খায়বার বিজয় থেকে মুতার যুদ্ধ পর্যন্ত

From Sunnipedia
Jump to: navigation, search
নবূওতের বিশ বছর - ৬৩০ খৃষ্টাব্দ, ৭ম হিজরী, বয়স ৬০ বছর।
খায়বার বিজয় 

হুদায়বিয়া থেকে ফিরে এসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিছুদিন মদীনায় অবস্থান করেন। এরপর ৭ম হিজরীর প্রারম্ভে তিনি (স.) খায়বার অভিযানে বের হন। তাঁর সাথে ১৬০০ সাহাবী যোদ্ধা ছিলেন। তাঁদের মাঝে ২০০ ছিলেন অশ্বারোহী। এবার তাঁর সাথী ছিলেন উম্মুল মু’মিনিন হযরত সালমা (রা.)। রাসূলুল্লাহ (স.) হযরত নুমায়লা (রা.)-কে মদীনায় তাঁর স্থলাভিষিক্ত করে যান।

তিনি (স.) যখন খায়বরের কাছাকাছি পৌঁছান, তখন অনেক রাত থাকায় সেখানে ছাউনি ফেলার নির্দেশ দেন। কারণ, তাঁর রীতি ছিল, রাতে কোন আক্রমন পরিচালনা না করা। সকাল বেলা খায়বরের ইয়াহুদী কৃষকরা তাদের কৃষি-যন্ত্র ও সামগ্রী নিয়ে চাষাবাদের জন্য বের হয়ে তারা দেখতে পেল, তাদের চাষের জমির বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে মুসলমানরা তাবু ফেলে অবস্থান করছে। মুসলমানদের দেখে তারা ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ছুটে পালাবার সময় চীৎকার করে বলতে লাগলো :

মুহাম্মদ (স.) তাঁর সৈন্যদের নিয়ে এসে গেছেন।

তারা দুর্গে পৌঁছে ইয়াহুদীদের এ খবর জানালে, ইয়াহুদী সর্দাররা কিভাবে মুসলমানদের মুকাবিলা করবে, তা নিয়ে শলা-পরামর্শ শুরু করে। খায়বরে ইয়াহুদীদের কয়েকটি সুদৃঢ় দুর্গ ছিল এবং তাদের সংখ্যা ও শক্তিও ছিল প্রচুর। তারা সিদ্ধান্ত নেয় যে, তারা তাদের ধন-সম্পদ ও স্ত্রী-পুত্র একটি সংরক্ষিত দুর্গে রেখে, নিজেরা অন্যান্য দুর্গের দরজা বন্ধ করে অবস্থান করবে।

দুর্গের পর দুর্গ দখল 

মুসলমানরা ইয়াহুদী দুর্গগুলোকে কঠোরভাবে অবরোধ করে রাখে। ইয়াহুদীরা দুর্গের ভেতর থেকে মুকাবিলা করতো। এ সময় মুসলমানরা ‘নায়েম দুর্গ দখল করে নেয়। এরপর তারা ‘কামূস’ দূর্গ অবরোধ করে। যা হযরত আলী (রা.)-এর নেতৃত্বে মুসলমানরা দখল করে নেয়। যুদ্ধ শেষে দেখা যায়, এ যুদ্ধে ৯২ জন ইয়াহুদী নিহত হয় এবং ১৫ জন মুসলিম সৈন্য শহীদ হন।

প্রায় তিন সপ্তাহ অবরুদ্ধ থাকার পর সমস্ত ইয়াহুদী দুর্গ মুসলিমদের হস্তগত হয়। তখন নিরূপায় হয়ে ইয়াহুদীরা রাসূলুল্লাহ (স.)-এর নিকট আত্মসমর্পন করে। তখন তিনি নিম্নে বর্ণিত শর্তে ইয়াহুদীদের সাথে শান্তি স্থাপন করেন :

