মি’রাজ

From Sunnipedia
Jump to: navigation, search

মি’রাজের ঘটনাটিই ছিল রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নবুওয়াতী জীবনের সবচেয়ে মধুরতম অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ এবং এরকম অত্যাশ্চর্য কুদরতের নজীর হতিহাসে আর একটি নাই। মি’রাজের মাধ্যমে গোটা সৃষ্টি জগতের সামনে মুহাম্মদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অত্যুচ্চ মান ও সুমহান মর্যদা প্রকাশিত হলো। এবং এর মাধ্যমে মুহাম্মদ (সা) এবং তাঁর উম্মতের উপর আল্লাহ্ পাক তাঁর সালাম, রহমত ও বরকত উজার করে দান করলেন। মি’রাজে রাসূলুল্লাহ্ (সা) এ মহাজগতের বিপুল বিস্তার, তার উপর আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীনের একচ্ছত্র নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্ব, তাতে বিরাজমান অসীম রহস্য ও কুদরত এবং অসংখ্য নির্দশন প্রত্যেক্ষ করে সার্থক হলেন।

ইমাম সুয়ূতির বক্তব্য মতে মি’রাজ সম্পর্কে বহুসংখ্যক সাহবার সংক্ষেপে ও বিমদভাবে বর্ণিত বহু রেওয়ায়েত রয়েছে। তাঁরা হলেন-

হযরত আনাস ইব্ন মালিক, উবাই ইব্ন কা’ব, বুরাইদা, জাবির ইব্ন আবদুল্লাহ্, হুযায়ফা ইব্ন ইয়ামন, সামুরা ইব্ন জুনদুব, সহল ইব্ন সাদ, শাদ্দস ইব্ন আউস, সোহায়ব, আবদুল্লাহ্ ইব্ন আব্বাস, আবদুল্লাহ্ ইব্ন উমর, ইব্ন আমর, ইব্ন মাসউদ, আবদুল্লাহ্ ইব্ন আসওয়াদ, যুরারাহ, আবদুর রহমান ইব্ন কুরজ, আলী ইব্ন আবূ তালিব, উমর ইব্ন খাত্তাব, মালিক ইব্ন ছায়াছায়া, আবূ উমামা, আবূ আইয়ুব আনসারী, আবূ হাইয়ান, আবুল হামারা, আবূ যর, আবূ সায়ীদ খুদরী, আবূ সুফিয়ান ইব্ন হারব, আবূ লায়লা আনসারী, আবূ হুরায়রা, আয়েশা, আসমা, উম্মে হানী ও উম্মে সালমা (রাযিয়াল্লাহু আনহুম আজমাইন)

তাঁদের বর্ণনাগুলোর মাঝে কিছুটা পার্থক্য আছে। কোনটা সংক্ষেপে, কোনটা বিস্তারিত, কোনটাতে একদিক বর্ণিত হয়েছে, কোনটাতে অন্যদিক।

সবগুলো রেওয়ায়েত মিলে পূর্ণঙ্গ যে বর্ণনাটি পাওয়া যায়- (দাফয়ে ত’রুজের মাধ্যমে) তা নিম্নরুপ। নবুওয়াতের একাদশ বছর, রজব চাঁদের ছাব্বিশ তারিখ দিবাগত রাতে রাসূলুল্লাহ্ (সা) হযরত উম্মে হানী বিনতে আবূ তালিবের ঘরে ঘুমিয়ে আছেন। জিবরাঈল আমীন এসে তাঁকে জাগ্রত করলেন। তিনি উঠে ওযূ করলেন এবং মসজিদে হারামের হাতিমে গিয়ে শুয়ে পড়লেন এবং ঘুমিয়ে পড়লেন।

এখানেও জিবরাঈল (আ) তাঁকে জাগালেন। আল্লাহপাকের পক্ষ থেকে মি’রাজের আমন্ত্রণ জানালেন এবং তাঁর হাত ধরে মসজিদে হারামের দরজায় নিয়ে এলেন। এখানে তাঁর সামনে বুরাক নামে এক সওয়ারী হাজির করা হলো। এটা একটা চার পা-বিশিষ্ট সাদা রংয়ের সুদৃশ্য জন্তু। উচ্চতায় গাধা ও খচ্চরের মাঝামাঝি। সামনের দু’উরুর কাছে দুটি পাখা। তা দিয়ে পিছনের পায়ের দিকে ঝাঁপটা দেয়। আর তাতে দৃষ্টি যত দূর যায় তার শেষ প্রান্তে গিয়ে পড়ে তার সামনের কদম।

জিবরাঈল (আ) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বুরাকে সওয়ার হওয়ার জন্য অনুরোধ জানালেন। তিনি যখন তাতে আরোহণ করতে যাবেন, সেটি ছটফট করতে লাগল। জিবরাঈল (আ) তার ঘাড়ে হাতে রেখে বললেনঃ ওহে বুরাক ! একি করছ তুমি, তোমার কি লজ্জা হয় না ? আল্লাহর কসম ! এর আগে তোমার পিঠে মুহাম্মদ (সা) অপেক্ষা মর্যাদাশীল কেউ আরোহণ করেনি। একথা শুনো বুরাক লজ্জায় ঘেমে উঠল এবং সুস্থির হয়ে দাঁড়াল।

