ওহুদের যুদ্ধের পর থেকে খন্দকের যুদ্ধের পূর্ব পর্যন্ত

From Sunnipedia
Jump to: navigation, search
নবূওতের সপ্তদশ বছর - ৬২৭ খৃষ্টাব্দ, ৪র্থ হিজরী, বয়স ৫৭ বছর।
মদীনা ও ইসলামের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের প্রতিহতকরণ 
১. আবু সালামার অভিযান

ওহুদ যুদ্ধের পর ৩য় হিজরীর বাকী দিনগুলো শান্তিতে কাটে। ৪র্থ হিজরীর শুরুতেই অশান্ত অবস্থা শুরু হয়। মুহাররম মাসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খবর পান যে, আসাদ গোত্রের তাল্হা ও সালিমা অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত হয়ে মদীনা আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। তখন রাসূলুল্লাহ (স.) তাদের বিরুদ্ধে আবূ সালমার নেতৃত্বে ১৫০ জন মুসলিম সৈন্যের একটি বাহিনীকে পাঠান এবং তাদের পরাজিত করে এবং ফেলে যাওয়া সম্পদ নিয়ে আসে।

২. খালিদ ইবন সুফিয়ান হযলীর বিদ্রোহ 

এ ব্যক্তি ‘ওরনা’ নামক অঞ্চলের নেতা ছিল। সে সৈন্য নিয়ে মদীনা আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুত হয়। রাসূলুল্লাহ (স.) তার বিরুদ্ধে আবদুল্লাহ ইবনে উনায়স (রা.)-কে পাঠান। আবদুল্লাহ (রা.) তাকে হত্যা করে।

৩. বিরে মাউনার ঘটনা 

নজদবাসী জনৈক আমির অনেক হাদিয়া নিয়ে রাসূলুল্লাহ (স.)-এর সাথে দেখা করে বলে : আপনি যদি উপযুক্ত লোককে আমাদের ওখানে পাঠান, তবে অনেকেই ইসলাম কবুল করবে। নবী করীম (স.) তার কথা বিশ্বাস করে ৭০ জন বিশিষ্ট আলিমকে পাঠায়। কিন্তু তারা বিশ্বাস ঘাতকতা করে তাঁদের হত্যা করে। রাসূলুল্লাহ (স.) এক মাস পর্যন্ত বিরে মাউনার জালিমদের উপর বদ-দু‘আ করে কুনুতে নাযিলা পড়তেন।

৪. বনূ নযীর যুদ্ধ 

বনূ নযীর ইয়াহুদী গোত্র ছিল। তারা গোপনে রাসূলুল্লাহ (স.)-কে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। আল্লাহ্ তা‘য়ালা ওহী মারফত তাঁকে এ খবর জানিয়ে দেন। তখন তিনি (স.) তাদেরকে এরূপ নির্দেশ দেন :

তোমাদের ১০ দিন সময় দেয়া হলো। এ সময়ের মধ্যে তোমরা মদীনা ছেড়ে চলে যাবে। এরপর তোমাদের যাকেই মদীনায় পাওয়া যাবে, তাকে হত্যা করা হবে।

বনূ নযীর রাসূলুল্লাহ (স.)-এ এ নির্দেশ প্রত্যাখ্যান করে এবং বলে :

আমরা তোমার আদেশ মানি না। তুমি যা পার, তা কর।

এ বলে তারা তাদের দুর্গে আশ্রয় নেয়।

তখন রাসূলুল্লাহ (স.) একদল মুসলিম সৈন্য, হযরত আলী (রা.)-এর নেতৃত্বে প্রেরণ করেন। তারা তাদের দুর্গ অবরোধ করলে ২১ দিন পরে তারা রাসূলুল্লাহ (স.)-এর নিকট এ প্রস্তাব পাঠায় :

আপনি দয়া করুন, আমাদের হত্যা করবেন না, আমরা দেশত্যাগ করে চলে যাব।


এমন দেশদ্রোহী বিশ্বাসঘাতকদের হাতের মুঠোর মধ্যে পেয়ে ও রাসূলূল্লাহ (স.) তাদের শাস্তি দেননি। তিনি তাদের প্রস্তাব গ্রহণ করেন একটি শর্ত সাপেক্ষে। আর তা হলো :

শহর ত্যাগের সময় তোমরা কোন অস্ত্র সঙ্গে নিতে পারবে না।

তারা এ প্রস্তাব মেনে নেয় এবং সিরিয়ার দিকে চলে যায়। এতে মুসলমানদের প্রভাব প্রতিপত্তি অনেক বেড়ে যায় এবং তাদের পরিত্যক্ত ভূসম্পত্তি ও অস্ত্রশস্ত্র মুসলমানদের অধিকারে আসায় তাঁরা যথেষ্ঠ লাভবান হয়।