১. ইয়াহুদীরা পূর্বের ন্যায় সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে তাদের ধর্ম পালন করতে পারবে, তাতে কেউ বাধা দিতে পারবে না।
২. মুসলমানদের ন্যায় তাদেরকে যুদ্ধ করার জন্য বাধ্য করা হবে না।
৩. তাদের বাড়ীঘর ও ধন-সম্পত্তি আগের মত তাদেরই অধিকারে থাকবে। তবে এখন হতে তাদের সমস্ত ভূ-সম্পত্তি মদীনার মুসলিম সরকারের অন্তর্ভুক্ত হবে।
৪. উৎপন্ন শস্যাদির অর্ধেক অংশ রাজস্বস্বরূপ মদীনায় পাঠাতে হবে, এবং
৫. অন্য কোন কর তাদের দিতে হবে না।
‘উমরাতুল কাযা আদায় 

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খায়বর বিজয় শেষে মদীনায় এসে ঘোষণা দেন যে, যারা হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় আমার সাথে ছিল, তারা অবশ্যই আমার সাথে মক্কায় ‘কাযা উমরা’ আদায় করার জন্য যাবে। এরপর রাসূলুল্লাহ (স.) ৭ম হিজরীর যিলক্বাদ মাসে হযরত আবু যর গিফারী (রা.)-কে মদীনায় তাঁর স্থলাভিষিক্ত করে ২০০০ সাহাবীসহ মক্কার পথে রওয়ানা হন। তিনি তাঁর সাথে ৬০টি কুরবানীর উট সাথে নেন এবং এদের গলায় কুরবানীর নিদর্শন জুড়ে দিয়ে কাফেলার অগ্রভাগে রাখেন।

রাসূলূল্লাহ (স.) মক্কার প্রবেশ করে সরাসরি হারাম শরীফে তাশরীফ নেন এবং সাহাবাদের নিয়ে বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করেন। তারপর তিনি (স.) তাঁর সাহাবীদের নিয়ে সাফা ও মারওয়ার মধ্যেকার সায়ী সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি কুরবানী সম্পন্ন করে তাঁর মাথা মুন্ডন করেন এবং সাহাবীরা তাদের চুল কাটান, এভাবেই রাসূলুল্লাহ (স.) ও সাহাবায়ে কিরাম ‘কাযা উমরা’ আদায় করেন।

দেখতে দেখতে তিন দিন শেষ হয়ে যায়। চতুর্থ দিনে কুরায়েশরা এসে রাসূলুল্লাহ (স.)-কে মক্কা ত্যাগ করে চলে যেতে বললে, তিনি তা-ই করেন।

খালিদ, আমর ও উছমানের ইসলাম গ্রহণ 

আল্লাহ্ তা‘য়ালার মেহেরবানীতে হযরত খালিদ ইবনে ওলীদ ও উছমান ইবনে তাল্হা ইসলাম গ্রহণ করার জন্য মক্কা থেকে মদীনার দিকে রওয়ানা হলে, পথের মাঝে আমর ইবনে আসের সাথে তাদের দেখা হয়।

তিনি খালিদকে দেখে জিজ্ঞাসা করেন : “তোমরা কোথায় চলেছ?”

জবাবে খালিদ বলেন : “আল্লাহর কসম! এ ব্যাপারটি স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, মুহাম্মদ (স.) আসলেই আল্লাহ্র রাসূল। তাই ইসলাম কবুল করার জন্য তাঁর কাছে যাচ্ছি।

তখন আমর বলেন : “আল্লাহ্র কসম! আমিও ইসলাম কবুল করার জন্য তাঁর কাছে যাচ্ছি।”

হযরত খালিদ ও তাঁর সাথীদ্বয় যখন রাসূলুল্লাহ (স.)-এর নিকট উপস্থিত হন, তখন তিনি খুশী হয়ে সাহাবীদের বলেন : “মক্কা তার কলিজার টুকরোগুলো তোমাদের উপহার দিয়েছে।”

তারা সবাই বায়‘আত গ্রহণ করে পড়ে নেয় : “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ।”

এভাবে কুরায়েশদের তিন শ্রেষ্ঠ দিকপাল ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নেয় এবং বাকী জীবন ইসলামের সেবায় নিজেদের নিয়োজিত রাখে। [1]

