নামাজের ষষ্ঠ অবস্থা

From Sunnipedia
Jump to: navigation, search

ইহছানের নামাজ। হাদীছে জিবরিলে বর্ণিত আছে -

জিবরাইল আলাইহিচ্ছালাম যখন রছূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি অছাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন, মাল ইহছান অর্থাৎ ইহছান কি? রছূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি অছাল্লাম জবাব দিলেন

“আল ইহছানু আন তা’বুদাল্লাহা কাআন্নাকা তারাহু ফাইন লাকুন তারাহু ফাইন্নাহু ইয়ারাক”। অর্থাৎ ইহছান হল এই যে, তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদাত করবে যেন তুমি তাকে দেখছো। আর যদি তুমি তাকে দেখতে না পাও, তাহলে তুমি মনে করবে তিনি তোমাকে দেখছেন।

— বুখারী ও মুছলিম, মেশকাত ২

আল্লাহ তাআ’লা কোরআন মাজীদে এরশাদ করেন-

يَعْلَمُ خَائِنَةَ الْأَعْيُنِ وَمَا تُخْفِي الصُّدُورُ

(১৯) চোখ সমূহ যা খেয়ানাত করে আর মনের মধ্যে যা গোপন রাখে তার সবকিছুই আল্লাহ জানেন।

— ছুরা মু’মিন- ৪০ঃ১৯

ইহছানের প্রথম স্তরে নামাজ পড়ার সময় নামাজীর নামাজের মধ্যের সব ধরনের ছোট বড় আমল এমনকি নামাজের মধ্যে আল্লাহর চিন্তা ছাড়া অন্য চিন্তা-ভাবনা করা বা কারো কথা মনে পড়া বা অন্য কোন প্রয়োজনীয় জিনিষ মনে করা এ ধরনের সব কিছু আল্লাহ তাআ’লা দেখছেন। নামাজের মধ্যে আল্লাহর চিন্তা-ভাবনা ছাড়া অন্য চিন্তা ভাবনা করলে আল্লাহ তাআ’লা তার নামাজ কবুল না করে উক্ত নামাজকে রাতের অন্ধকারের ন্যায় ছেড়া কাল কাপড়ের পুটলির আকৃতিতে তার মুখে নিক্ষেপ করেন। এ বিষয়ে খেয়াল করে নামাজ পড়বে।

রছূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি অছাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি সময় মত নামাজ পড়ল, তার অজুকে পূর্ণরূপে আদায় করল, এরপর নামাজের মধ্যের কেয়াম, খুশু, রুকু ও ছেজদা সকল পরিপূর্ণভাবে আদায় করল তার সে নামাজ উজ্জল ধবধবে সাদা অবস্থায় আছমানে উঠতে থাকে। নামাজ তখন বলতে থাকে, আল্লাহ তোমাকে হেফাজাত করুক যেমন তুমি আমাকে হেফাজত করেছ। আর যে ব্যক্তি অসময়ে নামাজ পড়ল আর তার অজুকে পূর্ণরূপে আদায় করলনা এবং নামাজের মধ্যের খুশু, রুকু এবং ছেজদাসমূহ পূর্ণরূপে আদায় করলনা, এ নামাজ ঘুটঘুটে কাল অবস্থায় উঠতে থাকে, নামাজ তখন নামাজীকে বলতে থাকে, আল্লাহ তোমাকে ধ্বংশ করুক যেমন তুমি আমাকে ধ্বংশ করেছ। এমনকি উক্ত নামাজকে ছেড়া কাপড়ের পুটলির ন্যায় বুটে নামাজীর মুখে নিক্ষেপ করা হয়।

