পবিত্র আঁখিযুগল

From Sunnipedia
Jump to: navigation, search
আঙ্গিক ও গঠনগত সৌন্দর্য

  • পবিত্র আঁখিযুগল



হুজুর আকরম (সঃ) এর নয়ন মুবারকের আলোচনা দু’টি দিক দিয়ে উপস্থাপিত হতে পারে । প্রথম আলোচনা হুজুর পাক (সঃ) এর নয়ন মুবারকের অবস্থানস্থল এবং আকৃতি কেমন ছিল, তাঁর গঠন কেমন ছিল—এ প্রসঙ্গে । দ্বিতীয় আলোচনা, তাঁর দৃষ্টিশক্তির প্রশংসা সম্পর্কে ।

অবস্থানস্থল এবং আকৃতি

আলোচনার প্রথম প্রসঙ্গ সম্পর্কে হজরত আলী (কাঃ) থেকে প্রাপ্ত বর্ননা এরূপ—তিনি বলেন, তাঁর পবিত্র চক্ষু ছিল ডাগর ডাগর এবং চোখের ভ্রু ছিল দীর্ঘ । ডাগর চক্ষু বা বড় চক্ষু বলার উদ্দেশ্য “তাঁর চোখ ছোট ছিলোনা” একথা বুঝানো । আবার বড় অর্থ এও নয় যে, অস্বাভাবিক বড় যা কোটর থেকে বেরিয়ে এসেছে । মহানবী (সঃ) এর অঙ্গ প্রত্যঙ্গের বর্ননার ব্যাপারে মৌলিক বিষয় এটাই যে, তাঁর সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ছিল মধ্যম ধরনের স্বাভাবিক এবং সামঞ্জস্যশীল । কেননা রুপ-সৌন্দর্য, মর্যাদা ও পূর্নতার ভিত্তি হলো মধ্যম ও স্বাভাবিক অবস্থা বিদ্যমান থাকা ।

অন্য এক হাদিসে এসেছে, তার নয়ন যুগলের পুতুলির রঙ ছিল ‘আশকালুল আইনাইন’ সাদা ও লাল মিশ্রিত । অর্থাৎ চোখের পুতুলির সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম রগগুলি ছিল লাল রঙের । তার চক্ষুদ্বয়ের স্বরূপ বর্ননায় কালো ও লাল রঙ শব্দটির ব্যবহার খুব কম পাওয়া যায় । তবে নেহায়া নামক কিতাবে বলা হয়েছ, হুজুর পাক (সঃ) এর আখিদবয়ের রঙ ছিল কালো এবং লাল মিশ্রিত । হাঁ, এটাও প্রিয়জনের চোখের সৌন্দর্যের একটি দিক । তবে প্রসিদ্ধ বর্ননা হচ্ছে ‘আশকালুল আইনাইন’ । অবশ্য বিভিন্ন কবিতায় উদ্যমী নওজোয়ানদের প্রশংসার ক্ষেত্রে ‘শাহলাহ্‌’ শব্দের ব্যবহার এসেছে । অভিধান গ্রন্থে ‘আশকাল’ এর অর্থ করা হয়েছে লাল ও সাদা রঙের মিশ্রিত যৌথ বর্ন-যার সাদা বর্নের উপর রকিমাভা ঝিলিক দেয় । ‘শাকলাহ’ কে ‘শাহরাহ্‌’ ও বলা হয় যা ‘সেহের’ (যাদু করা) শব্দ থেকে উৎপন্ন হয়েছে । যাকে বলা হয় মায়াবী চোখ । কেননা এধরনের চোখ মানুষের চিত্তকে আকর্ষন করে । কোন কোন হযরত ‘আশকালুল আইনাইন’ এর ব্যখ্যা করেন ‘তাবীলু শাককিল আইনাই’ অর্থাৎ দীর্ঘ সরু চোখ । অভিধান গ্রন্থেও এরকম অর্থ করা হয়েছে । কাজী আয়া মালেকী (রঃ) এর বর্ননাও এরকম । শামায়েলে তিরমিজিতেও এরূপ বর্ননা এসেছে । আমিরুল মু’মিনীন হযরত আলী (কাঃ) এর ভাষ্য ‘আযীমুল আইনাই’ (বড় চোখ) ও বাহ্যত উপরোক্ত অর্থই প্রদান করে । প্রকৃত তত্ত্ব আল্লাহতায়ালাই জানেন ।

