মুজাদ্দিদে আলফে সানী

From Sunnipedia
Jump to: navigation, search

মুজাদ্দিদ’ শব্দের অর্থ সংস্কারক। ‘আলফুন’ অর্থ হাজার এবং ‘সানী’ অর্থ দ্বিতীয়। সুতরাং “মুজাদ্দিদে আলফে সানী”-এ শব্দের অর্থ হচ্ছেঃ “দ্বিতীয় হাজার বছরের সংস্কারক”। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, ১০১০ হিজরীর, ১০ই রবিউল আউয়াল, সাইয়েদুল মুরসালীন, রাহমাতুল্লিল আলামীন হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম রূহানীভাবে হযরত শায়খ আহমদ সিরহিন্দীকে ‘মুজাদ্দিদ’ উপাধিতে ভুষিত করেন। উল্লেখ্য যে, হযরত মুজাদ্দিদ (রহ.)-এর কর্ম জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, তিনি শুধু শতকের ‘মুজাদ্দিদ’ ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন হাজার বছরের মূজাদ্দিদ। পরিস্থিতি ও পারিপার্শ্বিকতার আলোকে পরিস্কার ভাবেই উপলব্ধি করা যায় যে, ফিত্না-ফাসাদ পূর্ণ অবস্থার মধ্যে হযরত মুজাদ্দিদে আলফে সানী (রহ.) যে বৈপ্লবিক কর্মসূচী গ্রহণ করে ভারত বর্ষের তৎকালীন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক জীবনধারার সংস্কার সাধন করেছিলেন, তাই তার সংস্কারকে শত বছরের গন্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, হাজার বছরের সংস্কার কর্মের রূপরেখায় ব্যাপ্ত করে দিয়েছে।

হযরত রাসূলে করীম (স.) তাঁর উম্মতের উপর একবার পাঁচশো বছর পর, আবার এক হাজার বছর পর ভীষণ দুর্যোগ নেমে আসবে বলে তিনি তাঁর জীবদ্দশায় আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। বস্তুত তাঁর সে ভবিষ্যদ্বানী বাস্তবে রূপায়িত ও হয়। হযরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের ইনতিকালের পাঁচশো বছর পর মুসলিম জাহানে দেখা দেয় বর্বর তাতারদের হামলা, তাতারী হামলার কবলে পড়ে ইসলাম ও মুসলমানদের অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাওয়া উপক্রম হয়েছিল। তখন মহান আল্লাহ্ স্বীয় কুদরতে ‘উসমানিয়া খিলাফত প্রতিষ্ঠা করে, তাদের দ্বারাই দ্বীন ইসলামের হিফাযত করেন। অর্থাৎ যারা এক সময় ইসলামের শত্রু ছিল, আল্লাহ্ তায়ালা তাদের অন্তরে ইসলাম প্রীতি উজ্জীবিত করে দেন; ফলে তারাই শেষ পর্যন্ত ইসলামের বন্ধু ও রক্ষকে পরিণত হয়।

উল্লেখ্য যে, তাতাদের ধ্বংসলীলার পর ৬ষ্ঠ শতকে ইসলাম ও মুসলিম কাওমের জীবন ধারা নতুন খাতে প্রবাহিত হতে থাকে এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় নতুন যুগের সূচনা হয়। মুসলিম দেশগুলোতে লক্ষ লক্ষ আলিম-ফাযিল, ওলী-দরবেশ, জ্ঞানী-গুণী ও বিভিন্ন মনীষীর আবির্ভাব ঘটে। তাদের জ্ঞান-গরিমা ও উন্নত চরিত্রের পরশে ইসলাম পুনরুজ্জীবিত হয় । ধন্য হয় সারা মুসলিম জাহান এবং মুসলিম কাওম আবার শান-শওকত ও শৌর্য-বীর্যের স্বর্ণ শিখরে আরোহন করতে সক্ষম হয়। এই ধারা পাঁচশো বছর ধরে অব্যাহত থাকে। তারপর আবার শুরু হয় মুসলমানদের পতনের যুগ। অর্থাৎ প্রথম হাজার বছর শেষ হওয়ার পর।

