জিনেরা মুসলমান হলো

From Sunnipedia
Jump to: navigation, search
মুহাম্মাদ (সঃ) এর মুজিজা সমূহ 2





























  • জিনেরা মুসলমান হলো

মানুষের মতই জিন এক বুদ্ধিমান প্রজাতি। ওরা আগুনে তৈরি অশরীরী অবস্থায় ওরা চলাফেরা করে। আবার নিজেদের ইচ্ছামত আকৃতি ধারণ করতে পারে। বিশেষ করে সাপের আকৃতি ধারণ করতে ওরা স্বাচ্ছন্দ বোধ করে। কুরআন-হাদীসে এদের উল্লেখ ও আলোচনা আছে। সৃষ্টিজীবের মাঝে কেবল মানুষ ও জীন জাতিরই আখিরাতে হিসাব ও বিচার আছে। এ উভয় জাতির প্রতিই কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। উভয়ের প্রতিই শরীয়তের হুকুম প্রযোজ্য। উভয়ের একত্রিত অবস্থানে মানুষ হলো ইমাম। মানুষ সর্বশ্রেষ্ঠ। জিনের পিছনে মানুষের এক্তেদা জায়েয নয়।

মানুষের মতো ওদের সমাজ আছে, শাসক আছে, আইন-শৃংখলা আছে। বিচার-আদালত আছে। মানুষ বিশেষের সাথে প্রয়োজন ওরা দেখা করে। কথাবার্তা বলে এবং বিশেষের সাথে প্রয়োজনে ওরা দেখা করে। কথাবার্তা বলে এবং বিশেষ সম্পর্কও স্থাপন করে।

হাদীস শরীফের বর্ণনা মতে পৃথিবীতে মানব জাতির আগমনের পূর্বে কেবল জিনদেরই বসবাস ছিল। বহুকাল, বহুকাল, বহু যুগ ধরে ওরাই ছিল পৃথিবীর একমাত্র বুদ্ধিমান বাসিন্দা। আল্লাহর । অনুগত ছিল। কালক্রমে ওদের মাঝে বিভ্রান্তি ও গোমরহী মাথাচাড়া দেয়। আল্লাহএক ভুলে গিয়ে পরিপূর্ণ নাফরমান হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত পৃথিবীতে ওরা কল্যাণের বদলে অকল্যাণের সমূহ কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

আল্লাহ্ তা’আলা ফেরেশতা পাঠিয়ে ওদের ধ্বংস করে পৃথিবী পরিষ্কার করেন। তবু এখানে-ওখানে দলছুট কিছু জিন আল্লাহরই ইচ্ছায় থেকে যায়। ওদেরই বংশধর হিসাবে এখন পর্যন্ত এ জাতি পৃথিবীতে বসবাস করছে মানুষের সমান্তরাল এক বুদ্ধিমান প্রজাতি হিসাবে।

অভিশপ্ত ইবলিস এ জিনেরই বংশধর। হাদীসের বিভিন্ন বর্ণনা মতে ইবলিসের বংশ হিসাবে জিনদের মাঝে অসংখ্য অনুচর শয়তান রয়েছে। ওরা ইবলিসের আজ্ঞাবাহী হিসাবে কাজ করে। আবার আল্লাহর ফরমাবরদার অসংখ্য নেককার জিনও বর্তমান। হাদীস শরীফের বর্ণনামতে, হাড্ডি ও গোবর ওদের প্রধান খাদ্য। তবে অন্যান্য মনুষ্য খাদ্যও ওরা ভষণ করে থাকে। রাসূল (সা)-এর হাতে বয়আত হয়ে জিন জাতির বহু সদস্য মুসলমান হয়। কুরআন ও শরীয়ত শিক্ষা লাভ করে পরিচ্ছন্ন জীবনের অধিকারী হয়।

এ প্রসঙ্গে কুরআন পাকে ইরশাদ হয়েছেঃ

হে রাসূল ! আপনি বলে দিন, আমাকে জানানো হয়েছে যে, জিনদের একটি দল কুরআন শ্রবণ করেছে। তারপর ওরা তাদের সম্প্রদায়ে গিয়ে বলেছে আমরা এক অত্যাশ্চর্য কুরআন শ্রবণ করেছি যা সত্য হিদায়েত প্রদান করে। সুতরাং তার উপর আমরা ঈমান এনেছি এবং কক্ষণও আর আমাদের প্রতিপালকের সঙ্গে শিরক করব না।

— সূরা জিনঃ ১-২

ঘটনাটি ঘটেছিল তায়েফ থেকে ফেরার পথে রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন পাহাড়ের উপর রাত্রি যাপন করছিলেন এবং যখন তিনি সালাতে কুরআন তিলাওয়াত করছিলেন, তখন ওরা তা শুনতে পায় এবং আকৃষ্ট হয়। ওরা অর্থাৎ জিনেরা গভীর মনোযোগের সাথে তা শ্রবণ করে। তারপর তারা রাসূলুল্লাহ্ (সা)- এর হাতে বায়আত হয়ে মুসলমান হয়। অতঃপর তারা নিজ সম্প্রদায়ে তা প্রচার করে।