মূতার যুদ্ধ 

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন রাজা-বাদশাহদের নিকট ইসলামের দাওয়াত সম্বলিত যেসব চিঠিপত্র পাঠান, তার একটি ছিল শুরাহবিল ইবনে আমর গাচ্ছানীর কাছে। শুরাহবিল সম্রাট হিরাক্বিয়াসের নিযুক্ত বুসরার গভর্নর ছিল। বুসরা ছিল সিরিয়ার একটি প্রদেশ। রাসূলুল্লাহ (স.) তার কাছে হারিছ ইবনে উমায়ের (রা)-কে চিঠি দিয়ে পাঠান। এ চিঠি নিয়ে তিনি যখন মদীনা থেকে মূতা নামক স্থানে পৌঁছান, তখন শুরাহবিল তাঁকে সেখানে হত্যা করায়। এ খবর জেনে রাসূলুল্লাহ (স.) শুরাহবিলকে শায়েস্তা করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি ৩০০০ সৈন্যের একটি বাহিনী প্রস্তুত করেন এবং হযরত যায়েদ (রা.)-কে এর সেনাপতি মনোনীত করেন। আরোও বলেন :

যদি যায়েদ শহীদ হয়, তবে জাফর ইবনে আবূ তালিব সেনাপতি হবে। যদি জাফরও শহীদ হয়, তাহলে আবদুল্লাহ ইবনে রাত্তাহা সেনাপতির দায়িত্ব নিবেন। এরপর যদি আব্দুল্লাহ শহীদ হয়, তবে মুসলিম বাহিনী যাকে ইচ্ছা তাদের সেনাপতি বানিয়ে নেবে।

সেনাবাহিনী প্রস্তুত হলে রাসূলুল্লাহ (স.) তাদের এগিয়ে দেয়ার জন্য ‘ছানিয়াতুল বেদা’ পর্যন্ত যান এবং এরূপ উপদেশ দেন :

আমি তোমাদের সবাইকে উপদেশ দিচ্ছি আল্লাহ্কে ভয় করার জন্য। তোমরা আল্লাহ্র সন্তুষ্টি লাভের জন্য জিহাদ করবে। সেখানে তোমরা গীর্জার পাদ্রীদের দেখতে পাবে, তাদের কিছু বলবে না। কোন নারী, শিশু ও বৃদ্ধকে হত্যা করবে না এবং গাছ-পালা ও ঘর-বাড়ীর ক্ষতি সাধন করবে না।

মুসলিম সেনাবাহিনী যখন সিরিয়ায় প্রবেশ করে, তখন তাদের মুকাবিলার জন্য এক লাখ সৈন্য প্রস্তুত করে, হিরাক্লিয়াস এক লাখ ও অন্যান্য খৃষ্টান সম্প্র‌দায়ের লোকেরা রোমকদের সাহায্যে সেখানে যায়। এভাবে তাদের সৈন্য সংখ্যা প্রায় আড়াই লাখে দাঁড়ায়। ‘মাআন’ নামক স্থানে পৌঁছে মুসলমানরা যখন জানতে পারে যে, শত্রুর বিশাল বাহিনী তাদের মুকাবিলার জন্য আসছে, তখন আবদুল্লাহ্ ইবন রাত্তাহা অত্যন্ত দৃপ্তকণ্ঠে বলেন :

বন্ধুগণ! তোমরা যে কাজের জন্য এসেছ, তা করতে ভয় পাবে না। তোমরা তো শহীদ হবার জন্য বেরিয়েছ। আমরা সংখ্যাও সমরশক্তির উপর নির্ভর করে যুদ্ধ করি না, আমরা তো আল্লাহ্র যমীনে আল্লাহ্র দ্বীনকে বিজয়ী করার জন্য যুদ্ধ করি। আমাদের সামনে দু’টি কল্যাণ রয়েছে, যার একটি আমরা অবশ্যই পাব। তা হচ্ছে- বিজয় অথবা শাহাদত।

এ কথা শুনে সবাই বললো :