দ্বিতীয় হাজার বছরের শুরু থেকে মুসলিম জাহানে পুনরায় দুর্যোগের ঘনঘটা দেখা দেয়। এ সময় ইহুদী, নাসারা, মুশরিক, মুরতাদ ও মুনাফিকরা নানাভাবে ইসলাম ও মুসলমানদের ক্ষতি করার জন্য বদ্ধপরিকর হয় । অন্যদিকে মুসলিম সমাজের মাঝে ধর্মের নামে অধর্ম এবং পীরি-মুরীদীর নামে অনেক বিদ্‘আত ও ফাসেকী কর্মকান্ড দেখা দেয়। শিয়া-সুন্নী ও রাফেজী খারেজী ইত্যাদি উগ্র সাম্প্রদায়িকতা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। এক কথায়- বাইরের শত্রুর আক্রমণ এবং নিজেদের পারস্পরিক কোন্দল, স্বার্থের হানাহানি ও হীন চক্রান্তের মাঝে পড়ে মুসলমানরা অতল তলে নিমজ্জিত হতে থাকে। বিশেষত: তদানীন্তন ভারতে মুসলমানদের অবস্থা সবচেয়ে মারাত্মক অবস্থায় এসে পৌঁছে । স্বেচ্ছাচারিতার উদ্যাম সয়লাবের মুখে মহানবী (স.) এর আদর্শ হেয়, লাঞ্ছিত ও পদদলিত হতে থাকে। ঠিক এমনি দুর্যোগপূর্ণ মুহুর্তে হযরত শায়খ আহমদ সিরহিন্দী (রহঃ) কে আল্লাহ্ তায়ালা মুজাদ্দিদ রূপে প্রেরণ করেন। হযরত মুজাদ্দিদ (রহঃ) আল্লাহ্ প্রদত্ত দায়িত্ব অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে পালন করেন, যার ফলে এই উপ মহাদেশে মৃত প্রায় ইসলাম পুনরুজ্জীবিত হয়।

উল্লেখ্য যে, হযরত মুজাদ্দিদে আলফে সানী (রহঃ) হলেন সেই মহান ব্যক্তি, যার সম্পর্কে রাসূলে পাক (স.) একটি গুরুত্বপূর্ণ ভবিষ্যদ্বানী করেন। তিনি বলেনঃ

একাদশ শতকের প্রারম্ভে মহান আল্লাহ্ দুনিয়ার বুকে এমন এক ব্যক্তিকে প্রেরণ করবেন, যিনি উজ্জ্বল ‘নূর’ স্বরূপ হবেন। তার নামকরণ করা হবে আমারই নামানুষারে। দু’জন স্বেচ্ছাচারী বাদশার যুগে তাঁর আবির্ভাব হবে। তাঁর তালিম ও তরবীয়তে অসংখ্য লোক জান্নাতে প্রবেশ করবে।

— মাওলানা হাসান কাশ্মী (র); রওজাতুল কাইয়ুমিয়া। পৃ. ৩৭-৩৮

উপরোক্ত হাদীসে যে দু’জন স্বেচ্ছাচারী বাদশার কথা বলা হয়েছে, তারা ছিলেন সম্রাট আকবর ও তাঁর পুত্র জাহাঙ্গীর। আকবরের শাসনামলে প্রকৃতপক্ষে হযরত মুজাদ্দিদ (রহঃ)-এর সংস্কারমূলক কাজ শুরু হয় এবং জাহাঙ্গীরের আমলে তা পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়।

তথ্যসূত্র

  • মুজাদ্দিদ-ই-আলফে সানী (রহঃ) জীবন ও কর্ম (লেখকঃ ডক্টর আ. ফ. ম. আবু বকর সিদ্দীক)