এক বর্ননায় এসেছে ‘আদমাজুল আইনাইন’ । ঘন কালো চোখকে ‘আদমাজ’ বলা হয় । অভিধানে এর অর্থ করা হয়েছে প্রশস্ত । অন্য এক বর্ননায় আছে ‘আকহালুল আইনাইন’-সুরমাযুক্ত চোখ । অর্থাৎ হুজুর পাক (সঃ) এর লোচনদ্বয় সুরমা ছাড়াই সুরমাযুক্ত পরিদৃষ্ট হত ।

দৃষ্টিশক্তি

দ্বিতীয় আলোচনা হুজুর পাক (সঃ) এর দৃষ্টিশক্তির প্রশংসা সম্পর্কিত । এ মর্মে হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বর্ননা করেন, হুজুর আকরাম (সঃ) দিবালোকে যে রকম দেখতে পেতেন ঠিক তেমনি দেখতে পেতেন রাতের অন্ধকারে । হাদিছখানা বুখারী শরীফ থেকে সংগৃহীত । বায়হাকী শরীফেও হজরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ) থেকে এরকম বর্ননা পাওয়া যায় । কাযী আয়ায (রঃ) “কিতাবুশ্‌ শিফা” তে এরূপ বর্ননা করেছেন । হুজুর পাক (সঃ) এর দৃষ্টিশক্তি এতো প্রখর ছিল যে, ছুরাইয়া নক্ষত্ররাজির অভ্যন্তরে এগারটি নক্ষত্র তিনি পরিষ্কার দেখতে পেতেন । সুহাইলির বর্ননায় বারোটি দেখতে পেতেন । তার দৃষ্টি আকাশের তুলনায় জমিনের দিকেই অধিকতর নিবদ্ধ থাকতো । নবী করীম (সঃ) যে অতুলনীয় লজ্জাশীলতার অধিকারী ছিলেন এটি হচ্ছে তার দলীল । বিভিন্ন হাদিছে যদিও এরূপ বর্ননা এসেছে যে, হুজুর (সঃ) আকাশের দিকে দৃষ্টি উত্তোলন করতেন । কখনও কম করতেন আবার কখনও বেশী । এগুলো ওহীপ্রাপ্তির অপেক্ষায় সাধারণতঃ করে থাকতেন । নতুবা তার দৈনন্দিন জীবনের অধিকাংশ সময় চোখের একপাশ দিয়ে তাকাতেন । তার এহেন দৃষ্টিপাত চূড়ান্ত লজ্জাশীলতার নিদর্শন । কিন্তু আবার কারো প্রতি যদি মুখ ফিরিয়ে কথা বলতেন, তখন পরিপূর্নভাবেই তার প্রতি ঘুরে যেতেন । ডানে বামে পাশ ঘুরিয়ে অথবা শুধু ঘাড় ঘুরিয়ে কথা বলাটা তিনি পছন্দ করতেন না । কেননা এ ধরনের কথা বলা অহংকারীর স্বভাব । তার নজর মুবারক সামনে পিছনে সমানভাবে কার্যকর ছিল । বিভিন্ন সহীহ্‌ হাদিছে বর্ননা এসেছে যে, তিনি অনেক সময় মুক্তাদীগনকে লক্ষ্য করে বলতেন, তোমরা রুকু সেজদায় আমার চেয়ে অগ্রগামী হয়ো না । আমি তোমাদেরকে সম্মুখ পশ্চাৎ উভয় দিক দিয়েই দেখতে পাই, কাজেই তোমাদের রুকু সেজদা আমার কাছে গোপন নয় । এ বর্ননার তাৎপর্য ও মাহাত্ন আল্লাহ পাকই জানেন । আর এরকম অবস্থা শুধু তাঁর দৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত নয় বরং সমস্ত অঙ্গ প্রত্যঙ্গের সবস্থাও এরকই ছিল । এটা সহজবোধ্য ব্যাপার নয় । কেননা তার নিগুড় রহস্যে উপনীত হওয়া তো কারো পক্ষেই সম্ভব হয়নি । হবেও না । নবী করিম (সঃ) এর প্রকৃত মাহাত্ন অবহিত হওয়ার দাবী করা মুতাশাবেহ্‌ আয়াতসমূহের তাঁবই ও তফছীর সম্পর্কে অবহিত হওয়ার দাবীতুল্য । আকল, কিয়াস, চিন্তা ও দৃষ্টিকোণ সম্পর্কিত মর্যাদা—এতো তার মর্যাদা বটে । তবে তার দৃষ্টিশক্তি তার নামাজের অবস্থার জন্যই নির্ধারিত ছিলো—যাতে নূরের আধিক্যের অবশ্যম্ভাবী প্রভাবে সৃষ্ট জগতের পর্দা উঠে যেতো । নাকি এরকম গুণাবলী তার সকল অবস্থা ও সকল সময়ের জন্য বিস্তৃত ছিল ? এর সমাধানে বলা যায়, পরওয়ারদিগারে আলম তার হাবীবে পাকের সকল অঙ্গকে এরূপ দর্শনের যোগ্যতা ও শকে প্রদান করতে পারেন অথবা এ দৃষ্টিক্ষমতা আল্লাহ তায়ালা তার হাবিব (সঃ) কে মোজেজার ভিত্তিতে শর্তহীনভাবে প্রদান করেছিলেন ।

