর্ণনা এরূপ : এক রাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত উম্মে হানীর ঘরে অথবা বায়তুল্লাহ শরীফের পাশে হাতীমে ঘুমিয়ে ছিলেন। হযরত জিব্রাইল (আ.) তাঁকে জাগান এবং সেখান থেকে প্রথমে হাতীমে কা‘বার পাশে এবং পরে যমযম কুপের পাশে নিয়ে যান। তারপর তাঁর বক্ষ বিদীর্ণ করে ভেতর থেকে ‘কলব’ বা অন্তর বের করে, যমযমের পানিতে ধুয়ে তা ঈমান ও হিক্মত দিয়ে পূর্ণ করে যথাস্থানে রেখে দেন। তারপর তাঁর কাছে একটি জান্নাতী বাহন ‘বুরাক’ আনা হয়; যা গাধার চেয়ে কিছু বড় এবং খচ্চরের চেয়ে একটু ছোট ছিল। তার রং ছিল সাদা এবং ক্ষিপ্রগতিসম্পন্ন ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাতে চড়ে জিব্রাইল (আ.)-এর সাথে বায়তুল মুকাদ্দিসে পৌঁছান এবং সেখানে উপস্থিত সব নবী ও রাসূলের জামাতের ইমামতি করেন। এরপর তিনি সেখান থেকে উর্ধ্ব গগনমন্ডলে উপনীত হন। চলার পথে বিভিন্ন আকাশে তিনি নবীদের সাথে সাক্ষাৎ করে অবশেষে সিদ্রাতুল মুনতাহায় গিয়ে পৌঁছেন। এখানে তিনি আল্লাহ্ তা‘য়ালার বিশেষ কুরবত বা নৈকট্য লাভ করেন। এ সময় পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরজ হয়। নবূওতের দশম বছরে রজব মাসের ২৭ তারিখের রাতে এ মহাঘটনা সংগঠিত হয়। এ সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বয়স ছিল পঞ্চাশ বছর। মি‘রাজ সম্পর্কে আল্লাহর বাণী :

তিনি পবিত্র মহিমময়, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতের বেলায় ভ্রমণ করিয়েছেন ‘মসজিদে হারাম’ থেকে ‘মসজিদে আকসা পর্যন্ত, যার চারপাশকে আমি বরকতময় করেছি- যাতে আমি তাকে দেখাই আমার কুদরতের কিছু নিদর্শন; নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।

[12]
নবূওতের একাদশ বছর - ৬২১ খৃষ্টাব্দ; বয়স ৫১ বছর।
মদীনায় ইসলাম প্রচার 

প্রতি বছরই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজ্জের সময় বিভিন্ন গোত্রের যাত্রীদের নিকট উপস্থিত হয়ে ইসলাম প্রচার করতেন। নবূওতের একাদশ বছরেও তিনি যথারীতি দ্বীন প্রচার করতে থাকেন, মক্কার কাছে ‘হেরা’ ও ‘মিনা’-এর মাঝখানে অবস্থিত ‘আকাবা’ নামক একটি স্থান আছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে কয়েকজন লোক দেখে, তাদের পরিচয় জিজ্ঞাসা করে জানতে পারেন তারা মদীনাবাসী খযরজ বংশের লোক। তিনি তাঁদের কাছে দ্বীনের দাওয়াত দেন এবং কুরআন তেলাওয়াত করে শুনিয়ে ইসলাম কবুলের আহবান জানান। তখন তারা বলাবলি করতে থাকে যে,

ইনিই তো সে নবী, যার কথা ইয়াহুদীরা সব সময় বলে।

ফলে তারা সকলেই নবী করীম (স.)-এর নিকট ইসলাম কবুল করে মদীনায় ফিরে যায়।

তাঁরা মদীনায় ফিরে গিয়ে ইসলাম প্রচার করতে থাকে। তাঁদের প্রচেষ্টায় মদীনায় ব্যাপকভাবে ইসলাম প্রচার শুরু হয়। এই সময় ছয় ব্যক্তি ইসলাম কবুল করে, যাঁদের নাম হলো :

১. তায়হানের পুত্র আবুল হায়সাম
২. যুরারার পুত্র আব্ উসামা আস‘আদ
৩. হারিসের পুত্র ‘আওফ
৪. মালিকের পুত্র রাফি‘
৫. আমিরের পুত্র কুৎবা, এবং
৬. ‘আবদুল্লাহ ইবন রবাবের পুত্র জাবির। [13]
‘আকাবার প্রথম বায়‘আত 