রাসূলুল্লাহ্ (সা) তার উপর আরোহণ করলেন। বোরাক তাঁকে নিয়ে উড়াল দিল। জিবরাঈল (আ) তাঁর সাথে চললেন। আনাস ইব্ন মালিক থেকে বুখারীর এক বর্ণনা মতে জিবরাঈল (আ)-এর সাথে আরও দু’জন ফেরেশতা ছিলেন। তাঁরা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বহন করে যমযম কূপের কাছে নিয়ে আসেন। বক্ষ বিদীর্ণ করে জিবরাঈল নিজের হাতে তাঁর হৃৎপিণ্ড ও পেটের সবকিছু বের করে যমযমের পবিত্র পানি দিয়ে ধৌত করেন। তারপর তাঁদের সঙ্গে আনা ঈমান ও হিকমত পূর্ণ করা হয়। কন্ঠনালীর রগও তা দিয়ে পূর্ণ করা হয়। তারপর তাঁর বক্ষ সমান করে দেওয়া হয়। অতঃপর তাঁকে বুরাকে আরোহণ করানো হয়।

রওয়ানা হলেন তাঁরা। হযরত আনাস (রা) থেকে আবদুর রহমান ইব্ন হাশিমের বরাতে বায়হাকী বর্ণনা করেনঃ তাঁরা যখন রওয়ানা হলেন, পথিমধ্যে প্রথমেই এক বৃদ্ধাকে দেখা গেল (সে তাঁর দৃষ্টি আর্কষণ করছে)। রাসূলুল্লাহ্ (সা) জিজ্ঞেস করলেন, এ কে ? জিবরাঈল (আ) বললেনঃ আপনি আগে চলুন। তিনি চললেন। পথের একপাশ থেকে কে যেন তাকে উদ্দেশ করে বললঃ হে মুহাম্মদ ! আপনি আসুন। জিবরাঈল বললেনঃ আপনি যেতে থাকুন। তিনি এগিয়ে চললেন। হঠাৎ কে যেন আওয়াজ দিয়ে উঠল- আস্সালামু আলাইকুম ইয়া আউয়ালু, আস্সালামু আলাইকুম ওয়া আখের, আস্সালামু আলাইকুম ইয়া হাশের। জিরবাঈল (আ) বললেনঃ সালামের জওয়াব দিন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) জওয়াব দিলেন।

এরপর দ্বিতীয় ও তৃতীয়বার কেউ তাঁকে অনুরুপ সালাম দিল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) জওয়াব দিলেন। পরবর্তী সময়ে এর ব্যাখায় জিবরাঈল (আ) বললেন, যে বৃদ্ধা দেখেছিলেন সে ছিল আল্লাহর দুশমন ইবলিস। আপনার দৃষ্টি আকষর্ণ করে বিভ্রান্ত করার তার উদ্দেশ্য ছিল। বৃদ্ধার বেশ থাকায় বুঝতে হবে দুনিয়ার আয়ু এ রকমেই ; বড় কম। আর যারা সালাম করলেন, এরা হলেন হযরত ইবরাহীম, হযরত মূসা ও হযরত ঈসা আলাইহিমুস সালাম।

তিবরানী ও বায়হাকী হযরত শাদ্দাস ইব্ন আউস (রা) থেকে বর্ণনা করেনঃ চলার পথে আমরা এমন এক জায়গায় গেলাম যেখানে প্রচুর খেজুর গাছ ছিল। জিবরাঈল (আ) আমাকে নামিয়ে নামায পড়তে বললেন। নামায পড়লাম। পুররায় রওয়ানা হলাম। জিবরাঈল (আ) বললেনঃ এ কোথায় নামায পড়লেন জানেন ? রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেনঃ না। জিবরাঈল (আ) বললেনঃ এ হলো ইয়াসরীব, আপনি তাইয়েবায় নামায পড়লেন। বোরক তাঁদের নিয়ে যাচ্ছিল। আর একটি ভূখণ্ডে পৌঁছে জিবরাঈল (আ) তাঁকে অবতরণ করিয়ে নামায পড়তে বললেন। তিনি নামায পড়লেন। আবার সওয়ার হয়ে রওয়ানা হলেন। জিবরাঈল (আ) বললেনঃ আপনি তুরে সিনায়, মূসা (আ)-এর বৃক্ষের কাছে নামায পড়লেন, সেখানে তিনি আল্লাহর সাথে কালাম করতেন। এরপর তাঁরা একটা দালানকোঠাপূর্ণ জায়গায় পৌঁছলেন। জিবরাঈল (আ) এখানে নামায পড়তে বললে রাসূলুল্লাহ্ (সা) নাযাম পড়লেন এবং পুরনায় রওয়ানা হলেন। জিবরাঈল (আ) বললেন, আপনি জানে কোথায় নামায পড়লেন ? হুযূর বললেনঃ না । জিবরাঈল (আ) বললেনঃ এ হলো বেথেলহেম, যেখানে ঈসা (আ) জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