আল্লাহর কসম! আবদুল্লাহ ঠিক কথা বলেছে।

তারপর মুসলিম বাহিনী পূর্ণ উদ্যম ও আবেগ নিয়ে রোমকদের মুকাবিলায় এগিয়ে গেল এবং মূতা প্রান্তরে পৌঁছে রোমক বাহিনীর সামনা-সামনি ছাউনি ফেললো। মুসলিম বাহিনীর সেনাপতি হযরত যায়েদ (রা.) এক হাতে ঝান্ডা এবং আরেক হাতে তরবারি নিয়ে বীরত্বের সাথে লড়াই করতে করতে শহীদ হলে, হযরত জাফর ইবনে আবূ তালিব এগিয়ে এসে ঝান্ডা হাতে নেন।

তিনি ও যুদ্ধ করতে করতে শহীদ হলে, হযরত আবদুল্লাহ (রা.) এসে ঝান্ডা তুলে নেন। অবশেষে তিনিও শহীদ হলে সমবেত বাহিনী অভিজ্ঞ বীরযোদ্ধা হযরত খালিদ ইবনে ওলীদ (রা.)-কে সেনাপতি মনোনীত করে। তিনি সারাদিন বীরবিক্রমে যুদ্ধ চালান এবং বিশাল রোমক বাহিনীকে স্তব্ধ করে দেন। যুদ্ধ থেমে যায় এবং উভয় বাহিনী তাদের তাঁবুতে ফিরে যায়। পরদিন যুদ্ধ শুরু হলে হযরত খালিদ (রা.) রোমকদের উপর প্রচন্ড হামলা করেন। সেদিন তাঁর হাতেই আটখানি তরবারী ভেঙ্গেছিল। রাসূলুল্লাহ (স.) খালিদের জন্য দু‘আ করে বলেন :

ইয়া আল্লাহ্! খালিদ তোমারই এক তরবারি। তুমি তাকে সাহায্য কর।

এ থেকেই হযরত খালিদ (রা.) ‘সায়ফুল্লাহ’ বা আল্লাহ্র তরবারি নামে খ্যাত হন। এদিন মুসলিম বাহিনী শত্রুদের উপর এমন প্রচন্ড হামলা করে যে, তারা এ আক্রমণের বেগ প্রতিহত করতে অক্ষম হয়ে অচিরেই ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যায়। তখন মুসলিম সৈন্যরা বহু গরীমতের মাল, বিজয় গৌরব নিয়ে মদীনায় ফিরে আসে। মূতা রনাঙ্গনের খবর রাসূলুল্লাহ (স.) মদীনায় থেকে ওহী যোগে জেনে বর্ণনা করেন। হযরত আনাস (রা.) বলেন :

মূতা হতে কোন সংবাদ আসার আগেই রাসূলুল্লাহ (স.) হযরত যায়দ, হযরত জাফর ও হযরত আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রা.)-এর শহীদ হওয়ার খবর বর্ণনা করে বলেন : ‘যায়দ পতাকা হাতে যুদ্ধে অগ্রসর হচ্ছে। একটু পরে বলেন- যায়দ শহীদ হলো। এখন জাফর পতাকা নিয়ে যুদ্ধে অগ্রসর হচ্ছে। কিছুক্ষণ পর বলেন- জাফর শহীদ হয়ে গেল। তারপর আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা পতাকা হাতে নিয়েছে এবং সে শহীদ হলো। রাসূলুল্লাহ (স.) যখন এরূপ খবর দিচ্ছিলেন, তখন তাঁর চোখ মোবারক থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছিল। এরপর তিনি (স.) বলেন: এখন সায়ফুল্লাহ্ খালিদ পতাকা হাতে নিয়েছে এবং আল্লাহ্ তা‘য়ালা বিজয় দান করেছেন।

— সহীহুল বুখারী, ২য় খন্ড, পৃ. ৬১১

রাসূলুল্লাহ (স.) শহীদ পরিবারের সদস্যদের প্রতি সহানুভূতি ও সমবেদনা জ্ঞাপন করে সবর করতে বলেন এবং তাদের জন্য কান্নাকাটি করতে নিষেধ করেন।

তথ্যসূত্র

  1. আল্-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, খাসায়েসে কুব্রা ও সীরাতে হালবিয়া
  • বিশ্বনবীঃ সন-ভিত্তিক জীবন তথ্য! (লেখকঃ ডক্টর আ.ফ.ম. আবু বকর সিদ্দীক)