নানা প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে একটি বছর কেটে যায়। আবার হজ্জের সময় উপস্থিত হয়। গত বছর যারা আকাবা নামক স্থানে ইসলাম গ্রহণ করেছিলে, তাদের সাথে এবার অনেক লোক হজ্জ করার জন্য আসে। পূর্বোক্ত আকাবা উপত্যকায় তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে দেখা করে ইসলাম গ্রহণ করে। এদের সংখ্যা ছিল বার জন। তাঁদের নাম হলো :

১. যুরারার পুত্র উসামা আসআদ,
২. হারিসের পুত্র আওফ
৩. মালিকের পুত্র রাফি‘
৪. হারিসের পুত্র মু‘আয
৫. আব্দ কায়সের পুত্র যাক্ওয়ান,
৬. সামিতের পুত্র উবাদা
৭. উবাদার পুত্র আব্বাস,
৮. সালাবা,
৯. আমিরের পুত্র ‘উক্বা,
১০. আমিরের পুত্র কুৎবা,
১১. আবুল হায়সাম এবং
১২. সাইদার পুত্র উয়ায়ম।

এরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে হাত রেখে এরূপ শপথ গ্রহণ করে :

১. একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করবো, তাঁর সাথে অন্য কিছুর শরীক করবো না।
২. ব্যভিচার করবে না,
৩. চুরি করবে না,
৪. নিজের সন্তান সন্তুতিকে হত্যা করবে না,
৫. কারো প্রতি মিথ্যা দোষারোপ বা চোগলখুরী করবে না,
৬. আমি যে সৎকাজের নির্দেশ দেই, তা অমান্য করবে না।

এটিই আকাবার প্রথম বায়‘আত হিসাবে পরিচিত। [14]

মদীনায় প্রচারক প্রেরণ 

তারা যখন মদীনায় ফিরছিল, তখন রাসূল্লুাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসআব ইবন উমায়ের (রা.)-কে তাদের সাথে দেন, যিনি কুরআনের অভিজ্ঞ আলিম ছিলেন। তিনি লোকদের কুরআন শিখান, ইসলামের তালিম দেন এবং দ্বীনের পরিপূর্ণ জ্ঞান দান করেন। তাঁর প্রচেষ্টায় অল্প সময়ের মধ্যে মদীনায় ইসলাম ছড়িয়ে পড়ে। দলে দলে লোক ইসলাম কবুল করে। মদীনাবাসীর অন্তরে যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সত্য দ্বীন প্রবেশ করলো, তখন তাঁরা তাঁকে কাছে আনার জন্য বলাবলি করতে থাকে :

আমরা আর কতকাল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দূরে রাখব, আর তিনি কত দিন মক্কায় হয়রান হয়ে তাঁর মদদগার বা সাহায্যকারী খুঁজতে থাকবেন?

— মুসনাদে আহমদ

অবশেষে তাঁরা সিদ্ধান্ত নেয় যে, আগামী হজ্জ মওসুমে তাঁরা মক্কায় গিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মদীনায় তাশারীফ আনার জন্য আবেদন জানাবেন।
নবূওতের ত্রয়োদশ বছর - ৬২৩ খৃষ্টাব্দ; বয়স ৫৩ বছর। আকাবার দ্বিতীয় বায়‘আত 

দেখতে দেখতে আরো একটা বছর শেষ হলো। পুনরায় হজ্জের সময় সমাগত হলো। এবার মদীনা থেকে এক বিরাট কাফেলা হজ্জ করার জন্য মক্কায় আসে। যার মধ্যে ৭৩ জন মুসলিম পুরুষ ও দু’জন মহিলা ছিলেন। তাঁরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মদীনায় নেওয়ার জন্য মক্কায় আসেন।

হযরত আব্বাস (রা.)-এর সহযোগীতা 

যদিও তিনি তখনও ইসলাম কবুল করেননি, তবুও আবু তালিবের মৃত্যুর পর হযরত আব্বাসই ছিলেন নবী করীম (স.)-এর সর্বদা সাহায্যকারী। এজন্যই তিনি (স.) ১২ই জিলহজ্জ, নবূওতের ত্রয়োদশ বছরে তাকে সাথে নিয়ে গোপনে ‘আকাবায় উপস্থিত হন। ‘আকাবা উপত্যকায় উভয় পক্ষের মধ্যে আলোচনা শুরু হলে, মদীনাবাসীরা হযরত (স.)-কে তাদের সাথে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব করলে, হযরত আব্বাস (রা.) বলেন :

“হে আওস ও খযরজগণ! আপনারা মুহাম্মদ (স.)-কে মদীনায় যাওয়ার জন্য অনুরোধ করছেন, কিন্তু এটা সহজ ব্যাপার নয়। আপনারা ভেবে দেখুন, তাঁকে নিয়ে গেলে আপনাদের অনেক বিপদের সম্মুখীন হতে হবে। মক্কাবাসীরা আপনাদের উপর ক্ষেপে যাবে এবং তারা আপনাদের বিরুদ্দে অস্ত্রধারণ করবে। তখন যদি আপনারা বিপদ দেখে মুখ ফিরিয়ে নেন, তখন কী হবে?”

তারা হযরত আব্বাসের কথার কোন জবাব না দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি বলেন, তা শুনতে চান। তখন নবী করিম (স.) প্রথমে কুরআন তেলাওত করেন, এরপর বলেন : “আমি আমার জন্মভূমি মক্কা ছেড়ে তোমাদের সাথে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত আছি। কিন্তু আমার নিকট তোমাদের প্রতিজ্ঞা করতে হবে যে, যেভাবে তোমরা নিজেদের পিতা, পুত্র ও অন্যান্য স্বজনদের সুখে দুখে, বিপদে-আপদে সাহায্য করে থাক, সেভাবে আমাকে এবং আমার সাথী মুহাজিরদের সাহায্য করতে হবে। আর সত্য দ্বীন প্রচার ও প্রসারে নিজেদের জান-মাল কুরবানী করতে হবে। এতে তোমরা সম্মত আছ কি?”

তারা জিজ্ঞাসা করে : “ইয়া রাসূলাল্লাহ, আমরা যদি আমাদের জান-মাল আল্লাহর জন্য কুরবাণী করি; তবে এর বিনিময়ে আমরা কী পাব?”

জবাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : “এর বিনিময়ে তোমরা জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি ও জান্নাত লাভ করবে।”

তখন মদীনাবাসী আনসারদের পক্ষ হতে আবুল হায়সাম বলেন : “ইয়া রাসূলাল্লাহ! বর্তমানে মদীনার ইয়াহুদীদের সাথে আমার সন্ধি চুক্তি আছে, আমরা আপনার হাতে বায়‘আত গ্রহণের পর, তা আর থাকবে না। কিন্তু মুসলিম শক্তি প্রতিষ্ঠিত হলে, আপনি কি আমাদের ছেড়ে মক্কায় চলে যাবেন?”

এ সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন : “কখনো এরূপ হবে না। আমরা তোমাদের এবং তোমরা আমাদের। চিরদিন আমরা এক সাথে থাকবো, আমাদের জীবন-মরণ সব কিছু একসাথে হবে।”

বায়‘আত গ্রহণ 

এরপর তারা সন্তুষ্ট হয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে বায়‘আত গ্রহণ করে বললো :

আমরা আমাদের জান-মাল সবই আল্লাহ্ ও রাসূলের জন্য কুরবাণী করবো।

এটিই ‘আকাবার দ্বিতীয় বায়‘আত। নবূওতের চতুর্দশ বছর : ৬২৪ খৃষ্টাব্দ, ১ম হিজরী, বয়স ৫৪ বছর।

তথ্যসূত্র

  1. ইবনে হিশাম, সীরাতুর রাসূল, সীরাতে হালবিয়াহ
  2. ওয়াহিদী আসবাবু নুযূলিল কুরআন, পৃ. ৪৮৯-৪৯০
  3. সীরাতুর রাসূল, সীরাতে হালবিয়া ও তাবাকাতে ইবনে সা‘দ
  4. সীরাতে রাসূল ও সীরাতে ইবন হিশাম।
  5. ইবনে হিশাম
  6. আল্-হাদীস, জামি তিরমিযী, দিল্লী; ২য় খন্ড, পৃষ্ঠা-২০৯।
  7. উল্লেখ্য যে, ইসলাম কবুলের পর হযরত ওমর (রা)-এর দৈহিক কোন পরিবর্তন হয়নি, হয়েছিল মনের (কলবের) পরিবর্তন। লাত-মানতের স্থানে আল্লাহ্ অধিষ্ঠিত হন। একে কুরআনের ভাষায় তায্কিয়া’ বলা হয়েছে, যাকে আত্মশুদ্ধি বলা হয়। (গ্রন্থকার)
  8. ইবনে কাছীর, ইবনে হিশাম, ইসাবা ও সীরাতে হালবিয়া
  9. আল্-হাদীস, সহীহ বুখারী, ১ম খন্ড
  10. ইবনে হিশাম, তাবারী ও সীরাতে হালবিয়া
  11. হযরত খাদীজা ৬৫ বছর বয়সে ইনতিকাল করেন।
  12. আল্-কুরআন, সূরা বণী ইসরাইল-১৭, আয়াত-১
  13. ইবনে হিশাম
  14. সহীহুল বুখারী, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা ৭।
  • বিশ্বনবীঃ সন-ভিত্তিক জীবন তথ্য! (লেখকঃ ডক্টর আ.ফ.ম. আবু বকর সিদ্দীক)