খন্দকের যুদ্ধ থেকে হুদায়বিয়ার সন্ধির পূর্ব পর্যন্ত

From Sunnipedia
Jump to: navigation, search
খন্দকের যুদ্ধ
ইয়াহুদী মুশরিক সম্মিলিত বাহিনীর মদীনা আক্রমণের সিদ্ধান্ত 

মুশরিকদের মত ইয়াহুদীরাও মুসলমানদের কঠোর শত্রু হয়ে যায়। তারাও মুশরিক ও মুনাফিকদের যোগসাজশে মুসলমানদের বিরুদ্দে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। সেমতে ইয়াহুদী সর্দাররা মক্কায় গিয়ে কুরায়েশ নেতাদের উদ্বুদ্ধ করে রাসূলুল্লাহ (স.)-এর বিরুদ্দে যুদ্ধ করার জন্য। সাথে কুরায়েশ নেতারা বায়তুল্লাহ শরীফে গিয়ে ইয়াহুদীদের সাথে মিলে মদীনা আক্রমণের শপথ নেয়।

এক কথায় তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে লড়ার জন্য প্রায় গোটা আরবের ইয়াহুদী ও মুশরিকদের ঐক্যবদ্ধ করে এবং যুদ্ধের জন্য দশ হাজার সৈন্যের এক বিশাল বাহিনী গড়ে তোলে। যাতে কয়েক হাজার উট ও কয়েক শত ঘোড়া ছিল। এরা মুসলমানদের দুনিয়া থেকে চিরতরে বিদায় করার সংকল্প নিয়ে মদীনার দিকে যাত্রা করে।

মুসলমানদের প্রস্তুতি 

মক্কার খুযাআ গোত্র মুসলমানদের মিত্র ছিল। যখন এ শত্রুবাহিনী মদীনা আক্রমণের উদ্যোগ নেয়, তখন তারা এ খবর দ্রুত রাসূলুল্লাহ (স.)-এর কাছে পৌঁছে দেয়। তিনি শীর্ষস্থানীয় সাহাবাদের ডেকে পরামর্শ করে জানতে চান :

এ অবস্থায় আমরা কি মদীনার বাইরে গিয়ে শত্রুদের মুকাবিলা করব , না এখানে থেকেই তাদের প্রতিহত করবো?

তখন হযরত সালমান ফারসী (রা.) বলেন :

ইয়া রাসূলাল্লাহ্ ! আমাদের পারস্যের রীতি হলো- যখন শত্রু দ্বারা আক্রান্ত হবার আশংকা দেখা দেয়, তখন তারা শহরের চারদিকে খন্দক বা পরীখা খুঁড়ে তারা এর পেছনে থেকে শত্রুদের মুকাবিলা করে। আমার মতে, উক্ত রণণীতি অনুসরণ করে, মদীনার চারপাশে পরিখা খনন করে, আমরা তার এ পাশে থেকে শত্রুর আক্রমণ প্রতিহত করবো।

রাসূলুল্লাহ (স.) ও সাহাবীদের এ পরামর্শ খুবই পছন্দ হয়। তাই তিনি (স.) সাহাবাদের এ কাজ শুরু করার নির্দেশ দেন। রাসূলুল্লাহ (স.) নিজে ও একাজে সহযোগীতা করেন। ফলে, সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অতি অল্প সময়ের মধ্যে খন্দক তৈরীর কাজ শেষ হয়। [1]

উভয় দল মুখোমুখী 

যথা সময়ে সম্মিলিত শত্রুবাহিনী মদীনার উপকণ্ঠে এসে উপস্থিত হলো। তাদের ধারণা ছিল, যখন খুশী তারা মদীনায় ঢুকে পড়ে ব্যাপক হামলা চালাবে। কিন্তু খন্দক দেখে তারা বিস্মিত ও দিশেহারা হলো। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশিষ্ট সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুমকে শহরের দায়িত্ব দেন এবং নিজেই ‘কমান্ডার ইন চিফ’-এর দায়িত্ব পালন করেন।