— তিরবানী, আত্তারগীব ১ম খন্ড - ২৫৮ পৃঃ

হযরত মু’আজ রাদিআল্লাহু আনহু হতে হাদীছ বর্ণনা করা হয়েছে যে, এক ব্যক্তি এসে হযরত মু’আজ রাদিআল্লাহু আনহুকে বললো - আপনি আমাকে এমন একটি হাদীছ বলুন যা আপনি আল্লাহর রাছুল ছল্লাল্লাহু আলাইহি অছাল্লাম এর নিকট থেকে শুনেছেন। এ কথা শুনে হযরত মু’আজ রাদিআল্লাহু আনহু এমনভাবে কাঁদতে লাগলেন যে আমি ভাবলাম তিনি তাঁর কান্না থামাবেন না। অনেক পরে তিনি তার কান্না থামিয়ে বললেন, আমি আল্লাহর রাছুল ছল্লাল্লাহু আলাইহি অছাল্লাম এর নিকট থেকে শুনেছি - একদিন আল্লাহর রাছুল ছল্লাল্লাহু আলাইহি অছাল্লাম আমাকে ডেকে বললেন হে মু’আজ ! আমি বললাম আমি হাজির আছি । আমার বাপ মা আপনার উপর কোরবান হোক। আল্লাহর রাছুল ছল্লাল্লাহু আলাইহি অছাল্লাম বললেন, আমি তোমাকে এমন একটি বিষয় বলবো তুমি তার হেফাজত করলে তোমাকে উপকার দিবে। আর যদি তুমি তা নষ্ট করে ফেল এবং এ বিষয়ের হেফাজত না কর তাহলে কেয়ামতের দিন আল্লাহর সামনে তুমি কোন জওয়াবদিহী করতে পারবে না। হে মু’আজ আল্লাহ তাআ’লা আছমান জমীন সৃষ্টির আগে সাত জন শক্তিশালী ফেরেশতা সৃষ্টি করেন এরপর আছমান সমূহ সৃষ্টি করে প্রত্যেক আছমানের দরজায় একজন উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন পাহারাদার ফেরেশতা নিয়োগ করেন।

সকাল সন্ধ্যায় বান্দাদের আমলের হেফাজতকারী ফেরেশতাগণ তাদের সূর্যের ন্যায় উজ্জল আমল নিয়ে আছমানে উঠতে থাকেন এবং প্রথম আছমানের দরজায় পৌঁছে বান্দাদের অধিক আমলের ব্যাপারে আলোচনা করেন। তখন প্রথম আছমানের পাহারাদার ফেরেশতা হেফাজতকারী ফেরেশতাগণকে বলেন এ আমলগুলি আমলকারী বান্দার মুখে নিক্ষেপ কর। আমি গীবত দেখা শোনার মালিক। আমার রব আমাকে হুকুম করেছেন, আমি যেন,কোন গীবতকারীর আমল উপরে উঠতে না দেই এবং এ আমল যেন আমাকে এড়িয়ে আমার উপরে যেতে না পারে।

এরপর হেফাজতকারী ফেরেশতাগণ (গীবতকারী বান্দার আমল ব্যতীত) অন্যান্য বান্দার নেক আমল নিয়ে প্রথম আছমান অতিক্রম করে এবং তাদের উক্ত আমলকে পবিত্র ও অধিক মনে করে দ্বিতীয় আছমানের দরজায় পৌঁছে। তখন দ্বিতীয় আছমানের পাহারাদার ফেরেশতা হেফাজতকারী ফেরেশতাদের বলেন তোমরা দাঁড়াও ! এ সকল আমল তার আমলকারীর মুখে নিক্ষেপ কর। কেননা সে তার এ আমল দিয়ে দুনিয়া চেয়েছে। আমার রব আমাকে হুকুম করেছেন দুনিয়া কামনাকারীর কোন আমল আমি যেন উপরে উঠতে না দেই এবং আমাকে এড়িয়ে যেন অন্যের কাছে পে․ছতে না পারে। কেননা সে লোকদের কাছে নিজের আমলের গৌরব করতো।

এরপর হেফাজতকারী ফেরেশতাগণ বাকী বান্দাদের সাদকা, রোজা এবং নামাজের উজ্জল আমল নিয়ে তৃতীয় আছমানের দরজায় হাজির হন। তাদের আমলের উজ্জলতা হেফাজতকারী ফেরেশতাদেরও আশ্চর্য করে দেয়। তৃতীয় আছমানের পাহারাদার ফেরেশতা তাদের ডেকে বলেন, তোমরা দাঁড়াও ! এ সকল আমল তার আমলকারীর মুখে নিক্ষেপ কর। আমি অহংকারের পাহারার দায়িত্বে নিয়োজিত। আমার রব আমাকে হুকুম করেছেন যেন আমি অহংকারীর আমলকে উপরে উঠতে না দেই এবং আমাকে এড়িয়ে যেন তা উপরে পৌঁছিতে না পারে। এ ব্যক্তি লোকদের সামনে নিজের অহংকার প্রকাশ করতো।

এরপর হেফাজতকারী ফেরেশতাগণ অবশিষ্ট বান্দাদের উজ্জল নক্ষত্র তুল্য তাছবীহ, নামাজ, হজ্জ ও ওমরার আমল নিয়ে চতুর্থ আছমানের দরজায় হাজির হন। চতুর্থ আছমানের দরজায় পাহারাদার ফেরেশতা তাদের বলেন দাঁড়াও ! এ সকল আমল আমলকারীর মুখ, পিঠ ও পেটে নিক্ষেপ কর। আমি আত্মগরিমার পাহারার দায়িত্বে নিয়োজিত। আমার রব আমাকে হুকুম করেছেন আত্মগরিমাকারীর আমলকে আমি যেন উপরে উঠতে না দেই এবং আমাকে এড়িয়ে যেন অন্যের কাছে পে․ছিতে না পারে। কেননা সে তার আমল দিয়ে আত্মগরিমা প্রকাশ করতো।

এরপর হেফাজতকারী ফেরেশতাগণ সুসজ্জিত বাসর ঘরে স্বামীর কাছে নব বধুকে সাজিয়ে নিয়ে যাওয়ার ন্যায় বান্দাদের আমলকে নিয়ে পঞ্চম আছমানের দরজায় হাজির হন। পঞ্চম আছমানের পাহারাদার ফেরেশতা তাদের বলেন দাঁড়াও ! এ সকল আমল তার আমলকারীর মুখে নিক্ষেপ করো আর তার কাঁধে উঠিয়ে দাও। আমি হিংসার পাহারাদার ফেরেশতা। ইলম শিখে যারা হিংসুকের আমলের মত আমল করতো এবং তার থেকে বেশী ইবাদাত বন্দেগী করতো এ ব্যক্তি তাদের হিংসা করতো ও তাদের পিছনে লেগে থাকতো। আমার রব আমাকে হুকুম করেছেন আমি যেন তাদের আমল এখান থেকে উপরে উঠতে না দেই এবং আমাকে এড়িয়ে যেন অন্যের কাছে পে․ছিতে না পারে।

এরপর হেফাজতকারী ফেরেশতাগণ অন্য বান্দাদের নামাজ, যাকাত, হজ্জ, ওমরা ও রোজার আমল নিয়ে ষষ্ট আছমানের দরজায় হাজির হন। সেখানের পাহারাদার ফেরেশতা তাদেরকে বলেন দাঁড়াও! এ সকল আমলকারীর মুখে নিক্ষেপ কর। এ ব্যক্তি বিপদগ্রস্থ ব্যক্তির উপর দয়া করতো না এবং তার দুঃখ কষ্ট ও বিপদ দেখে খুশী হতো। আমি রহমতের পাহারাদার ফেরেশতা। আমার রব আমাকে হুকুম করেছেন আমি যেন নির্দয় ব্যক্তির আমল উপরে উঠতে না দেই এবং আমাকে এড়িয়ে যেন অন্যের কাছে পে․ছিতে না পারে।

এরপর হেফাজতকারী ফেরেশতা অবশিষ্ট বান্দাদের বজ্রপাতের বিদ্যুৎ চমকানো ও সূর্যের আলোর ন্যায় উজ্জল রোজা, নামাজ, পরিবার পরিজনের ভরন পোষণ ইজতেহাদ ও পরেহেজগারীর আমল নিয়ে তিন হাজার ফেরেশতা সহ সপ্তম আছমানে পে․ছে। সপ্তম আছমানের পাহারাদার ফেরেশতা তাদের বলেন দাঁড়াও ! এ আমল আমলকারীর মুখে ও তার ঐ সব অঙ্গে নিক্ষেপ কর যা তার ক্বলবের উপর প্রভাব বিস্তার করেছে। আমার রব আমাকে হুকুম করেছেন, বান্দা তার যে সব অঙ্গ প্রত্যঙ্গ দিয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইবাদাত করেনি। আমি যেন সে সকল ইবাদাত আল্লাহর দরবারে উঠতে না দেই। কেননা বান্দা তার অঙ্গ প্রত্যঙ্গের আমল যারা আল্লাহ ব্যতীত অন্যের সন্তুষ্টি কামনা করেছে। তারা এ সকল আমল দারা ফেকাবিদদের নিকট মর্যাদা বৃদ্ধি আলেমদের নিকট আলোচিত ও শহরে প্রসিদ্ধি লাভের চেষ্টা করেছে। আমার রব আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন এসব বান্দার আমল আমি উপরে উঠতে না দেই এবং আমাকে এড়িয়ে যেন অন্যের কাছে পৌঁছতে না পারে। যে সব আমল খাটিভাবে নিছক আল্লাহর জন্য না করা হয় তা’হলো রিয়া অর্থাৎ লোক দেখানো ইবাদাত। আর আল্লাহ রিয়া বা লোক দেখানো ইবাদাতকারীর ইবাদাত কবুল করেন না।

এরপর হেফাজতকারী ফেরেশতাগণ বাকী বান্দাদের নামাজ, যাকাত, রোজা, হজ্জ, ওমরা, সৎচরিত্র, আল্লাহর জিকির ও চুপ থাকার আমল নিয়ে উপরে উঠতে থাকেন। তাঁদের সাথে সাত আছমানের ফেরেশতাগণ ও চলতে থাকেন। সকল পর্দা ভেদ করে তাঁরা আল্লাহর দরবারে হাযির হয়ে যান এবং বান্দার খাঁটি নেক আমলের সাক্ষ্যদান করেন। তখন আল্লাহ তাদেরকে বলেন- তোমরা বান্দার আমলের হেফাজতকারী ফেরেশতা আর আমি স্বয়ং বান্দার হেফাজতকারী। সে তার এ আমল দিয়ে আমাকে চায়নি বরং অন্যকে চেয়েছে। এ জন্যে তার উপর আমার লানত। তখন ফেরেশতাগণ বলেন তাদের উপর আল্লাহর লানতের সঙ্গে আমাদেরও লানত। সকল আছমান তখন বলে তাদের উপর আল্লাহর লানতের সঙ্গে আমাদেরও লানত। সঙ্গে সঙ্গে সাত আছমান ও তার মধ্যেকার সকলেই তার উপর লানত বর্ষণ করে।

হযরত মু’আজ রাদিআল্লাহু আনহু আল্লাহর রাছুল ছল্লাল্লাহু আলাইহি অছাল্লাম' সম্বোধন করে বললেন, আপনিতো আল্লাহর রাছুল, আর আমি তো নিকৃষ্ট মু’আজ। তখন আল্লাহর রাছুল বললেন- হে মু’আজ ! তুমি আমার অনুসরণ কর। যদি তোমার আমলের মধ্যে ত্রুটি থাকে তাহলে কোরআনের অনুসারী ভাইদের গীবত করা থেকে নিজের জবানকে হেফাজত করবে। নিজের গোনাহ নিজের উপরেই রাখবে। অন্যদের উপরে চাপিয়ে দেবে না। তাঁদের বদনাম করে নিজেকে দোষমুক্ত করার চেষ্টা করবে না। তাদের কারো উপর নিজেকে বড় মনে করবে না। আখেরাতের আমলকে ছেড়ে দিয়ে দুনিয়ার আমলে মত্ত হবে না। নিজের মজলিসে অহংকার প্রকাশ করবে না। তাহলে তোমার খারাপ স্বভাব থেকে লোকেরা বাঁচতে পারবে। তোমার কাছে উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্যে কোন একজনকে ডেকে নিয়ে গোপনে কথা বলবে না। আর মানুষের সামনে নিজেকে প্রাধান্য দেবে না। এ সকল কাজ করলে তোমার দুনিয়া ও আখেরাতের ভালাই বন্ধু হয়ে যাবে। লোকের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করবে না। বিভক্তি সৃষ্টি করলে কেয়ামতের দিন জাহান্নামের কুকুর জাহান্নামের মধ্যে তোমাকে টুকরা টুকরা করবে। আল্লাহ তাআ’লা এরশাদ করেছেন- وَالنَّاشِطَاتِ نَشْطًا হে মু’আজ তুমি কি জান ! এগুলি কি ? আমি বললাম আপনার উপর আমার বাপ মা কোরবান হোক। এগুলি কি ? আল্লাহর রাছুল বললেন, এগুলি জাহান্নামের কুকুর। যারা মানুষের হাড় ও গোশতকে ছিড়ে ছিড়ে খাবে। তখন আমি বললাম আমার বাপ মা আপনার উপর কোরবান হোক। কে ওগুলি অর্জণ করতে পারবে ? আর কে এই জাহান্নাম হতে মুক্তি পাবে ? আল্লাহর রাছুল ছল্লাল্লাহু আলাইহি অছাল্লাম বললেন, হে মু’আজ ! আল্লাহ যার জন্যে সহজ করে দেবেন, কেবলমাত্র তার জন্যে এ আমল সহজ হবে। বর্ণনাকারী বলেন, এ হাদীছে বর্ণিত বিষয়গুলি হতে বেঁচে থাকার জন্যে হযরত মু’আজ রাদিআল্লাহু আনহু থেকে অধিক কোরআন পাঠকারী আমি অন্য কাউকে দেখিনি।

— আততারগীব ১ম খন্ড ৭৩ পৃঃ

রছূলুল্লাহ ছল্লাল্লাহু আলাইহি অছাল্লাম বলেছেন-নামাজ মু’মিনের জন্য মে’রাজ