এরপর একটানে বোরাক তাঁকে নিয়ে বায়তুল মুকাদ্দাসে পৌঁছল। খাসায়েসুল কোবরায় উল্লিখিত উবাই ইব্ন হাকেম সূত্রে, আনাস ইব্ন মালিকের রেওয়ায়েত মতে- বায়তুল মুকাদ্দাস পৌঁছে জিবরাঈল (আ) সেখানকার একটি পাথরে আঙুল ঢুকিয়ে ছিদ্র করলেন এবং তাতে বুরাককে বেঁধে রেখে উভয়ে উপরে আরোহণ করলেন। মসজিদের আঙিনায় পৌঁছে তিনি বললেনঃ ‘মুহাম্মদ ! আপনি কি রাব্বুল আলামীনের কাছে হুরে-ঈন (জান্নাতের অপূর্ব সুন্দরী ললনাগণ) দেখার জন্য দোয়া করেছিলেন ? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ। জিবরাঈল (আ) বললেনঃ ‘তা হলে আসুন এবং এদের সাথে সালাম কালাম করুন।’ হুরগণ তখন ‘সাখরা’-এর বামদিকে বসা ছিলেন।

রাসূলুল্লাহ্ (সা) ওযূ করলেন। তারপর চন্দ্র ও সূর্য যেদিক দিয়ে ঢলে পড়ে অর্থাৎ পশ্চিমের দরওয়াজা দিয়ে তিনি মসজিদে প্রবেশ করেন। সমস্ত নবী-রাসূল সেখানে উপস্থিত ছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) (ইব্ন আসাকির থেকে বর্ণিত আবদুল্লাহ্ ইব্ন মাসউদের এক রেওয়ায়েত মতে) বলেনঃ আমি তাঁদের চিনতে পারলাম।

বস্তুত সেখানে ইবরাহীম (আ), মূসা (আ), ঈসা (আ) প্রমুখ আম্বিয়ায়ে কিরাম উপস্থিত ছিলেন।

উবাই হবেন হাকিম বর্ণিত আনাস ইব্ন মালিক (রা)-এর বর্ণনামতে-

তাদের একজন আযান দিলেন, অপরজন ইকামত দিলেন। আমরা কাতারবন্দি হয়ে নামাযের জন্য দাঁড়ালাম। ইমামের অপেক্ষায় ছিলাম। জিবরাঈল আমীন এসে আমার হাত ধরে ইমামের জায়গায় বাড়িয়ে দিলেন। সবাইকে নিয়ে আমি নামায আদায় করলাম। নামাযের পর জিবরাঈল (আ) বললেনঃ আল্লাহ্ তা’আলা যত নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন তাঁরা সকলেই আপনার পিছনে নামায আদায় করলেন।

তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সামনে তিনটি পানপাত্র রাখা হলো। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তখন অত্যন্ত পিপাসার্ত ছিলেন। পাত্র তিনটি ছিল পানি, শরাব ও দুধের। তিনি দুধের পেয়ালা উঠালেন এবং পান করলেন।

জিবরাঈল (আ) তাঁকে বললেনঃ “হে মুহাম্মদ (সা) ! আপনি স্বভাব-ধর্মের হিদায়াত লাভ করলেন। আপনার উম্মতও হিদায়াত লাভ করল।”

এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) মসজিদ থেকে বের হয়ে এলেন। তাঁর সামনে এবার আশ্চার্য চোখ ধাঁধানো সুন্দর সিঁড়ির মতো এক বাহন পেশ করা হলো। রাসূলুল্লাহ্ (সা) ইরশাদ করেন- “এটাই সে বস্তু যার দিকে তোমাদের মরণাপন্ন ব্যক্তিরা মৃত্যুকালে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে থাকে।” জিবরাঈল (আ) তাতে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে আরোহণ করালেন। [আবূ সাঈদ খুদরী (রা)-এর রেওয়ায়েত] । সেটি তাঁকে নিয়ে একটানে সমগ্র নভোমণ্ডল ভেদ করে প্রথম আকাশের এক ফটকে পৌঁছল। এর নাম ‘বাবুল হাফাজ’ প্রহরী দরোজা।

রাসূলুল্লাহ্ (সা) দেখলেন, ইসমাঈল নামক অতিকায় এক ফেরেশতা এ ফটকের দায়িত্বে। তার দু’বাহুর নিচে ছিল বার হাজার ফেরেশতা। সেই বার হাজারের প্রত্যেকের দুহাতের নিচে ছিল বার হাজার করে ফেরেশতা অবস্থান। আবূ সাঈদ খুদরী বলেনঃ এ ঘটনা বর্ণনা করার সময় রাসূলুল্লাহ্ (সা) কুরআন পাকের আয়াত

ওয়ামা ইয়া'লামু জুনুদা রাব্বিকা ইল্লা হুয়া

অর্থঃ তোমার প্রতিপালকের কত বাহনী, সে কেবল তিনিই বলতে পারেন

তেলাওয়াত করেন।

ফটকের সামনে হাজির হলে প্রশ্ন করা হলো-হে জিবরাঈল ! সাথে ইনি কে ? তিনি উত্তর দিলেন- মুহাম্মদ (সা)। পুনরায় প্রশ্ন করা হলো, তাঁকে কি ডেকে পাঠানো হয়েছে। বললেনঃ হ্যাঁ। তখন ফেরেশতারা তাঁকে আহ্লান সাহ্লান মারহাবা বলে স্বাগত জানালো।