৫. দ্বিতীয় বদর 

ওহুদ যুদ্ধ থেকে ফিরে যাওয়ার সময় আবু সুফিয়ান মুসলমানদের উদ্দেশ্য করে বলেছিল : আগামী বছর বদর প্রান্তরে তোমাদের সাথে আমাদের যুদ্দ হবে। রাসূলুল্লাহ (স.) এ চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন এবং ৪র্থ হিজরীর শাবান বা যুলকাদা মাসে বদর প্রান্তরে যুদ্ধের জন্য গমন করেন। এ খবর জেনে আবু সুফিয়ান কিছু দূর গিয়ে তার সৈন্যদের বলে :

এ দুর্ভিক্ষের বছর যুদ্ধ করা উচিত হবে না। চল, আমরা ফিরে যাই।

তখন তারা সেখান থেকে ফিরে যায়। যুদ্ধ হয়নি।

৬. আরো কয়েকটি ঘটনা 
১. ৪র্থ হিজরীর শাবান মাসে হযরত হুসায়ন (রা.) জন্ম গ্রহণ করেন।
২. এ বছর রাসূলূল্লাহ (স.) যয়নব বিনতে খুযায়মা (রা.)-কে বিবাহ করেন এবং এ বছরই তিনি ইন্তিকাল করেন।
৩. এ বছর শাওয়াল মাসে রাসূলূল্লাহ (স.) উম্মে সালামা (রা.)-কে বিবাহ করেন।
৪. এ বছর রাসূলুল্লাহ (স.) যায়দ বিন সাবিত (রা.)-কে হিব্রু ভাষা শিখতে বলেন। যায়দ পনের দিনের চেষ্টায় হিব্রু ভাষায় যথেষ্ট ব্যুৎপত্তি লাভ করেন।
৫. এ বছর ‘মদপান করা হারাম’- এ মর্মে নিষেধাজ্ঞা সূচক স্পষ্ট আয়াত নাযিল হয়।
নবূওতের অষ্টাদশ বছর - ৬২৮ খৃষ্টাব্দ, ৫ম হিজরী, বয়স ৫৮ বছর।
আরব গোত্রের শত্রুতা 
১. যাতুর রিকা অভিযান 

রাসূলুল্লাহ (স.) খবর পান যে, আনসার ও সালাবা গোত্রদ্বয় মদীনা আক্রমণ করতে প্রস্তুত। এ সংবাদ পেয়ে তিনি ৫ম হিজরীর ১০ই মুহাররম ৭০০ শত সৈন্য নিয়ে মদীনা থেকে বের হন। এ সময় তিনি হযরত উসমান (রা.)-কে মদীনার শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। রাসূলুল্লাহ (স.) ‘য়াতুর রিকা’ নামক স্থানে উপস্থিত হয়ে জানতে পারেন যে, শত্রæরা ভয়ে পালিয়ে গেছে। কোন যুদ্ধ হয়নি। তিনি (স.) সেখান থেকে মদীনায় ফিরে আসেন।

২. দুমা অভিযান 

৫ম হিজরীর রবিউল আউয়াল মাসে রাসূলুল্লাহ (স.) খবর পান যে, দুমাতুল জন্দলের অধিবাসীরা মদীনা আক্রমণের জন্য আসছে। তখন তিনি (স.) এক হাজার সৈন্য নিয়ে তাদের প্রতিহত করার জন্য বের হন। এ খবর পেয়ে শত্রæরা ভয়ে পালিয়ে যায়। কোন যুদ্ধ হয়নি। সেখান থেকে তিনি মদীনায় ফিরে আসেন।

৩. বনূ মুস্তালিক অভিযান 

এ স্থানটি মদীনা থেকে নয় মনযিল দূরে অবস্থিত। বনূ মস্তালিকের নেতা ছিল হারিস বিন যিরারা। কুরায়শদের প্ররোচনায় মদীনা আক্রমণের জন্য সে সৈন্য সংগ্রহ করছিল। ঘটনা সত্য জেনে রাসূলুল্লাহ (স.) ২রা শাবান তাদের মুকাবিলা করার জন্য বের হন। শত্রুরা যুদ্ধে পরাজিত হয়। তাদের দশজন মুসলমানদের হাতে বন্দী হয়। অনেক গণীমতের মাল মুসলমানদের হস্তগত হয়। রাসূলুল্লাহ (স.) হারিস কন্যা বরাকে বিবাহ করেন এবং তাঁর নাম রাখেন জুযায়রিয়া (রা.)।

