বিদায় হজ্জের পর থেকে কাফন-দাফন পর্যন্ত

From Sunnipedia
Jump to: navigation, search
পরপারের আহবান 

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বুঝতে পেরেছিলেন যে, দুনিয়া থেকে তাঁর বিদায়ের সময় কাছে এসে গেছে। এ কারণে বিদায় হজ্জ থেকে ফিরে এসে তিনি আখিরাতের সফরের প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত হন। কারণ, আল্লাহ্ তা‘য়ালা যে কাজের জন্য তাঁকে পাঠান, তা সুসম্পন্ন হয়েছে। এখন সময় এসে গেছে তাঁর মহান রবের কাছে ফিরে যাবার। তাই তিনি সব সময় হামদ ও ছানা এবং দু‘আ ও ইস্তিগফারে মশগুল থাকতেন।

বিদায় হজ্জ থেকে ফিরে তিনি মুহাররম ও সফর পুরো দুটো মাস তিনি মদীনায় কাটান। একাদশ হিজরীর সফর মাসের শেষ দিকে তিনি ওসামা (রা.)-এর নেতৃত্বে সৈন্যবাহিনীকে সিরিয়া অভিযানে যাবার নির্দেশ দেন। যা ছিল তাঁর প্রেরিত সর্বশেষ সেনাবাহিনী। এ বাহিনী মদীনার অদূরে ‘জুরফ’ নামক স্থানে পৌঁছার পর রাসূলুল্লাহ (স.)-এর অসুস্থতার খবর পায়।

অসুস্থতার শুরু 

একদিন মাঝ রাতে রাসূলুল্লাহ (স.) তাঁর গোলাম আবু সোয়াইহিবকে বলেন :

আমাকে জান্নাতুল বাকীতে নিয়ে চল। আমাকে তাদের জন্য দু‘আ করতে বলা হয়েছে।

তিনি সেখানে গিয়ে তাদের জন্য দু‘আ করে ফিরে আসলে তাঁর মাথা ব্যথা শুরু হয়। তিনি এ অসুস্থতা নিয়েই অন্যান্য স্ত্রীদের ঘরে গিয়ে তাদের খোঁজ-খবর নিতেন। হঠাৎ তাঁর অসুখ বেড়ে যায়। এদিন তিনি হযরত মায়মুনা (রা.)-এর ঘরে ছিলেন। তিনি তখন সব স্ত্রীদের ডেকে তাদের থেকে এ অনুমতি নেন যে, তিনি অসুস্থ অবস্থায় হযরত আয়েশা (রা.)-এর ঘরে থাকবেন।

শেষ ইমামত 

রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যতদিন মসজিদে যেতে সক্ষম ছিলেন, ততদিন পর্যন্ত নিজে ইমামতি করেন। যখন তিনি মসজিদে যেতে অক্ষম হয়ে পড়েন, তখন হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-কে ইমাম নিযুক্ত করেন। রাসূলুল্লাহ (স.) একবার তাঁর সম্পর্কে বলেন :

নিশ্চয় আমি তোমাদের মধ্য হতে প্রেম ও ভক্তিতে আবু বকরকে শ্রেষ্ঠ মনে করি। এ মসজিদের সব দরজা বন্ধ হোক, শুধু খোলা থাক আবু বকরের দরজা।

অন্য এক সময় তিনি বলেন :

সাবধান! তোমরা আমার কবরকে ইবাদত খানায় পরিণত করবে না। ইয়াহুদী ও খৃষ্টানদের প্রতি আাল্লাহ্র লা‘নত, তারা তাদের পয়গম্বরদের মাযারকে ইবাদাত খানায় পরিণত করে ধ্বংস হয়েছে।