রাসূলুল্লাহ্ (সা) ইরশাদ করেন- “আমি প্রথম আসমানে প্রবেশ করলে সকল ফেরেশতা আমাকে হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানাল। আমার মঙ্গল কামনা করে দোয়া করল ; কিন্তু একজন ফেরেশতা ছিল ব্যতিক্রম। আমাকে অভ্যর্থনা জানাল এবং কল্যাণের জন্য দোয়া করল ঠিকই কিন্তু হাসল না। অন্যদের মাঝে যে উচ্ছলতা দেখলাম তার কিছুই তার মাঝে ছিল না। আমি জিবরাঈল (আ)-কে এর কারণ জিজ্ঞেস করলাম। জিবরাঈল (আ) বললেনঃ শুনুন, সে যদি আপনার আগে কারও জন্য হেসে থাকত এবং আপনার পরেও যদি কারও জন্য হাসবার সম্ভাবনা থাকত তবে আপনার জন্য অবশ্যই হাসত। আসলে সে কখনই হাসে না। এ হচ্ছে জাহান্নামের প্রধান প্রহরী ‘মালিক’ ফেরেশতা।

রাসূলুল্লাহ্ (সা) তখন জিবরাঈল (আঃ)কে বললেনঃ “আল্লাহ্ পাক তো আপনাকে (সকল ফেরেশতা জিবরাঈলের অনুগত ও বিশ্বস্ত) বলে অভিহিত করেছেন। এ ফেরেশতাও নিশ্চয় আপনার কথা মানতে বাধ্য। বলুননা, আমাকে জাহান্নাম দেখাক।”

জিবরাঈল (আ) বললেনঃ ‘হে মালিক ! মুহাম্মদ (সা)-কে জাহান্নাম দেখাও।’ মালিক তখন জাহান্নামের কপাট খুলে দিল। সাথে সাথেই জাহান্নাম ফুঁসে উঠল। তার অকল্পনীয় ভয়ঙ্কও অগ্নি সাঁ সাঁ আওয়াজে উপরের দিকে উঠে এলো। অবস্থায় ভঢাবহতা দেখে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মনে হতে লাগল- যা কিছু দেখা যায় সবই সে গ্রাস করে ফেলবে। তিনি জিবরাঈলকে বললেনঃ শীঘ্র মালিককে বলুন একে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নিক। জিবরাঈল (আ) তাকে সেই রকম নির্দেশ দিতেই হুকুম দিল- শান্ত হও হে জাহান্নাম ! সঙ্গে সঙ্গে সে পূর্বাবস্থায় ফিরে গেল। একে আমি প্রসারিত ছায়ার দ্রুত সংকোচনের সাথে তুলনা করতে পারি। অতঃপর মালিক জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দিল।

আবূ সাঈদ খুদরী (রা)-এর বর্ণনা মতে রাসূলুল্লাহ্ (সা) ইরশাদ করেনঃ “প্রথম আসমানে প্রবেশের পর আমি একজনকে বসা দেখলাম। তাঁর সামনে বনী আদমের রুহ পেশ করা হচ্ছে। কোনটিকে দেখি তিনি খুশি হন। বলেনঃ এ একটি পবিত্র দেহ থেকে নির্গত পবিত্র আত্মা। কোনটিকে পেশ করা হলে তিনি বিরক্তি বোধ করেন। বলেনঃ উফ্ ! এটি একটি বদ আত্মা, বদ দেহে থেকে নির্গত। প্রথমটি উজ্জল ও সাদৃশ্য, দ্বিতীয়টি কদাকার,কাল।

জিজ্ঞেস করলামঃ জিবরাঈল, ইনি কে ? বললেনঃ ইনি আপনার পিতা আদম (আ)। তাঁর সামনে বনী আদমের রুহ পেশ করা হচ্ছে। মুমিনের রুহ পেশ করা হলে খুশি হয়ে বলেনঃ পবিত্র আত্মা পবিত্র দেহ থেকে নির্গত। আর কাফিরের আত্মা পেশ হলে তিনি কষ্ট পান এবং বিরক্ত হন। বলেন, এটি এক মন্দ আত্মা, মন্দ দেহ থেকে নির্গত।

রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেনঃ “এরপর আমি কতগুলো মানুষ দেখতে পেলাম যাদের ঠোঁট উটের ঠোঁটের মতো। তাদের হাতের মাঝে আগুনে পাথর খণ্ড। তারা তা নিজেদের মুখের ভিতর ফেলছে। আর সাথে সাথে তা তাদের পশ্চাদদ্বার দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে। জিজ্ঞেস করলামঃ হে জিবরাঈল ! এরা কারা ?"