৪. হযরত আয়েশা (রা.) চরিত্রে কলঙ্ক লেপনের চেষ্টা 

এ হিজরীর অন্যতম ঘটনা। হযরত আয়েশা (রা.)-এর চরিত্রে কলঙ্ক লেপন। বনূ মুস্তালিক মদীনা আক্রমণের জন্য কুরায়শদের সাথে ষড়যন্ত্র করছে, এ খবর পেয়ে রাসূলুল্লাহ (স.) তাদের বিরুদ্ধে অভিযানে বের হন। এ সময় হযরত আয়েশা (রা.) ভিন্ন বাহনে তাঁর সাথে ছিলেন। সেখান থেকে ফেরার সময় রাসূলুল্লাহ (স.) কোন এক মনযিলে অবস্থান করেন। শেষ রাতে যখন সবাই পুনরায় সফর শুরু করে, তখন আয়েশা (রা.) স্বভাবের তাকিদে বাহন থেকে নেমে একটু আড়ালে যান। প্রয়োজন সেরে তিনি তিনি যখন তাঁর বাহন উঠবেন, তখন দেখেন, তাঁর গলায় হার নেই। হার খুঁজার জন্য আবার তিনি পূর্বস্থানে ফিরে যান। এদিকে তাঁর বাহকগণ মনে করে, তিনি বাহনে উঠেছেন। আয়েশা (রা.) ক্ষীণকায়া ছিলেন; ফলে তার বাহনের বাহকেরা বুঝতে পারেননি, তিনি ভিতরে আছেন কিনা? এরপর কাফেলা যাত্রা শুরু করে। এদিকে আয়েশা (রা.) ফিরে এসে দেখেন কাফেলা চলে গেছে। কোন উপায় না দেখে তিনি সেখানে অপেক্ষা করতে থাকেন। অবেেশষে হযরত সাফওয়ান (রা.)[1] তাঁকে নিজের বাহনে উঠিয়ে, নিজের উটের লাগাম ধরে টেনে নিয়ে যান এবং মদীনার কাছে এসে তিনি কাফেলার সাথে মিলিত হন। এ ঘটনায় মুনাফিক স্বভাবের লোকেরা বিবি আয়েশার চরিত্রের উপর কটাক্ষপাত করতে থাকে। রাসূলুল্লাহ (স.) যদিও তাঁর চরিত্রের পবিত্রতা সম্বন্ধে নিশ্চিত ছিলেন, তবুও তিনি মানসিক দুশ্চিন্তা হতে মুক্ত ছিলেন না। তিনি (স.) বিষয়টি আল্লাহ্র উপর ছেড়ে দেন। ফলে, আয়েশা (রা.)-এর পূত:-চরিত্রের বর্ণনায় আল্লাহ্ তা‘য়ালা কুরআনের আয়াত করেন। যা হলো :

নিশ্চয় যারা এ অপবাদ রটনা করেছে, তারা তো তোমাদের মধ্যে থেকে একটি ক্ষুদ্র দল[2]। তোমরা এ অপবাদকে তোমাদের জন্য মন্দ বলে মনে করো না, বরং এটাতো তোমাদের জন্য কল্যাণকর।[3]

— ২৯. আল্-কুরআন, সূরা নুর, আয়াত : ১১

তথ্যসূত্র

  1. হযরত সাফওয়ান (রা)-এর দায়িত্ব ছিল, কেউ কোন কিছু ফেলে গেলে, তা নিয়ে যাওয়া। রাসূলুল্লাহ (স.) তাকে কাফেলার পেছনে থাকার নির্দেশ দেন।
  2. এ অপবাদ আবদুল্লাহ ইবন উবাই মুনাফিকের তৈরী ছিল, যা বিশ্বাস করেছিল মিস্তাহ, হাসমান ও হামনা। অন্যান্য সব সাহাবীরা তা মিথ্যা বলে প্রত্যাখ্যান করেছিল ।
  3. কারণ, সবর করার ফলে, আল্লাহ্ তা‘য়ালা তাদের মহাপূণ্যের ও বিশেষ মর্যাদা দান করেন। বিশেষ করে এ ঘটনা হযরত আয়েশা (রা)-এর জন্য অত্যন্ত কল্যাণকর, যা চিরদিন সবার জন্য আদর্শস্বরূপ।
  • বিশ্বনবীঃ সন-ভিত্তিক জীবন তথ্য! (লেখকঃ ডক্টর আ.ফ.ম. আবু বকর সিদ্দীক)