মক্কা বিজয়

From Sunnipedia
Jump to: navigation, search
মক্কা বিজয়
কুরায়েশদের সন্ধি ভংগ 

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ৬ষ্ঠ হিজরীতে হুদায়বিয়ার সন্ধি করেন। যার একটি শর্ত এই ছিল যে, আরবের যে কোন গোত্র নবী করীম (স.) অথবা কুরায়েশদের সাথে স্বাধীনভাবে যোগাযোগ করতে পারবে, এতে কেউ বাধা দিতে পারবে না। এ চুক্তির সাথে আরবের দু’টি গোত্র ও যুক্ত হয়েছিল। গোত্র দুটি হলো বনূ বকর ও বনূ খুযাআ। বনূ বকর যুক্ত হলো কুরায়েশদের সাথে এবং বনূ খুযাআ যুক্ত হয় মুসলমানদের সাথে। কিন্তু দু’বছরের মাথায় বনূ বকরের লোকেরা চুক্তি ভংগ করে হঠাৎ বনূ খুযা’আর মহল্লায় হামলা করে তাদের বেশ কিছু লোককে হত্যা করে। এ হত্যাকান্ডের পর খুযা‘আ গোত্রের লোকেরা রাসূলুল্লাহ (স.)-এর নিকট এর প্রতিকার দাবি করে। তখন রাসূলূল্লাহ (স.)-কুরায়েশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অভিযান না পাঠিয়ে। প্রথমে তাদের কাছে দূত পাঠান-এ প্রস্তাবসহ :

১. হয় তোমরা খুযা‘আ গোত্রকে উপযুক্ত অর্থ দিয়ে এ অন্যায়ের প্রতিকার কর;
২. নয়তো বনূ বকরের সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন কর;
৩. নয়তো হুদায়বিয়ার সন্ধি বাতিল বলে ঘোষণা কর। কুরায়েশরা এ তিনটি শর্তের মধ্যে শেষের শর্তটি গ্রহণ করে এবং বলে :

আমরা হুদায়বিয়ার সন্ধি বাতিল বলে ঘোষণা করলাম।

দূতের কাছে এ খবর শুনে রাসূলুল্লাহ (স.) বলেন :

এখন তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ছাড়া আর কিছু করার নেই।

মক্কা বিজয়ের প্রস্তুতি 

অবশেষে আল্লাহ্ তা‘য়ালার নির্দেশে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা বিজয়ের মনস্থ করেন এবং সাহাবাদের প্রস্তুতির নির্দেশ দেন। তিনি ঘোষণা দেন যে, সব মুমিন মুসলমান যেন রমযান মাসে মদীনায় থাকে। কারণ, রমযানেই এ অভিযান শুরু হবে। এ ব্যাপারে তিনি (স.) যথেষ্ট গোপনীয়তা রক্ষা করেন। তিনি দু‘আ করেন :

আয় আল্লাহ্! কুরায়েশ গুপ্তচরদের অন্ধ ও বধির করে দাও। তারা যেন আমাদের উপস্থিতি হঠাৎ জানতে পারে এবং হঠাৎ শুনতে পায়।

মুসলমানরা মক্কা অভিযানের প্রস্তুতি নিয়ে যখন সবাই ব্যস্ত, তখন রমযান মাস এসে গেল এবং তাদের প্রস্তুতি শেষ হলো। অবশেষে ৮ম হিজরীর ১০ই রমযান রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দশ হাজার সাহাবী নিয়ে মক্কা রওয়ানা হন। এ সময় রাসূলুল্লাহ (স.) মদীনায় কুলছুম ইবনে হেসীন (রা.)-কে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করে যান।

মক্কায় প্রবেশ 

রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম “মাররে যাহ্রান” থেকে মক্কায় প্রবেশ করেন। হযরত আব্বাস (রা.) আবূ সুফিয়ানকে নিয়ে দেখতে থাকেন যে, মুসলিম বাহিনীর দল শান শওকতের সাথে মক্কায় প্রবেশ করছে। রাসূলুল্লাহ (স.) আল্লাহ্র ঘরে প্রবেশ করে প্রথমে হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করেন। পরে তিনি সাতবার ভক্তিভরে কা‘বা শরীফের চতুর্দিক তাওয়াফ করেন। পবিত্র কা‘বা ঘরের মধ্যে ৩৬০টি দেব-দেবীর মূর্তি রাখা ছিল। তিনি তাঁর হাতের ছড়ি দিয়ে তাতে আঘাত করলে, তা ভেঙে পড়তে থাকে। এ সময় তিনি বলছিলেন :

সত্য আজ সমাগত। মিথ্যা বিতাড়িত। মিথ্যার বিনাশ অবশ্যই হবে।

অপূর্ব ক্ষমা 

কা‘বা ঘরকে প্রতিমা মুক্ত করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কা‘বা ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে ভাষণ দেন। তিনি বলেন :

আল্লাহ্ ছাড়া কোন ইলাহ নেই এবং তাঁর কোন শরীক নেই। তিনি তাঁর ওয়াদা পূরণ করেছেন এবং তাঁর বান্দাদের সাহায্য করেছেন। আর তিনিই শত্রুদলকে পর্যুদস্ত করলেন।

হে কুরায়েশ সম্প্র‌দায়! আল্লাহ্ তা‘য়ালা জাহেলী যুগের অনাচার ও বাপ-দাদার বড়াই রীতি বাতিল করেছেন। সবাই আদমের সন্তান, আর আদম মাটির তৈরী মানুষ।

এরপর তিনি তাদের সম্বোধন করে বলেন :

হে কুরায়শ সম্প্র‌দায়। তোমাদের ব্যাপারে আমার ফয়সালা কি হতে পারে বলে তোমরা ধারণা কর?

তারা জবাবে বলে :

মংগলের ফয়সালা। আপনি আমাদের শরীফ ভাই এবং শরীফ ভাইয়ের সন্তান।

তখন তিনি বলেন :

আমি তোমাদের সে ফয়সালাই শোনাব, যা বলেছিলেন হযরত ইউসুফ (আ.) তাঁর ভাইদের ব্যাপারে। আর তা হলো : আজ আর তোমাদের ওপর আমার কোন রাগ নেই। যাও, তোমরা সবাই মুক্ত।

রাসূলুল্লাহ (স.)-এর এ অপূর্ব ক্ষমা দেখে সকলে স্তম্ভিত হলো। তারা আর দেরী না করে সবাই দ্বীন কবুল করে পড়ে নিল : “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ।” কত সুন্দর কত অদ্ভুত এ বিজয়। রক্তপাত নেই, ধ্বংস বিভীষিকা নেই। প্রেম দিয়ে, পূণ্য দিয়ে মহত্ব ও ক্ষমা দিয়ে এ বিজয়। মক্কা বিজয়, তাই কোন বিশেষ একটা দেশ বিজয় নয়। এটা একটি আদর্শের বিজয়। এ বিজয় কুরায়েশদের উপর নয়, বরং মিথ্যার উপর সত্যের বিজয়, অন্ধকারের উপর আলোর বিজয়। অশান্তির উপর শান্তির বিজয়!

তথ্যসূত্র

  • বিশ্বনবীঃ সন-ভিত্তিক জীবন তথ্য! (লেখকঃ ডক্টর আ.ফ.ম. আবু বকর সিদ্দীক)