কেউ কেউ এরকম বলেন যে, মহানবী (সঃ) এর দু’স্কন্ধের মধ্যে সূচাগ্রের ন্যায় শুঁখন দু’টি চোখ ছিল যা মাধ্যমে তিনি পশ্চাদ্ভাগেও দেখতে পেতেন । পোশাকের দবারা তা আচ্ছাদিত করা যেতো না । অথবা কেবলা শরীফের দেয়ালে দর্পনের মতো মুক্তাদীগনের অবস্থা প্রতিবিম্বিত হতো—এভাবে তিনি তাদের কার্যাবলী প্রত্যক্ষ করতেন । তবে এ দু’টি কথাই আশ্চর্যজনক ও সূক্ষ্ম । তবে হাঁ, এ ধরনের কথা যদি কোন বিশুদ্ধ বর্ননার মাধ্যমে পাওয়া যায় তবে আমরা অকপটে এর উপর ঈমান আনবো । নতুবা চিন্তাভাবনার অবকাশ আছে । কেননা এই বর্ননা সীরাত বিশেষজ্ঞগণের বিশুদ্ধ সনদের মাধ্যমে পাওয়া যায়নি ।

এ ক্ষেত্রে দর্শন কে যদি নবী করিম (সঃ) এর কলবই দর্শন ধরা হয়, তাহলে এদ্বারা বুঝাবে ওহী (অবহিত করণ), কাশ্‌ফ্‌ ও এলহামের মাধ্যমে তিনি যে এলেম প্রাপ্ত হতেন তার দর্শন । সীরাত বিশষজ্ঞগনের নিকট এটাই বিশুদ্ধ কথা । কেননা আল্লাহ তা’আলা যে রকম হুজুর পাকের পবিত্র কলবের আকলগত এলেম ও অনুভূতিতে প্রশস্ততা এবং বেষ্টন প্রদান করেছেন । ঠিক তদ্রূপ তার সূক্ষ্ম ইন্দ্রিয়ক্ষমতার অনুভব শক্তি ও এডরাকের মধ্যেও বেষ্টন প্রদান করেছেন । আল্লাহ্‌ তায়ালা তার বন্ধুর জন্য ছয় দিককে একই দিকে পরিণত করে দিয়েছেন । এব্যাপার আল্লাহ তা’আলাই সর্বজ্ঞ ।