বললেনঃ এরা অন্যায়ভাবে এতিমের মাল ভক্ষণকারী।

এরপর আমি কিছু লোক দেখলাম যাদের পেটের মত এমন বীভৎস পেট আমি জীবনে দেখিনি। তারা ফেরআউন সম্প্রদায়ের গমনপথে পিপাসার্ত উটের ন্যায় পড়েচিল। জাহান্নামে যাওয়ার সময় ফেরআউন সম্প্রদায় এদের পায়ের নিচে পিষ্ট করে যাচ্ছিল। এদের এতটুকু ক্ষমতা ছিল না যে, পথের উপর থেকে সরে গিয়ে নিজেদের এ দুর্গতি থেকে রক্ষা করে।”

রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেনঃ “জিজ্ঞেস করলাম, হে জিবরাঈল ! এরা কারা ?"

তিনি বললেনঃ এরা সুদখোর ।”

রাসূলুল্লাহ্ ফরমানঃ “এরপর আর একদল লোক দেখলাম, তাদের সামনে টাটকা উপাদেয় গোশ্ত রয়েছে। তার পাশেই রাখা আছে দুর্গন্ধময় দূষিত গোশ্ত। ওরা উৎকৃষ্ট উপাদেয় গোশ্ত রেখে পুঁতিগন্ধাময় নিকৃষ্ট গোশ্ত ভক্ষণ করছে। জিজ্ঞেস করলামঃ হে জিবরাঈল ! এরা কারা ? জিবরাঈল (আ) বলেলেনঃ এরা সেইসব লোক যারা হালাল বিবি রেখে হারাম নারীদের কাছে যেত।

তিনি বলেন- এরপর একদল নারীকে দেখলাম স্তনে রশি বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। জিজ্ঞেস করলামঃ এরা কারা ? জিবরাঈল বললেনঃ এরা সেই সব নারী যারা অন্যেও ঔরসজাত সন্তানকে স্বামীর ঔরসজাত বলে চালিয়ে দিত।

আবূ সাঈদ খুদরী (রা) বলেনঃ এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) করমান, “অতঃপর জিবরাঈল (আ) আমাকে নিয়ে দ্বিতীয় আসমানে পৌঁছলেন। সেখানে দু’খালাত ভাই ঈসা ইব্ন মরিয়ম ও ইয়াহইয়া ইব্ন যাকারিয়া (আ)-এর সাথে আমার দেখা হয়। আমি তাঁদের সালাম করলে তাঁরা তার জওয়াব দিলেন, খুশি হয়ে দোয়া করলেন।

তারপর তিনি আমাকে নিয়ে তৃতীয় আসমানে পৌঁছলেন। সেখানে আমি পূর্ণিমার চাঁদের মতো সুন্দর দীপ্ত এক পুুরুষ দেখলাম। জিজ্ঞেস করলামঃ ইনি কে ? জিবরাঈল (আ) বললেন, ইনি আপনার ভাই ইউসুফ ইব্ন ইয়াকুব (আ)। আমি তাঁকে সালাম করলাম। খুশি হয়ে তিনি আমাকে সালামের জওয়াব দিলেন, স্বাগত জানালেন এবং দোয়া করলাম।

এরপর জিবরাঈল (আ) আমকে নিয়ে চতুর্থ আসমানে পৌঁছলেন। সেখানে একজনকে দেখে জিজ্ঞেস করলামঃ ইনি কে ?

জিবরাঈল (আ) বললেনঃ “ইনি ইদরীস (আ) ।”

আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, ঈদ্রীস (আঃ) এর প্রসংগ আসলে এ আয়াত রাসুলুল্লাহ (সঃ) তিলাওয়াত করেন,

ওয়া রাফা'নাহু মাকানান আলিয়্যা

অর্থঃ আমি আল্লাহ্ তাকে অতুল জ্ঞানীর মর্যাদায় উন্নীত করেছিলাম।

এরপর আমাকে নিয়ে তিনি পঞ্চম আসমানে পৌঁছলেন। সেখানে সাদা চুল ও দাঁড়িওয়ালা ঘন দীর্ঘ শ্মশ্রুমণ্ডিত এক বৃদ্ধ ব্যক্তিকে দেখতে পেলাম। এত সুন্দর বৃদ্ধ মানুষ জীবনে দেখিনি। জিজ্ঞেস করলাম, ইনি কে ? জিবরাঈল (আ) বললেনঃ ইনি স্বজাতির পরম প্রিয় হারুন ইব্ন ইমরান (আ)।

তারপর জিবরাঈল (আ) তাঁকে নিয়ে ষষ্ঠ আসমানে আরোহণ করলেন। সেখানে তিনি বাদামী রং এবং উন্নত নাসিকাবিশিষ্ট দীর্ঘকায় ব্যক্তিকে দেখলেন। যিনি ছিলেন অনেকটা সানআ গোত্রের লোকদের মতো। জিজ্ঞেস করলাম- ইনি কে ?