সম্মিলিত শত্রুবাহিনী উত্তেজিত হয়ে খন্দকের কাছে ছুটে আসতো, কিন্তু খন্দকের গভীরতা ও প্রশস্ততা দেখে হতাশ হয়ে ফিরে যেত। তারা মাঝে মাঝে মুসলমানদের দিকে তীর ছুঁড়তো। তার জবাব মুসলমানরা তীর ছুড়ে দিত। কখনো একসাথে, আবার কখনো দলে দলে শত্রুবাহিনী আক্রমণ চালাতে থাকে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় না, তারা পরীখা-প্রাচীর অতিক্রম করতে পারে না।

প্রচন্ড শীত, মুক্ত প্রান্তর, আর রসদপত্রও ফুরিয়ে আসছে। দশ হাজার লোকের খাবার ব্যবস্থা সহজ নয়। তারা ভেবেছিল, অতি সত্বর তারা মদীনা জয় করে, রাসূলুল্লাহ (স.) ও তাঁর সাথীদের নির্মুল করে ফিরে যাবে। কিন্তু দু’সপ্তাহ পার হলো, অথচ কিছুই হলো না। এতে সম্মিলিত শত্রুবাহিনী দুর্ভাবনায় পড়ে এবং অবরোধ তুলে তারা ফিরে যাবার চিন্তা করে।

গায়েবী সাহায্য 

এ সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরূপ দু‘আ করেন :

হে কুরআন নাযিলকারী, দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী আল্লাহ্! আপনি সমবেত শত্রু বাহিনীকে পরাস্ত করুন, তাদের পরাজিত করুন এবং আমাদের সাহায্য করুন তাদের বিরুদ্ধে বিজয় দিয়ে।

আল্লাহ্ তাঁর রাসূলের দু‘আ কবুল করেন। তখন আকাশে হঠাৎ কালো মেঘ দেখা দিল। দেখতে দেখতে প্রচন্ড মরুঝড় শুরু হলো, যা শত্রু সেনাদের সব ছাউনি উড়িয়ে নিল, আর সাথে সাথে মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ শুরু হলো। তাদের শিবিরের আগুন নিভে গেল। রসদপত্র ও অন্যান্য উপকরণ ভেঙেচুরে লন্ডভন্ড হয়ে গেল। শত্রুসেনাদের দুর্গতির সীমা ছাড়িয়ে গেল। আল্লাহ্র গযব তাদের উপর আপতিত হলো। তারা ভীত-সন্ত্রস্ত ও দিশেহারা হয়ে সে রাতেই মদীনা ত্যাগ করে ফিরে যায়।

পরদিন ভোর বেলা দেখা যায়, ময়দান একদম সাফ। শত্রুবাহিনীর নামগন্ধও নেই; আছে শুধু তাদের করুন স্মৃতি, ছিন্নভিন্ন শিবির, ভাঙা আসবাবপত্র এবং নির্বাপিত আগুনের সিক্ত ভস্মস্তুপ। এ সম্পর্কেই আল্লাহ্ তা‘য়ালার বাণী :

হে ঈমানদারগণ! তোমরা তোমাদের প্রতি আল্লাহ্র সে অনুগ্রহের কথা স্মরণ কর, যখন শত্রুবাহিনী তোমাদের উপর চড়াও হয়েছিল, তখন আমি তাদের উপর প্রেরণ করেছিলাম এক প্রচন্ড বায়ু এবং এমন এক বাহিনী, যাদের তোমরা দেখতে পাওনি।

— আল্-কুরআন, সূরা আহযাব, আয়াত : ৯

বনী কুরায়যার গাদ্দারী ও পরিণতি 

খন্দকের যুদ্ধের সময় বনূ কুরায়যা রাসূলুল্লাহ (স.)-এর সাথে কৃত শান্তি চুক্তি অমান্য করে সম্মিলিত শত্রুবাহিনীর সাথে যোগ দেয়। যুদ্ধ শেষে কুরায়শসহ অন্য বাহিনী ফিরে গেলে, আল্লাহ্র নির্দেশে তিনি বনূ কুরায়যাদের উপর আক্রমণ করেন। তিনি সাহাবীদের বলেন :

তোমরা একটুও বিলম্ব না করে বনূ কুরায়যার দুর্গ অবরোধ কর। এখনই তোমরা বেরিয়ে যাও এবং সেখানে গিয়ে আসরের সালাত আদায় কর।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ পাওয়ার পর হযরত আলী (রা.)-এর নেতৃত্বে সাহাবায়ে কিরাম বনূ কুরায়যার দূর্গ অবরোধ করে। ২৫ দিন অবরুদ্ধ থাকার পর য়াহুদীরা আত্মসমর্পণ করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং দূত মারফৎ খবর পাঠায় :

