মুজাদ্দিদ কাকে বলে ?

From Sunnipedia
Jump to: navigation, search

‘মুজাদ্দিদ’ আরবী শব্দ। এর অর্থঃ দ্বীনের সংস্কারক। মানুষ যখন ধর্ম বিমুখ হয়ে স্বেচ্ছাচারিতা ও শয়তানের পায়রবী শুরু করে, নৈতিক ও জাতীয় জীবন হয় কলুষিত, তখন তাদের হিদায়েতের প্রয়োজনে আল্লাহ্ তায়ালা বিশেষ দায়িত্ব সহকারে তাঁর তরফ থেকে প্রতিনিধি প্রেরণ করেন। এটাই চিরন্তন রীতি। নবূওত ও রিসালাতের ধারা বন্ধ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত যুগে যুগে তাদের আগমন ঘটেছে। তাঁরা সবাই পথহারা, গুমরাহের মানুষদের সত্যপথের সন্ধান দিয়ে গেছেন। এ ধারা বন্ধ হয়ে গেলে, নবী চরিত্রের যাবতীয় গুণাবলীর অধিকারী নায়েবে নবীদের উপর এ মহান দায়িত্ব অর্পিত হয়।

সত্য-দ্বীনের অনুসারী আলিম-উলামা, কামিল-মুকাম্মিল আল্লাহ্র ওলী, পীর দরবেশগণ সকলে নবীর নায়েব বা প্রতিনিধিরূপে মানব জাতিকে হিদায়েত দান করেন। কিন্তু ‘মুজাদ্দিদ’ পদটি অন্য সব উপাধি থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও শ্রেষ্ঠ। কাউকে ‘মুজাদ্দিদ’ রূপে গ্রহণ করার অর্থ হলোঃ ইলম ও আখলাক, উভয় ক্ষেত্রে তার মহত্বকে স্বীকার করা। বস্তুতঃ দ্বীনের সংস্কার সাধন নবীদের কাজ এবং এই কাজ কেবল তারাই করতে পারেন, যারা আখলাকে নাবী বা নবী চরিত্রের জীবন্ত প্রতীক এবং দ্বীনের সংস্কার বা ধর্মের প্রকৃত রূপায়নের কাজ সুন্দর ও সুচারুরূপে সম্পন্ন করার মত পরিপূর্ণ যোগ্যতার অধিকারী।

উল্লেখ্য যে, যে কোন ব্যক্তি নিজের চেষ্টা ও সাধনা বলে বড় আলিম ও কামিল হতে পারে, কিন্তু নবুওত যেমন স্বীয় চেষ্টা ও সাধনা বা দলীয় সমর্থন দ্বারা লাভ করা সম্ভব হয়না, তেমনি মুজাদ্দিদ উপাধি লাভ করাও সম্ভব নয়। নবূওত যেমন আল্লাহ্ তায়ালার একটি মহান দায়িত্ব, তেমনি ‘মুজাদ্দিদ’ উাপাধি প্রদান ও তাঁর আরেকটি বিশেষ নিয়ামত। আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছা করেন, তিনিই কেবল এই মহান পদের অধিকারী হতে পারেন। কারও পক্ষে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় এ পদে উন্নীত হওয়া আদে․ সম্ভব নয়। কাজেই সাধারণ ‘হাদী’ বা পথপরিদর্শক এবং ‘মুজাদ্দিদ’ এক কথা নয়; বরং উভয়টির মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান। আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন নবী-রাসূলদের আবির্ভাব সম্পর্কে আল-কুরআনের বিভিন্ন স্থানে بعثت ‘বে‘সাত শব্দ ব্যবহার করেছেন, যার অর্থ প্রেরণ। যেমন তিনি ইরশাদ করেছেনঃ

তিনিই সে মহান স্রষ্টা, যিনি নিরক্ষর লোকদের নিকট তাদের মধ্য থেকেই একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন।

— আল্-কুরআন, সূরা জুম’আ, আয়াত নং- ২

আমি কখনো আযাব দেইনা, যতক্ষণ না আমি তাদের নিকট রাসূল প্রেরণ করি।

— আল্-কুরআন, সূরা বনী ইসরাইল, আয়াত নং ১৫

আমি তাদের নিকট রাসূল প্রেরণ করেছিলাম।

এখানে একথা পরিস্কার যে, কুরআনের পরিভাষা অনুযায়ী বে‘সাত শব্দটি দেখলেই বোঝা যায়, এখানে কোন নবীর আবির্ভাব সম্পর্কে বলা হয়েছে। কাজেই এ শব্দটি নবূওতের জন্য খাস বা নির্দিষ্ট। পক্ষান্তরে, হাদীস শরীফে ‘মুজাদ্দিদ’ উপাধির ক্ষেত্রে ও বে‘সাত শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। যেমন হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেনঃ

নিশ্চয় আল্লাহ্ তায়ালা এই উম্মতের হিদায়েতের জন্য প্রতি শতকে এমন এক মহান ব্যক্তিকে প্রেরণ করেন, যিতি তার যুগে দ্বীনের মুজাদ্দিদ বা সংস্কারক হন।

— আল্-হাদীস, আবু দাউদ শরীফ বর্ণিত

উল্লেখ্য যে, বেসাত শব্দটি নবূওতের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য অথচ উপরোক্ত হাদীসে মুজাদ্দিদ প্রেরণ সম্পর্কে একই পরিভাষা ব্যবহার করা হয়েছে। অতএব একথা স্পষ্ট যে, নবূওত ও মূজাদ্দেদীয়াত এই উভয় পদের মনোনয়ন একমাত্র মহান আল্লাহ্র পক্ষ থেকেই হয়। তফাত এতটুকু যে, নবূওত হলো ‘আসল’ বা মূল বৃক্ষ এবং মুজাদ্দেদীয়াত তার প্রতিবিম্ব বা ছায়া। নবীর প্রত্যাদেশ, কুরআনের ভাষায় যাকে ‘ওহী’ বলা হয়েছে, তা চুড়ান্ত ও ধ্রুব সত্য, আর মুজাদ্দিদের ‘ইল্হাম’ ও তার নিকটবর্তী সত্য। ইল্হাম নবীর ওহীর পরিপন্থী না হলে তা-ও ধ্রুব সত্য।

তথ্যসূত্র

  • মুজাদ্দিদ-ই-আলফে সানী (রহঃ) জীবন ও কর্ম (লেখকঃ ডক্টর আ. ফ. ম. আবু বকর সিদ্দীক)