হযরত ইব্ন আব্বাস (রা) বর্ণনা করেন, রাসূল (সা) সাহাবাদের নিয়ে ‘ওকাজের বাজারে গেলেন, সে সময় শয়তাদের (ইবলিসের অনুচর জিনের দল) আকাশে গমনাগমন এবং আগাম সংবাদ শ্রবণ ও সংগ্রহ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ওদের উপর আগুনের গোলা নিক্ষেপ করা হতো। শয়তানোরা তাদের মানুষ অনুচরদের কাছে গেলে ওরা জিজ্ঞেস করে, ব্যাপারটা কি ? আসমান থেকে আগাম খবরাদি আসে না কেন ? ওরা বললঃ ওখানে আমাদের যাতায়াত বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। আমাদের উপর আগুনের গোলা নিক্ষেপ শুরু করেছে। মানুষেরা বলল, এর অবশ্যই কোনও কারণ আছে। নতুন কিছু ঘটেছে নিশ্চয়। সারা পৃথিবী খুঁজে দেখ, কি কারণে তোমাদের আকাশে যাতায়াত বন্ধ করে দেয়া হলো।

জিনেরা সকল দিক খুঁজে দেখা শুরু করে। যে দলটি মক্কায় দিকে পাঠান হয়েছিল সেটি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছ দিয়ে যাচ্ছিল। তিনি তখন ‘নাখলা’ নামক জায়গায় সাহাবাদের সাথে নিয়ে ফজরের সালাত আদায় করছিলেন। ওরা যখন কুরআন তিলাওয়াতের আওয়াজ শুনল, অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে তা শ্রবণ করল। তারপরই তারা মন্তব্য করল, এটাই হলো আকাশে খবর সংগ্রহ নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়ার আসল কারণ। (ওরা নিজ কাওমে ফিরে বলল) হে আমাদের সম্প্রদায় ! আমরা এক অতি আশ্চার্য কুরআন শ্রবণ করলাম, যা সত্য পথনির্দেশ করে। তার উপর ঈমান এনেছি। আর আমরা কক্ষনও আল্লাহর সাথে শরীক করব না। (বুখারী ও মুসলিম)

হযরত ইব্ন মাসউদ (রা) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) মক্কায় থাকাকালীন এক রাতে সাহাবাদের বললেন, “তোমাদের মধ্য থেকে যে ব্যক্তি আজ রাতে জিনদের সাথে আমার আলোচনাকালে উপস্থিত থাকতে চাও সে হাজির থেক।” শেষ পর্যন্ত কেবল আমিই রইলাম।

আমরা রওয়ানা হলাম। মক্কায় উপরাঞ্চলে পৌঁছে রাসূল (সা) পা দিয়ে মাটিতে একটা রেখা টানলেন। তারপর আমাকে রেখার ভিতর বসে থাকতে হুকুম দিলেন। তিনি সামনে অগ্রসর হয়ে দাঁড়ালেন এবং কুরআন তেলাওয়াত শুরু করলেন। অনেক জিন এলো এবং রাসূল (সা)-কে ঘিরে ধরল। এমনকি রাসূলুল্লাহ্ ও আমার মাঝে ওরা আড়াল হয়ে দাঁড়াল। আমি তাঁর কন্ঠও শুনতে পাচ্ছিলাম না।

এরপর জিনেরা বিদায় নিল এবং মেঘের টুকরার মতো আলাদা হয়ে যেতে থাকল। কেবল ওদের একটা দল তখনও রয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের সাথে কথা বলতে থাকলেন। ফজরের সময় তাঁদের কথা শেষ হলো। আমার কাছে এসে তিনি বললেনঃ ঐ দলটি (পূর্বের) কোথায় গেল। আমি বললামঃ ঐ দেখা যায় । তিনি কিছু গোবর ও হাড় নিয়ে ওদের দিলেন (খাদ্য হিসেবে) । তিনি আমাদেরকে গোবর ও হাড় দিয়ে ঢিলা কুলুখ নিতে নিষেধ করে দিয়েছিলেন। (খাসায়েসুল কোবরা)

তিবরানী কর্তৃক বর্ণিতঃ হযরত ইব্ন মাসউদ (রা)-এর বর্ণনায় বাড়তি আরও কিছু বর্ণনা আছে। ইব্ন মাসউদ বলেনঃ যখন ভোরের আলো ফরসা হয়ে গেল, রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমার কাছে এলেন। জিজ্ঞেস করলেনঃ তুমি কি সারারাত এভাবেই কাটিয়েছ ? বললামঃ যদি একমাসও থাকতে হতো তবু আপনার হুকুম অমান্য করে আপনি না আসা পর্যন্ত এখান থেকে সরে যেতাম না। এরপর আমি এখান থেকে অগ্রসর হয়ে হুযূরের কাছে যাওয়ার এবং এই সব লোককে (জিনদের) মেরে তাড়াবার যে নিয়ত রাতে একবার করেছিলাম। [ এ হাদীসে মতে তিনি রাতে একবার রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর জীবনাশঙ্কা করে এ নিয়াত করেছিলেন] সে কথা তাঁকে জানালাম। বললামঃ আপনার আদেশ মনে পড়ায় থেমে গিয়োছিলাম।

রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেনঃ তুমি যদি আমার দেওয়া রেখার বাইরে যেতে, তবে কিয়ামত পর্যন্ত আর আমাদের দেখা হতো না। তিনি অতঃপর নিজের হাতের আঙুলগুলো আমার আঙুলে রেখে বললেনঃ আমাকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, জিন ও ইনসান উভয়েই আমার উপর ঈমান আনবে। মানুষ ঈমান এনেছে আর জিনদের আজ তুমি দেখলে। (তিবরানী)

তথ্যসূত্র

  • রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর জীবনে আল্লাহর কুদরত ও রুহানিয়াত (লেখকঃ মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুল গফুর হামিদী, প্রকাশকঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ)