মিরাজের দ্বিতীয় পর্যায়

From Sunnipedia
Jump to: navigation, search
মিরাজের ধারাবাহিক বর্ননা

  • মিরাজের দ্বিতীয় পর্যায়

মিরাজের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু হয় বায়তুল মোকাদ্দাছ থেকে এবং শেষ হয় সিদরাতুল মোন্তাহাতে গিয়ে । প্রথম আকাশে গিয়ে জিব্রাঈল (আঃ) ডাক দিলেন প্রথম আকাশের ভারপ্রাপ্ত ফেরেস্তাকে এবং দরজা খুলে দিতে বললেন । উক্ত ফেরেশতা পরিচয় নিয়ে হুযুর (দঃ) এর নাম শুনেই দরজা খুলে দিলেন । প্রথমেই সাক্ষাত হলো হযরত আদম (আঃ) এর সাথে । হুযুর (সঃ) তাকে ছালাম দিলেন । কেননা ভ্রমনকারীকেই প্রথমে সালাম দিতে হয় । হযরত আদম (আঃ) নবীগনের আদি পিতা । তাই তাকে দিয়েই প্রথম অভ্যর্থনা শুরু হলো । হযরত আদম (আঃ) এর নেতৃত্বে অন্যান্য আম্বিয়ায়ে কেরাম এবং প্রথম আকাশের ফেরেস্তারা উক্ত অভ্যর্থনায় যোগদান করেন । এমনিভাবে দ্বিতীয় আকাশে হযরত ঈছা, হযরত যাকারিয়া এবং হযরত ইয়াহ্‌ইয়া (আঃ) এবং অন্যান্য নবী ও ফেরেশতারা অভ্যর্থনা জানালেন ।

হযরত যাকারিয়াও উক্ত অভ্যর্থনায় শরীক ছিলেন ।

নবী করিম (সঃ) তাকে জিজ্ঞাসা করলেন- “যখন আপনাকে করাত দ্বারা দ্বিখণ্ডিত করা হচ্ছিল- তখন আপনার কেমন অনুভব হচ্ছিল ?”

উত্তরে যাকারিয়া (আঃ) বললেন- তখন আল্লাহ তায়ালা আমাকে ডাক দিয়ে বলেছিলেন- “আমি তোমার সাথে আছি । এতদশ্রবনে আমি মঊতের কষ্ট ভুলে গিয়েছিলাম ।”

প্রকৃত আশেকগনের মউতের সময় নবীজীর দিদার নছিব হয় । তাই তাদের মউতের কষ্ট অনুভূত হয় না [1]

তৃতীয় আকাশে হযরত ইউসুফ (আঃ) এর নেতৃত্বে অন্যান্য নবী ও ফেরেস্তাগণ নবী করিম (দঃ) কে অভ্যর্থনা জানান এবং ছালাম কালাম বিনিময় করেন । চতুর্থ আকাশে হযরত ইদ্রিছ (আঃ), পঞ্চম আকাশে হযরত হারুন (আঃ) ফেরেস্তাগণসহ অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করেন । ৬ষ্ঠ আকাশে হযরত মুছা (আঃ) এর সাথে সাক্ষাত হয় । তিনি অভ্যর্থনা জানিয়ে বিদায়কালে আশ্চর্য হয়ে বললেন- “এই যুবক নবী শেষকালে এসেও আমার পূর্বে বেহেস্তে যাবেন এবং তাঁর উম্মতগণ আমার উম্মতের পূর্বে বেহেস্তে প্রবেশ করবে” । হযর মুছা (আঃ) নবী করিম (সঃ) ও তাঁর উম্মতের বিশেষ মর্যাদা দেখে আনন্দে কেঁদে ফেলেন । তাঁর এই আফসোস ছিল আনন্দসূচক ও স্বীকৃতিমূলক- বিদ্বেষমূলক নয়, এটাকে ঈর্ষা বলে । গিব্‌তা বা ঈর্ষা করা শরীয়াতে জায়েয- কিন্তু হাসাদ বা হিংসা করা জায়েয নয় । [2]

হযরত মুছা (আঃ) সে সময় নবী করিম (দঃ) এর নিকট একটি হাদিসের ব্যাখ্যা জানতে চেয়েছিলেন । হাদীসটি হলো-

নবী করিম (দঃ) এরশাদ করেছেন- “আমার উম্মতের যাহেরী-বাতেনী এলেম সম্পন্ন আলেমগণ বনী ইসরাঈলের নবীগনের ন্যায় (এলেমের ক্ষেত্রে) ।

নবী করিম (দঃ) উক্ত হাদিসের যথার্থতা প্রমানের জন্য রুহানী জগত থেকে ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) কে হযরত মুছা (আঃ) এর সামনে হাযির করালেন । হযরত মুছা (আঃ) বললেন- “আপনার নাম কি ?" উত্তরে ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) নিজের নাম, পিতার নাম, দাদার নাম, পরদাদার নাম সহ ছয় পুরুষের নাম বললেন । হযরত মুছা (আঃ) বললেন, আমি শুধু আপনার নাম জিজ্ঞেস করেছি । আপনি এত দীর্ষ তালিকা পেশ করলেন কেন ? ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) আদবের সাথে জবাব দিলেন- “আড়াই হাজার বছর পূর্বে আপনিও তো আল্লাহ তায়ালার ছোট্ট একটি প্রশ্নের দীর্ঘ উত্তর দিয়েছিলেন”। ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) এর এলেম ও প্রজ্ঞা দেখে হযরত মুছা (আঃ) মুগ্ধ হয়ে গেলেন এবং হুযুর (দঃ) এর হাদিসখানার তাৎপর্য স্বীকার করে নিলেন । [3]

এখানে একটি বিষয় তাৎপর্যপূর্ন । হযরত মুছা (আঃ) এর ইন্তিকালের আড়াই হাজার বৎসর পরে মক্কার জমিনে প্রদত্ত হুযুর (দঃ) এর ভাষণ তিনি শুনতে পেয়েছিলেন- আপন রওযা থেকে । অপরদিকে দুনিয়াতে আসার পূর্ব আলমে আরওয়াহ্‌ থেকে ইমাম গাজ্জালী (রহঃ) এর মত একজন বিজ্ঞ অলী আড়াই হাজার হাজার বৎসর পূর্ব তূর পর্বতে ঘটে যাওয়া মুহচা (আঃ) এর ঘটনা সম্পর্কেও অবগত ছিলেন । এতে প্রমানিত হলো- আল্লাহর নবী ও অলীগণকে আল্লাহ তায়ালা বাতেনী প্রজ্ঞা দান করেছেন- যাকে নূরে নযর বা ফিরাছাত বলা হয় । আল্লাহর অলীগণ আল্লাহ প্রদত্ত কাশফ দ্বারা অনেক সময় মানুষের মনের গোপন কথাও বলে দিতে পারেন । ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) কুফার এক মসজিদে জনৈক মুছল্লিকে অযু করতে দেখে বলেছিলেন-

তুমি যিনা করেছ এসেছো । লোকটি অবাক হয়ে বলল, আপনি কিভাবে জানলেন ? ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) বললেন- তোমার অযুর পানির সাথে যিনার গুনাহ্‌ ঝরে পড়ছিল ।

হাদীসেও অযুর পানির সাথে গুনাহ্‌ ঝরে পড়ার কথা উল্লেখ আছে । লোকটি ইমাম সাহেবের বাতেনী এলেম দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেলো এবং সাথে সাথে ইমাম সাহেবের হাতে তওবা করলো । বড়পীর হযরত গাউছুল আযম আব্দুল কাদের জিলানী (রহঃ) বাহজাতুল আসরার কিতাবে বলেনঃ

দুনিয়ায় নেককার ও বদকার সকলকেই আমার দৃষ্টিতে পেশ করা হয় লওহে মাহফুজে

লওহে মাহফুযে নেককার-বদকার সকলের তালিকা রয়েছে । হযরত বড়পীর (রহঃ) এর নযরও দুনিয়া থেকে লওহে মাহফুযে নিবদ্ধ । এজন্য মাওলানা জালালুদ্দিন রুমী (রহঃ) মসনবী শরীফে বলেছেনঃ

লওহে মাহফুয ওলী-আল্লাহগণের নযরের সামনে ।

হযরত মুছা (আঃ) থেকে বিদায় নিয়ে নবী করিম (দঃ) জিব্রাইল (আঃ) সহ সপ্তম আকাশে গেলেন । সেখানে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) ফেরেস্তাগণসহ নবী করিম (দঃ) কে অভ্যর্থনা জানালেন । নবী করিম (দঃ) ইরশাদ করেন-

আমি হযরত ইব্রাহীম (আঃ) কে একটি কুরছিতে বসে বাইতুল মামুর মজজিদের গায়ে হেলান দিয়ে বসা অবস্থায় দেখতে পেয়েছি ।

— রুহুল বয়ান

হযরত ইব্রাহীম (আঃ) দুনিয়াতে আল্লাহর ঘর কা’বা শরীফ তৈরী করেছিলেন । তাঁর বিনিময়ে আল্লাহ তায়ালা তাকে সপ্তাকাশের বাইতুল মামুর মসজিদের মোতাওয়াল্লীর সম্মান দান করেছেন । দীর্ঘ এক হাদীসে এসেছে- বাইতুল মামুরে হুযুর (দঃ) এর সাথে নামায আদায় করেছিলেন; সাদা পোষাকধারী একদল উম্মত যাদের মধ্যে গাউসুল আযমও ছিলেন । [4]

আসমানে ভ্রমনের সময়ই নবী করিম (দঃ) বেহেস্ত ও দোযখ প্রত্যক্ষ করেন । পরকালে বিভিন্ন পাপের কি রকম শাস্তি হবে, তাঁর কিছু নমুনা তিনি মেছালী ছুরতে প্রত্যক্ষ করেছেন । সুদ, ঘুষ, অত্যাচার, নামায বর্জন, ইয়াতিমের মাল ভক্ষণ, প্রতিবেশীর উপর যুলুম, স্বামীর অবাধ্যতা, বেপর্দা ও অন্য পুরুষকে নিজের রুপ প্রদর্শন, যিনা, ব্যভিচার ইত্যাদির শাস্তি নবী করিম (দঃ) সচক্ষে দেখেছিলেন ।

বেহেস্তে হযরত খাদিজা (রাঃ) এর জন্য সংরক্ষিত প্রাসাদ, হযরত বেলালের (রাঃ) পাদুকার আওয়াজ- এসব দেখেছেন এবং শুনেছেন । বেহেস্তের চারটি নহরের উৎসস্থল নবী করিম (দঃ) কে দেখানো হয়েছে । বিছমিল্লাহর চারটি শব্দের শেষ চারটি হরফ থেকে (م- ه- ن-م) চারটি নহর প্রবাহিত হয়ে হাউযে কাউছারে পতিত হতে দেখেছেন । দুধ, পানি, শরবত ও মধু এই চার প্রকারের পানীয় বেহেস্তবাসীকে পান করানো হবে । যারা ভক্তি ও ঈমানের সাথে প্রত্যেক ভাল কাজ বিছমিল্লাহ বলে শুরু করবে, তাদের জন্য এই নেয়ামত রাখা হয়েছে । [5]

সপ্ত আকাশ ভ্রমণের পর জিব্রাইল (আঃ) খাদেম হিসাবে বা প্রটোকল হিসাবে নবী করিম (দঃ) কে সিদরাতুল মোন্তাহা বা সীমান্তের নিকট নিয়ে যান । হাদীসে এসেছে- “ এ বৃক্ষের পাতা হাতীর কানের মত বড় এবং ফল ওহোদ পাহাড়ের ন্যায় বড় । শহীদগনের রুহ মোবারক সবুজ পাখীর সুরতে উক্ত বৃক্ষের ফল ভক্ষণ করছেন ।” নবী করিম (দঃ) স্বচক্ষে তা দর্শন করেছেন । সিদরা বৃক্ষ পৃথিবীর সপ্ত আকাশের নিচ থেকে চৌদ্দ হাজার বছরের রাস্তার । সর্বমোট পঞ্চাশ হাজার বৎসরের দূরত্বে আরশে মোয়াল্লা [6] । আরশে মোয়াল্লা থেকে থেকেই আল্লাহ তায়ালার যাবতীয় নির্দেশ ফিরিস্তাগণের নিকট আসে । হযরত জিব্রাঈল (আঃ) সিদরাতুল মোন্তাহা থেকেই আল্লাহ তায়ালার যাবতীয় নির্দেশ গ্রহণ করে থাকেন । এখানে এসেই জিবরাঈলের গতি শেষ হয়ে যায় ।

তথ্যসূত্র

  1. আল বেদায়া ওয়ান নেহায়াঃ যাকারিয়া অধ্যায়
  2. মিশকাত
  3. রুহুল বয়ান তৃতীয় পারা, ২৪৮ পৃষ্ঠা
  4. আ’লা হযরতের ইরফানে শরিয়ত তৃতীয় খন্ড
  5. তাফসীরে রুহুল বয়ানে বিছমিল্লাহর ব্যাখ্যায় এর বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হয়েছে
  6. ইবনে আব্বাস
  • নূরনবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) (লেখকঃ অধ্যক্ষ হাফেয মুহাম্মদ আব্দুল জলিল (রহঃ) (এম এম, এম এ, বিসিএস))