জিবরাঈল (আ) বললেনঃ ইনি হলেন আপনার ভাই মূসা ইব্ন ইমরান (আ)।

এদের সকলকেই তিনি সালাম করলেন। সকলেই আনন্দিত হয়ে সালামের জওয়াব দিলেন। মারহারা বলে অভ্যর্থনা জানালেন এবং কল্যাণের জন্য দোয়া করলেন।

এরপর তাঁরা সপ্তম আসমানে আরোহণ করলেন। সেখানে দেখলেন, এক বৃদ্ধ ব্যক্তি বায়তুল মা’মুরের দরজার কাছে কুরসীতে উপবেশন করে আছেন। বায়তুল মা’মুর ফেরেশতাদের এমন এক মসজিদ যাতে দৈনিক সত্তুর হাজার ফেরেশতা ইবাদতের জন্য প্রবেশ করে। একবার যারা প্রবেশ করে, কিয়ামত পর্যন্ত তারা আর সেখানে প্রবেশের পালা পাবে না।

রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেনঃ কুরসীতে বসা ব্যক্তির সাথে তোমাদের এ সাথীর (নিজের) চেয়ে অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ আর কাউকে দেখিনি। জিজ্ঞেস করলামঃ হে জিবরাঈল ! ইনি কে ? তিনি বললেনঃ ইনি আপনার পিতা ইবরাইীম (আ)। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁকে সালাম দিলেন। তিনি খুশি হয়ে জওয়াব দিলেন, স্বাগত জানালেন এবং দোয়া করলেন।

এরপর জিবরাঈল (আ) তাঁকে নিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করলেন। অসংখ্য জানা- অজানা ও অদৃষ্টপূর্ব নিয়ামত দর্শন করলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেনঃ ঈষৎ কালো রক্তিম অধরাবিশষ্ট অপরুপ এক রুপসীকেও দেখতে পেলাম সেখানে। মুগ্ধ হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলামঃ তুমি কার জন্য ? সে বলল- আমি যায়েদ ইব্ন হারিসার জন্য। রাসূলুল্লাহ্ (সা) হযরত যায়েদকে এ সুসংবাদ জানিয়েছিলেন। (ইব্ন হিশাম)

এরপর তাঁরা সেখান থেকে সিদরাতুল মুনতাহা নামীয় সীমান্তবর্তী এক অতিকায় বৃক্ষের কাছে পৌঁছলেন। যা দৃশ্যযোগ্য জগতের সর্বশেষ প্রান্ত। বাহন সিঁড়ি এখানে থেমে গেল।

এরপর সায়্যিদুল কাউনাইন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালামের জন্য আল্লাহ্ জাল্লা শানুহুর তরফ থেকে ‘রফরফ’ নামক এক নূরের বাহন প্রেরণ করা হলো। যা সবুজ অতি উজ্জ্বল নূরের এক গালিচা। জিবরাঈল আমীনের ইশরায় দীন ও দুনিয়ার সরদার রাহমাতুল্লিল আলামীন (সা) তাতে আরোহণ করলেন। জিবরাঈল আমীন এখানে থেমে দাঁড়ালেন। অবাক হয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেনঃ হে প্রিয় সাথী জিবরাঈল ! তুমি থেমে গেলে যে ? তিনি বললেনঃ হে মুহম্মাদ (সা) ! এখানেই আমার যাত্রা শেষ। এর অধিক যাওয়ার ক্ষমতা আমার নেই। এর উপর যদি আমি আরোহণ করি আল্লাহর খাস নূরের তাজাল্লীতে আমি পুড়ে ছাই হয়ে যাব।

নবীয়ে দু’জাহান (সা)-কে বহন করে ছুটে চলল রফ রফ নূরের এক বিশাল জগত ভেদ করে। অপরিসীম নৈশব্দের স্তব্ধতা ও অত্যুজ্জ্বল নূরে পূর্ণ সে মহাজগত। সে নৈশব্দের ভয়াবহতা বুঝানো যায় এমন কোন উপমা নেই এ জগতে। যার সীমা আর পরিপূর্ণ রুপ একমাত্র আল্লাহ্ই জ্ঞান (যাকে বলা হয় আলমে আমর)।

রফরফ সে পবিত্র মহাজগত ভেদ করে আল্লাহ্ জাল্লা শানুহুর আরশে আজীমের কাছে পৌঁছে থেমে গেল। আদেশ হলো- হে মুহাম্মদ! আরশে আজীমে উঠে আসুন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) আরশে আজীমে আরোহণ করতে যাবেন, খোয়াল হলো তাঁর পায়ে জুতা। তাঁর মনে পড়ল পবিত্র তূর পাহাড়ে আরোহণ করতে গেলে রাব্বুল আলীমীন মূসা (আ)-কে জুতা খুলে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাই রাসূলুল্লাহ্ (সা) জুতা খোলার উপক্রম করলেন। হুকুম এলো- জুতা পায়ে নিয়েই আপনি আসুন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) হুকুম মতো তশরীফ নিলেন। আল্লাহ্ পাকের বর্ণনাকারী অনুযায়ী

ফাকানা ক্বাবা ক্বাওসাইনি আও আদনা

ধনুকের ছিলা ধরে টান দিলে দুটি প্রাপ্ত যত কাছে এসে যায় রাব্বুল আলামীনের ততটুকু নিকটবর্তী হয়ে পূর্ণ দীদারে ইলাহীর দৌলত লাভে ধন্য হলেন আকায়ে নামদার তাজদারে মদীনা নবীয়ে দু’জাহান সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

আল্লাহ্ জাল্লা শানুহুর সামনে ভয়, ভক্তি আর মহব্বতের সম্মিলিত এক মহত্তম রুপ নিয়ে দু’জানু হয়ে (আত্তাহিয়্যাতু সুরতে) বসে পড়লেন নবীয়ে কারীম (সা)। উচ্ছসিত আবেগে বললেনঃ

আত্তাহিয়্যাতু লিল্লাহি ওয়াস সালাওয়াতু ওয়াত্‌ তাইয়্যেবাতু

অর্থঃ আমার জানী ও মালী ইবাদতের সবকিছু এবং পবিত্রতম সকল কিছু একমাত্র তোমারই জন্য হে আমার আল্লাহ্ !