— সহীহুল বুখারী, ১ম খন্ড, পৃ. ৬২

রোববার দিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটু সুস্থবোধ করলে, তিনি যোহরের নামাযের সময় হযরত আলী ও আব্বাস (রা.)-এর কাঁধে ভর করে মসজিদে আসেন। তখন হযরত আবু বকর (রা.) নামাযের ইমামতি করছিলেন। হযরত আবু বকর (রা.) রাসূলুল্লাহ (স.)-এর উপস্থিতি টের পেয়ে পেছনে সরে আসতে চাইলে তিনি (স.) ইশারায় তাঁকে নিষেধ করেন। রাসূলুল্লাহ (স.) আবু বকর (রা.)-এর বাম পাশে বসে সালাত আদায় করেন। এ সময় হযরত ওসামা (রা.) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখার জন্য এবং যুদ্ধে রওয়ানা হওয়ার অনুমতি নেয়ার জন্য এসে দেখতে পান যে, তিনি অচেতন অবস্থা আছেন। রাসূলুল্লাহ (স.) ওসামার দিকে তাকালেন, কিন্তু কিছু বলতে পারলেন না। তিনি (স.) আকাশের দিকে হাত তুলে, পরে তা ওসামার উপর রাখেন। এতে হযরত ওসামা (রা.) বুঝতে পারেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জন্য দু‘আ করছেন।

শেষ বিদায় 

১২ই রবিউল আউয়াল সোমবার, রাসূলুল্লাহ (স.)-এর অবস্থা আগের চেয়ে কিছুটা ভাল মনে হয়। ফজরের নামাযের সময় তিনি আয়েশা (রা.)-এর হুজরার পর্দা তুলে মসজিদের ভেতর তাকিয়ে দেখেন যে, আবু বকর (রা.)-এর ইমামতিতে সাহাবায়ে কিরাম সালাত আদায় করছেন। এ দৃশ্য দেখে তাঁর মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠলো এবং চেহারায় খুশীর আমেজ ছড়িয়ে পড়লো।

সাহাবায়ে কিরাম যখন জানতে পারেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অনেক সুস্থ, তখন তাঁরা খুশী হয়ে যার যার কাজে চলে যান। কিন্তু একটু পরেই তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি শুরু হয় এবং তাঁর শ্বাস কষ্ট বেড়ে যায়। তিনি আর বসতে না পেরে উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়েশা (রা.)-এর কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়েন। শ্বাসকষ্ট বেড়ে চলছিল এবং শরীরের তাপমাত্রা কমে আসছিল। তাঁর কাছে তখন একটি পানিপূর্ণ পাত্র ছিল। তিনি একটু পর পর পানির পাত্রে হাত ভিজিয়ে তা মুখমন্ডলে বুলাচ্ছিলেন। আর শ্বাস কষ্টের সময় তিনি বলছিলেন :

আল্লাহ্ ছাড়া আর কোন ইলাহ্ নেই। নিশ্চয় মৃত্যুর কষ্ট বড় কঠিন।

এ সময় তিনি উপরের দিকে তাকান এবং হাত উঠিয়ে বলেন :

ইয়া আল্লাহ্! পরম বন্ধুর মিলন চাই, আর কিছু চাই না।

এ কথা বলার সাথে সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ‘রুহ্’ বা আত্মা ‘রফীকে আলার’ বা আল্লাহর কাছে ফিরে গেল এবং দুটো হাত নীচে ঢলে পড়লো। “ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলায়হি রাজেউন।”[1]

শোকাহত উম্মত 

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিকালের খবর ছড়িযে পড়ার সাথে সাথে যেন কিয়ামত শুরু হয়ে গেল। সবাই হতভম্ব ও দিশেহারা হলো। হযরত ওসমান (রা.) বেহুশ হয়ে পড়লেন। হযরত আলী (রা.) কাঁদতে কাঁদতে হুঁশ হারালেন। উম্মুল মু’মিনীনগণ ভীষণভাবে শোকাহত হলেন। সকলেই শোকে কাতর হয়ে ছটফট করছিলেন। হযরত ওমর ফারুক (রা.)-এর অবস্থা ছিল বেশী খারাপ। তিনি এ খবর শুনে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। তিনি মুক্ত তরবারি হাতে নিয়ে বলছিলেন :

আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ (স.) মারা যাননি; বরং তিনি তাঁর রবের সান্নিধ্যে গিয়েছেন। তিনি আবার ফিরে আসবেন।

এ খবর শুনে হযরত আবু বকর (রা.) অনুমতি নিয়ে রাসূলূল্লাহ (স.)-এর হুজরায় প্রবেশ করেন এবং তাঁর মুখমÊল থেকে কাপড় সরিয়ে কপালে চুমু খান। এ সময় তাঁর চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল। এরপর তিনি বলেন :

আপনার উপর আমার মা-বাপ কুরবান হোক। আপনি পবিত্রভাবে জীবন যাপন করেছেন এবং পবিত্র মৃত্যু বরণ করেছেন। এটা সেই মৃত্যু, যা আল্লাহ্ পাক আপনার জন্য লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। এরপর আপনার আর কোন মৃত্যু হবে না।

এরপর তিনি তাঁর চেহারা মোবারক ঢেকে দিয়ে বেরিয়ে আসেন। তিনি আস্তে আস্তে ওমর (রা.)-এর কাছে গিয়ে তাঁকে থামাতে চেষ্টা করেন। এতে ব্যর্থ হয়ে তিনি একটু দূরে দাঁড়িয়ে আল্-কুরআনের এ আয়াত তেলাওত করেন :

আর মুহাম্মদ তো আল্লাহর রাসূল ছাড়া কিছু নন। তাঁর আগে অনেক রাসূলই গত হয়েছেন। তাই যদি তিনি মারা যান বা শহীদ হন, তাহলে কি তোমরা তোমাদের আগের অবস্থায় ফিরে যাবে? আর যে ব্যক্তি তার আগের অবস্থায় ফিরে যাবে, সে আল্লাহর কোন ক্ষতি করতে পারবে না। আর আল্লাহ্ অচিরেই শোকরকারী বান্দাদের পুরস্কার দেবেন।

— আল্-কুরআন, সূরা আলে-ইমরান, আয়াত : ১৪৪

এরপর তিনি সকলকে সবর করার এবং শান্ত হওয়ার জন্য উপদেশ দিলেন। হযরত ওমর (রা.) এ আয়াত শুনে শান্ত হলেন এবং সাথে সাথে “ইন্নাল্লিল্লাহি” পাঠ করলেন।

খলীফা নির্বাচন 

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনতিকালের পর আনসার সাহাবীরা “ছাকীফায়ে বনী সাআদায়” সমবেত হয় এবং মুহাজিরদের অনুপস্থিতিতেই খলীফা নির্বাচনের পরামর্শ শুরু করে। তাদের পরামর্শ ছিল, খলীফা দু’জন হবেন। একজন আনসারদের থেকে এবং অপরজন মুহাজিরদের থেকে। এ খবর পেয়ে হযরত আবু বকর (রা.) ও হযরত ওমর (রা.) সাথে সাথে মুহাজিরদের নিয়ে সেখানে চলে যান। কারণ, রাসূল্লুাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তিকালের পর এটাই ছিল ইসলামের জন্য সব চেয়ে সংকটময় মুহুর্ত। এ সময় প্রয়োজন ছিল মুসলমানদের বিভেদের হাত থেকে রক্ষা করা। অন্যথায় ইসলামের বিরাট ক্ষতি হয়ে যেত।