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি তাদের ক্ষমা করেন, তবে বনু কাইনুকা ও বনূ নযীরের ন্যায় তারা ও দেশ ছেড়ে চলে যাবে।

কিন্তু রাসূলুল্লাহ (স.) তাদের এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে এরূপ বিকল্প প্রস্তাব দেন যে, তারা বেরিয়ে এসে তাদের কোন বন্ধু বা চুক্তিবদ্ধ ব্যক্তিত্বকে শালিস মানুক এবং তিনি তাদের ব্যাপারে যে ফয়সালা দেবেন, তা তিনি (স.) মেনে নেবেন।

হযরত সা‘আদ ইবনে মা‘আয (রা.) ইয়াহুদীদের বন্ধু এবং গোত্রের নেতা ছিলেন। ইয়াহুদীরা তাকেই শালিস মানলো। তিনিই বনী কুরায়যার গাদ্দারীর পর্যবেক্ষক ছিলেন এবং তিনি তাদের রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে গাদ্দারী করতে নিষেধ করায়, তারা তাঁকে ধমক দিয়ে বলেছিল :

রাসূলুল্লাহ (স.) কে? আমরা তাকে চিনি না।

হযরত সা‘দ (রা.) তাঁর রায়ে বলেন :

বনূ কুরায়যার সকল পুরুষকে হত্যা করা হবে, তাদের নারী ও সন্তানদের গ্রেফতার করা হবে এবং তাদের সব ধন-সম্পদ বন্টন করা হবে।

এ রায় শুনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন :

তুমি আল্লাহ্ তা‘য়ালার মর্জিমত ফয়সালা দিয়েছ।

তারপর সে ফয়সালা কার্যকর করা হয় এবং তারা তাদের কৃতকর্মের যথাযথ ফল লাভ করে। ফলে, মদীনা ইয়াহুদীদের ষড়যন্ত্র থেকে পবিত্র ও মুক্ত হয়। [2]

৫ম হিজরীর আরো কয়েকটি বিশেষ ঘটনা 
১. যায়েদ ইবন হারিসার তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রী হযরত যয়নব বিন্তে জাহাশের সাথে রাসূলুল্লাহ (স.)-এর বিবাহ। যে সম্পর্কে আল্লাহর বাণী :

আর আপনি আপনার অন্তরে এমন বিষয় গোপন করছিলেন, যা আল্লাহ্ প্রকাশ করে দিয়েছেন। আর আপনি মানুষকে ভয় করছেন, অথচ আল্লাহ্কে ভয় করা আপনার জন্য অধিক সমীচীন। তারপর যায়দ যখন যয়নবের সাথে বিবাহ সম্পর্ক ছিন্ন করলো, তখন আমি তাকে আপনার সাথে বিবাহ দিলাম। যাতে মুমিনদের পোষ্যপুত্ররা তাদের স্ত্রীদের সাথে বিবাহ সম্পর্ক ছিন্ন করলে, সে সকল স্ত্রীদের বিবাহ করার ব্যাপারে মুমিনদের কোন অসুবিধা না থাকে। আর আল্লাহর নির্দেশ কার্যকরী হয়েই থাকে।

— আল্-কুরআন, সূরা আহযাব, আয়াত : ৩৭

২. হিজরী ৫ম সনে পর্দার হুকুম নাযিল হয়। এর আগে মুসলিম নারীরা বেপর্দায় বাইরে চলাফেরা করতো।
৩. এ সনেই যিনার শাস্তি এবং কারো প্রতি যিনার অপবাদ দিয়ে প্রমাণ করতে অক্ষম হলে, অপবাদকারীর শাস্তির বিধান ও পঞ্চম হিজরী সনে নাযিল হয়।

[3]

তথ্যসূত্র

  1. সীরাতে হালবিয়া ও সীরাতে ইবন হিশাম।
  2. সীরাতে হালবিয়া, আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া।
  3. মাওলানা শিব্লী নু‘মানী; সিরাতুন্নবী, পৃ: ৪৪৬।
  • বিশ্বনবীঃ সন-ভিত্তিক জীবন তথ্য! (লেখকঃ ডক্টর আ.ফ.ম. আবু বকর সিদ্দীক)