খুশি হলেন রাব্বুল আলামীন। ইরশাদ করলেন-

আসসালামু আলাইকা ইয়া আইয়্যুহান নাবিয়্যু ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু

অর্থঃ আমি আল্লাহর পক্ষ থেকে শান্তি, রহমত আর বরকত সব তোমার উপর হে নবী

সাথে সাথেই নবীজি বলে উঠলেনঃ

আসসালামু আলাইনা ওয়া আ'লা ঈবাদিল্লাহিস সলেহীন ।

অর্থঃ ও আল্লাহ্ ! তোমার (দয়ার দান) শান্তি ( সালাম ) আমাদের সকলের উপর হোক এবং তোমার নেককার বান্দাদের উপরও।

এবার হাজেবান সকল নৈকট্য লাভকারী ফেরেশতারা সমস্বরে বলে উঠলেনঃ

আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্‌ দাহু লা শারিকালাহু ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আব্দুহু ওয়া রাসুলুহু

অর্থঃ সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ্ ছাড়া কোন মাবুদ নেই, তিনি একক, নাই তাঁর কোন শরীক এবং আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি, মুহাম্মদ (সা) তাঁর বান্দা এবং রাসূল।

এরপর কুরআন পাকের ভাষায়-

যা কিছু জানাবার ও বলার ইচ্ছা ছিল রাব্বুল আলামীনের, সবই তাকে বলা হলো, ভাব বিনিময় হলো।

— সূরা নাজমঃ ১০

এবার বিদায়ের পালা। আল্লাহ্ রাহমানুর রাহিম তাঁর উম্মতের কল্যাণের জন্য দৈনিক পঞ্চাশ ওয়াক্ত নামাযের তোহ্ফা দান করলেন। এ নামায হবে উম্মতের জন্য মি’রাজ- দেখা হবে মা’বুদের সাথে। কথা হবে। খুশি মনে তা নিয়ে ফিরে চললেন পৃথিবীর পথে, উম্মতের কাছে। হযরত ইবরাহীম (আ)-এর কাছ হয়ে অবতারণ করলেন। ষষ্ঠ আসমানে মূসা (আ)-এর কাছ হয়ে আসার পথে তিনি তাঁর গতিরোধ করলেন। বললেনঃ হে সম্মানিত ভাই মুহাম্মদ ! দরবারে ইলাহী থেকে কি তোহ্ফা এনায়েত হলো? কি নিয়ে যাচ্ছেন আপনি ?

রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেনঃ উম্মতের জন্য দৈনিক পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত। মূসা (আ) বাধা দিলেন, ফিরে যান মুহাম্মদ ! আল্লাহ্ পাকের দরবার থেকে আরো কমিয়ে আনুন। বনী ইসরাঈলের অভিজ্ঞতা থেকে আমি জানি, ওদের উপর মাত্র দুই ওয়াক্ত সালাত ছিল। ওরা তা আদায় করতে পারেনি।

ইমাম নাসাঈ বর্ণিত আনাস ইব্ন মালিকের রেওয়ায়েত অনুযায়ী রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেনঃ আমাকে বলা হলো- পৃথিবী সৃষ্টির দিনে আমি আপনার ও আপনার উম্মতের উপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত করজ করেছি। আপনি এ আদেশ প্রতিপালন করুন এবং উম্মতকে প্রতিপালন করতে বলুন। ফেরার পথে মূসা (আ)-এর কাছে এলাম। তিনি বললেনঃ আপনার উম্মতের মাঝে এ ফরয পালনের শক্তি নেই। তাই আপনি আপনার রবের কাছে ফিরে গিয়ে আরও কম করে দেওয়ার আবেদন করুন। এ রেওয়ায়েতমতে তিনি আবার রবের দরবারে ফিরে গেলে দশ ওয়াক্ত কম করে দেওয়া হলো। প্রতিবারেই দশ করে কমানো হয়। শেষ পর্যন্ত পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরজ অবশিষ্ট থাকে।

হযরত সাবেত বানানীর তরিকায় আনাস ইব্ন মালিকের রেওয়ায়েতে ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেন যে- রাসূলুল্লাহ্ (সা) ইরশাদ করেনঃ [হযরত মূসা (আ)-এর প্রশ্নের জওয়াবে] আমি বললামঃ আল্লাহ্ পাক পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরজ করেছেন।

তিনি বললেনঃ রাব্বুল আলামীনের দরবারে গিয়ে আরও কমিয়ে দেওয়ার আরজ করুন। কারণ আপনার উম্মতের এ সাধ্য নাই। বনী ইসরাঈলকে তো আমি খুব পরীক্ষা করলাম।