হযরত আবু বকর (রা.) সেখানে পৌঁছে এ পরিস্থিতিতে করণীয় কাজ সম্পর্কে সবাইকে বুঝান। তিনি আনসার ও মুহাজিরদের পৃথক পৃথক মর্যাদা গুণাবলী বর্ণনা শেষে, খেলাফত সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (স.) থেকে বর্ণিত একটি হাদীস উদ্ধৃত করেন। সে মতে অনেক আলাপ-আলোচনার পর সিদ্ধান্ত হয় যে, রাসূলুল্লাহ (স.)-এর খলিফা মুহাজিরদের ভেতর থেকে নির্বাচিত হবে। তখন আবু বকর (রা.) খেলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করার জন্য হযরত ওমর (রা.) ও হযরত আবূ ওবায়দা (রা.)-এর নাম পেশ করেন। কিন্তু তাঁরা উভয়েই এ দায়িত্ব গ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করেন এবং তারা দু’জন হযরত আবু বকর (রা.)-কে খলীফা নির্বাচনের জন্য প্রস্তাব দেন এবং তাঁর হাতে সবাইকে বায়‘আত গ্রহণের আহবান জানান। হযরত ওমর (রা.) সবার আগে হযরত আবু বকর (রা.)-এর হাতে বায়‘আত গ্রহণ করেন। সাথে সাথেই সবাই তাঁর হাতে বায়‘আত গ্রহণ করে।

কাফন-দাফন 

খেলাফতের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা সমাধানের পর মুসলমানরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দাফনের ব্যাপারে পরামর্শে বসলে, হযরত আবু বকর (রা.) বলেন :

আমি রাসূলুল্লাহ (স.)-কে বলতে শুনেছি যে, নবীদের মধ্যে যিনি যেখানে ইন্তিকাল করেন, তাঁকে সেখানেই দাফন করা হয়।

ফলে সিদ্ধান্ত হয় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তার হুজরাখানায় দাফন করা হবে। এরপর রাসূলুল্লাহ (স.)-এর লাশ মুবারক সেখান থেকে সরিয়ে কবর খোঁড়া হয়। হযরত আলী (রা.) ও ওসামা (রা.) তাঁকে গোসল দেন, পরে তাঁকে কাফন পরানো হয়। অবশেষে জানাযার প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রাসূলুল্লাহ (স.)-কে শেষবারের মত সবার দেখার জন্য তাঁর হুজরায় রাখা হয়। সাহাবায়ে কেরাম দলে দলে আসতে থাকেন। তাঁরা ভেতরে গিয়ে প্রত্যেকে ভিন্ন ভিন্ন ভাবে তাঁর নামাযে জানাযা এবং সালাত ও সালাম পেশ করে শেষবারের মত প্রিয়তম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এক নজর দেখে কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে আসেন।

পুরুষদের পর্ব শেষ হলে নারীরা দলে দলে এসে একইভাবে সালাত ও সালাম আদায় করেন। এরপর বালক-বালিকারা এসে একইভাবে সালাত আদায় করে। আবাল বৃদ্ধ-বনিতা সবারই চোখে অশ্রুর ধারা ঝরছিল। এভাবে সালাত ও শেষ দর্শনের ধারা শেষ হতে মঙ্গলবার দিনও পার হয়ে যায়। এরপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেহ মোবারক উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়েশা (রা.)-এর হুজরায় দাফন করা হয়।

এভাবে আল্লাহর হাবীব, আমাদের হাবীব, সর্বাধিক পবিত্র সর্বগুণে গুণাণ্বিত, সর্ব মর্যাদায় মহিমান্বিত, সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল, বনী আদমের গৌরব, রহমতে আলম, সাইয়েদুল কাওনাইন হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা, আহমদ মুজতবা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ৬৩ টি বছর বয়সে দুনিয়ার বুক থেকে চিরবিদায় নিয়ে তাঁর পরম বন্ধু মহান আল্লাহর দরবারে ফিরে যান। [2]

তথ্যসূত্র

  1. সীরাতে হালবিয়া, আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া ও ইবনে জারীর
  2. সীরাতে হালবিয়া, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, যুরকানী।(আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা সাইয়েদেনা মুহাম্মদ ওয়া আলা আলিহী ওয়া আসহাবিহী ওয়া বারিক ওয়াসাল্লাম।
  • বিশ্বনবীঃ সন-ভিত্তিক জীবন তথ্য! (লেখকঃ ডক্টর আ.ফ.ম. আবু বকর সিদ্দীক)