কতিপয় লোক এ ধরনের মতানৈক্য সৃষ্টি করে বলে যে, কোন কোন বর্ননায় এরকম পাওয়া যায়—হুজুর (সঃ) তো নিজেই বলেছেন “আমি নিছক একজন বান্দা, দেয়ালের অন্তরালে কি আছে তা আমি জানি না” এ কথার কোন ভিত্তি নাই । এধরনের বক্তব্যের সমর্থনে কোন সঠিক বিবরণও পাওয়া যায় না । তাদের এ ধরনের বক্তব্যের সমর্থনে কোন সঠিক বিবরণও পাওয়া না । তাদের এ ধরনের কথা সমর্থন করা যদিও কঠিন তবু যদি ধরেও নেয়া যায় তাহলে তদুত্তরে আমরা বলবো যে হুজুর (সঃ) এ ধরনের এনকেশাফ (গায়ব দৃশ্য উন্মোচিত) হওয়াটা তার নামাজের অবস্থার সাথে বিশিষ্ট । আর যদি তিনি এ প্রাকারের এলেম হাসিল করে থাকেনই তবে তা আল্লাহতা’আলার অবহিত করানোর মাধ্যমেই হওয়া সম্ভব । অন্যান্য সমস্ত গায়েবের এলেম সম্পর্কিত ব্যাপারেও এ একই অবস্থা মনে করতে হবে । এজন্যই এ জাতীয় লোকেরা অদ্দিশ্য বিষয় সম্পর্কে হুজুর পাক (সঃ) এর এলেম ছিলোনা বলে উষ্ট্রী হারানোর ঘটনা দলিল স্বরূপ গ্রহণ করে থাকে । ঐ ঘটনাকালে মুনাফেক সম্প্রদায়ের লোকেরা বলেছিল, “মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম আকাশের খবর বলে অথচ এতটুক জানে না যে, তার উষ্ট্রী কোথায় আছে” (নাউযুবিল্লাহ)।

মুনাফিকদের এ ধরনের কুকথা যখন নবী করিম (সঃ) এর কর্নগোচর হল তখন তিনি বললেন, আমি স্বয়ং কিছু জানি না, স্বয়ং কিছু প্রাপ্ত হইনা । তবে এতটুকু জানি এবং পেয়ে থাকি যা আল্লাহতা’আলা আমাকে জানান এবং প্রদান করেন । তিনি সর্বদা এরূপ কথাই বলেছিলেন । এমন কি এক সময় আল্লাহ তা’আলা তাকে অবহিত করে দিলেন যে, উষ্ট্রী অমুক স্থানে আছে । উক্ত উষ্ট্রীটি একটি বৃক্ষের সঙ্গে আটকা পড়ে গিয়েছিল । লোকেরা সেখানে গেলো । দেখতে পেলো উষ্ট্রী বর্ননা অনুযায়ী হুবহু ঐ অবস্থাতেই আছে । সুতরাং এ ঘটনা থেকে এ কথাই সাব্যস্ত হল যে, হুজুর পাক (সঃ) এর নিজস্ব সত্তাগত কোন এলেম ছিল না । ঠিক ততটুকুই ছিল যতটুকু আল্লাহতা’আলা তাকে প্রদান করেছেন । চাই তা নামাজের অবস্থাতেই হোক বা নামাজ বহির্ভূত অবস্থাতেই হোক । এ সত্যটুকুর ব্যাপারে তো কোনরকম জটিলতার অবকাশ নেই । [1]

তথ্যসূত্র

  1. মাদারিজুন নবুওয়ত