তাঁর কথামত আমি রবের দরবারে ফিরে এলাম। বললামঃ রাব্বুল আলামীন ! আমার উম্মতের উপর সালাত আরও কম করে দিন। আল্লাহ্ ত’আলা পাঁচ ওয়াক্ত নামায কমিয়ে দিলেন। (এক্ষেত্রে এ বর্ণনাটিই অধিকতর যুক্তিযুক্ত মনে হয়) আমি ফেরার পথে মূসা (আ)-এর কাছে এলাম। পাঁচ ওয়াক্ত সালাত কমিয়ে দেওয়ার কথা জানালাম। তিনি বললেনঃ আপনার উম্মতের এ সাধ্যও নাই। আবার গিয়ে কম করে আসুন।

রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেনঃ এভাবে বরাবর আমি রব ওমূসার মাঝে যাওয়া-আসা করলাম। (আর প্রতিবার কম করার জন্য নিবেদন করলাম) শেষ পর্যন্ত (পাঁচ ওয়াক্ত করে প্রতিবার কমাতে কমাতে মাত্র পাঁচ ওয়াক্ত যখন অবশিষ্ট থাকল) আল্লাহ্পাক বললেনঃ “হে মুহম্মদ ! এ পাঁচ ওয়াক্ত সালাতই থাকল দিবা-রাতের মাঝে। কিন্তু প্রত্যেক সালাতের জন্য দশ সালাতের সওয়াব দিলাম। ফলে সে পঞ্চাশ সালাতই হয়ে যাবে। আর যে ব্যক্তি কোনও নেক কাজের ইচ্ছা করবে, এরপর তা আমল করবে না তার জন্যও একটি নেকী দেওয়া হবে। এবং যে ব্যক্তি ইচ্ছা করার পর আমলেও পরিণত করবে সে দশ নেকীর সওয়াব লাভ করবে। অপরদিকে কোন ব্যক্তি মন্দকাজের কেবল ইচ্ছা করলে তার জন্য কোন গোনাহ লিখা হবে না, যতক্ষণ না সে সেই কর্মটি করে। আর যদি ইচ্ছা করার পর সে ঐ মন্দ কাজটি করে ফেলে তবে তার জন্য একটিমাত্র গোহান লিখা হবে। এরপর আমি ফিরে এলাম। মূসা (আ)-এর কাছে এসে সব জানালাম। তিনি বললেনঃ আপনি আবার দরবারে ফিরে যান এবং কম করে দেওয়ার আবেদন করুন। আমি বললাম- আনেকবার গিয়েছি রবের কাছে। আবার যেতে লজ্জা করছে।

হযরত কাতাদাহ [হযরত আবূ হুরায়রা (রা)-এর মাধ্যমে বর্ণিত রেওয়ায়েত মতে] বলেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) ইরশাদ করেনঃ “ আমি বললাম, বারবার আবেদন জানাতে আমার খুব লজ্জা লাগছে। তাই আমি এ আদেশই মেনে নিলাম।”

এমন সময় একটি আওয়াজ শুনলামঃ “আমি আমার ফরজ কার্যকর করে দিয়েছি এবং বান্দাদের জন্য সহজ করে দিয়েছি।”

হযরত মূসা (আ)-কে রাসূলুল্লাহ্ (সা) উত্তম বন্ধু বলে অভিহিত করেছেন উপরোক্ত কারণে। এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) মাটির পৃথিবীতে ফিরে এলেন এবং উম্মে হানীর ঘরে পৌঁছে ঘুমিয়ে পড়লেন।

ইমাম নাসায়ী বর্ণিত হযরত আনাস ইব্ন মালিক (রা)-এর রেওয়ায়েতে বলা হয়েছে,

রাসূলুুল্লাহ্ (সা) বলেনঃ এরপর আমি সপ্তম আসমানেরও বহু ঊর্ধ্বে গেলাম এবং সিদরাতুল মুনতাহায় পৌঁছলাম। আমাকে হালকা মেঘলার মতো নূর ঘিরে ফেলল, আমি সিজদায় পড়ে গেলাম। আমাকে বলা হলো- হে মুহাম্মদ ! আমি আপনার উপর এবং আপনার উম্মতের উপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরজ করেছি আসমান-জমিন সৃষ্টির দিনেই।

হযরত আবদুর রহমান ইব্ন জুবায়ের হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণনা করেনঃ রাসূলুল্লাহ্ (সা) ইরশাদ করেন-

মিরাজে আমি একদল লোকের কাছ দিয়ে অতিক্রম করলাম যাদের হাতে তামার নখ ছিল। এ নখ দিয়ে তারা নিজেদের মুখমণ্ডল ও বুক আঁচড়াচ্ছিল। আমি জিবরাঈল (আ)-কে জিজ্ঞেস করলাম, এরা কারা ? তিনি বললেনঃ এরা ঐসব লোক, যারা মানুষের গোশ্ত খায় অর্থাৎ মানুষের গীবত করে, অপরের মান- সম্মান নষ্ট করে।

— আবূ দাউদ

তথ্যসূত্র

  • রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর জীবনে আল্লাহর কুদরত ও রুহানিয়াত (লেখকঃ মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুল গফুর হামিদী, প্রকাশকঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ)