মেঘের ছায়া প্রদান ও নবুওয়াতের লক্ষণ প্রকাশ

From Sunnipedia
Jump to: navigation, search
মুহাম্মাদ (সঃ) এর মুজিজা সমূহ 1















  • মেঘের ছায়া প্রদান ও নবুওয়াতের লক্ষণ প্রকাশ














চাচা আবূ তালিব বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে সিরিয়ায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলেন। সে সয়ম দাদা আবদুল মুত্তালিব গত হয়েছেন। বালক রাসূলুল্লাহ্ (সা) চাচার পরিবারভুক্ত হয়ে আছেন।

আবূ তালিব যখন রওয়ানা হবেন, চাঁদের মত সুন্দর বালক মুহাম্মদ (সা) এসে আবূ তালিবের জামার আস্তিন ধরে দাঁড়ালেন। ভাতিজার দিকে চেয়ে তিনি বললেনঃ ওকে ছাড়া আমি থাকতে পারব না, আমাকে ছাড়া সেও থাকতে পারবে না। ওকে আমার সাথে নিয়ে যেতে হবে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) এভাবে আবূ তালিবের বাণিজ্য কাফেলার অন্তভুক্ত হলেন।

সিরিয়ার বুসরা একটি বিখ্যাত এলাকা। অন্যানা বারের মত কাফেলা এখানে যাত্রাবিরতি করল। এখানকার বিখ্যাত খৃস্টান গির্জায় বাহিরা নামক একজন সাধক পাদ্রী থাকতেন। এ বিশাল এলাকার লোকজন ধর্মজ্ঞান ও সাধনার জন্য তাঁর প্রতি খুবই শ্রদ্ধাশীল ছিল। এ গির্জায় দীর্ঘদিনের পুরানো এক আসমানী গ্রন্থ রক্ষিত ছিল। সে যুগে এটিকেই একমাত্র ঐশী জ্ঞানের আধার বলে মনে হতো।

সাধক বাহিরার বৈশিষ্ট ছিল, তিনি লোকসমক্ষে বের হতেন না। কথাবার্তাও বলতেন না। এবার মক্কায় এ কাফেলা যখন এ গির্জার অনতিদূরে যাত্রাবিরতি করল, আশ্চার্যজনকভাবে বাহিরা এ কাফেলার জন্য আপ্যায়নের প্রচুর ব্যবস্থা করলেন। প্রকৃত ব্যাপার ছিল, প্রচন্ড রোদের ভিতর দিয়ে এ কাফেলা যখন গির্জার দিকে এগিয়ে আসছিল, বাহিরা তখন অলস চোখে সেদিকে তাকিয়েছিলেন। হঠাৎ তিনি একটি অত্যাশ্চার্য দৃশ্য দেখে চমকে উঠলেন। তিনি দেখলেন, একখন্ড ঘন মেঘ কাফেলার মধ্যকার অনিন্দ্য সুন্দর এক কিশোরের উপর ছায়া বিস্তার কওে সাথে সাথে আসছে। অবাক হয়ে বাহিরা গভীর মনোযোগের সাথে তা দেখতে লাগলেন।

কাফেলা যখন গির্জান কাছে একটি বড় বৃক্ষের নিচে ক্যাম্প করল, গাছের একটি শাখা ইষৎ নত হয়ে ঐ কিশোরের উপর পরিপূর্ণ ছায়া দান করে স্থির হয়ে রইল। ঐ চলন্ত মেঘ খন্ডটিও তাঁর উপর স্থির হয়ে থাকল। বাহিরা ভোজের আয়োজন করলেন। বাহিরা তাঁর সুদীর্গকালের নিয়ম ভেঙে গির্জা থেকে বের হয়ে এলেন। এবং লোক পঠিয়ে কাফেলার লোকদের দাওয়াত করলেন। বলে পাঠালেন, আমি আপনারদের ছোটবড়, আযাদ গোলাম সকলেই এ ভোজে শামিল হওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। আমার এখানে খাদ্যগ্রহণ করে আপনারা আমাকে বাধিত করিবেন।

কাফেলার একজন অবাক হয়ে বললেনঃ জনাব! আপনি আজ আপনার দীর্ঘকালের অভ্যাসের ব্যতিক্রম করে অভিনব কাজ করলেন। কতবার এ পথে যাতায়াত করেছি, আপনাকে তো কখনও গির্জার বাইরে বের হতে দেখিনি বা এরুপ কারও জন্য ভোজের ব্যবস্থা করতেও দেখিনি।

বাহিরা প্রকৃত ব্যাপার এড়িয়ে গেলেন। বললেনঃ আজ যেহেতু আপনারা আমার খুব কাছাকাছি যাত্রাবিরতি করলেন, তাই আপনারা আমার মেহমান। খাদ্য তৈরি হচ্ছে, আপনারা তা গ্রহণ করবেন, এ আমার অনুরোধ। কাফেলার লোকেরা খেতে গেল। মালামাল প্রহরার প্রয়োজনে এবং অল্পবয়সী বিধায় রাসূল (সা) গাছের নিচেই রয়ে গেলেন।

বাহিরা গির্জা থেকে বের হয়ে এলেন। তীক্ষ্ণ চোখে কাছ থেকে সকলকে জরিপ করে তিনি হতাশ হলেন। বললেনঃ হে কুরায়শী মেহমানগণ! আপনারদের মাঝে কেউ কি এখানে আসতে বাকি রয়ে গেছে ? লোকেরা বললঃ আসার মত যারা সকলেই এসে গেছে। কেবল একজন বালক রয়ে গেছে। বাহিরা চমকে উঠলেন। বললেনঃ কক্ষণও না। কাউকেই দয়া করে বাকি রাখবেন না। কুরায়শের এক সরদারও তীক্ষ্ণ কন্ঠে বলে উঠলো, লাত ও উজ্জার কসম! আবদুল মুত্তালিবের পৌত্র কাফেলার আছে অথচ আমাদের সাথে ভোজে শরীক হবে না এ কখনও হতে পারে না। এটা আমাদের সকলের জন্য বড় নিন্দনীয় ব্যাপার। এ সরদার নিজেই উঠে গিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে কোলে করে নিয়ে এলো এবং খাদ্যের সামনে বসিয়ে দিল।

এবার কাছ থেকে বাহিরা তাঁকে গভীরভাবে নিরীক্ষণের সুযোগ পেলেন। পূর্ববর্তী আসমনী গ্রন্থগুলো সম্পর্কে তাঁর অসাধারণ ইল্ম ছিল। সেগুলোর মাঝে শেষ রাসূল সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী ও বিশেষ বিশেষ লক্ষণসমূহের বিস্তারিত বর্ণনা বিদ্যমান ছিল। বাহিরান অন্তরে সব কিছু স্পট হয়ে গেল। খুশিতে আত্মহারা হলেন তিনি।

সকালে খেয়েদেয়ে চলে যাওয়ার সময় রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে এসে তিনি বসলেন। গম্ভীর স্বরে বললেনঃ “বালক! আমি তোমাকে লাত ও উজ্জার কসম দিয়ে বলছি- আমার কিছু প্রশ্নের তুমি জবাব দেবে।” বাহিরা জনৈক কুরায়শীকে ইতিপূর্বে লাত ও উজ্জার কসম দিতে শুনেছিলেন, তাই এরুপ বললেন। কিশোর রাসূলুল্লাহ্ (সা) বাধা দিয়ে বললেনঃ আমাকে এ লাত ও উজ্জার কসম দিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করবেন না। আল্লাহর কসম, এ দেবতাদের আমি সবচেয়ে ঘৃণা করি। বাহিরা বললেনঃ বেশ তো আল্লাহর কসম বলছি। রাসূল (সা) বললেন ঃ ঠিক আছে, কি জানতে চান বলুন। বাহিরা তাঁকে অনেক কথা জিজ্ঞেস করলেন। খাওয়া-দাওয়া ও ঘুমের বিভিন্ন অভ্যাসের কথা জিজ্ঞেস করে জানলেন। দেহের গঠন-প্রকৃতি বিশেষভাবে লক্ষ করলেন। বিশেষত তাঁর পৃষ্টাদেশ দেখলেন। তাতে মোহরে নবুওয়াত বর্ণিত মতে দেখতে পেলেন। বিস্ময়ে আনন্দে বিহবল হয়ে বাহিরা দেখলেন, সবই পূর্ববর্তী আসমানী গ্রন্থসমূহের বর্ণনার সাথে সম্পূর্ণ মিলে গেছে।

তারপর বাহিরা আবূ তালিবকে কাছে ডেকে জিজ্ঞেস করলেনঃ ছেলেটি কে ? আবূ তালিব বললেনঃ আমার। বাহিরা বললেনঃ কিন্তু এ ছেলের তো পিতা জীবিত থাকার কথা নয়। আবূ তালিব বললেনঃ “আসলে সে আমার ভাতিজা।” বাহিরা জিজ্ঞেস করলেনঃ তাঁর পিতার কি হয়েছে ? বললেনঃ তার মায়ের পেটে থাকা অবস্থায়ই পিতা ইন্তিকাল করেন।

চমৎকৃত হয়ে বাহিরা বললেন, এরকমই তো হওয়ার কথা। আপনি আপনার ভাতিজাকে নিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দেশে ফিরে যান। ইহুদীদের থেকে তাকে সাবধানে আগলে রাখবেন। আল্লাহর কসম ! ওরা যদি একে দেখতে পায় এবং নিদর্শনাবলি থেকে আমি যেমন চিনতে পেরেছি ওরাও তেমনি চিনে ফেলতে পারে তবে ওরা এ বালকের ক্ষতি করার সমূহ চেষ্টা করবে। কারণ আপনার ভাতিজাই ভবিষ্যত মানবজাতির পথপ্রদর্শক-নবী। একথা শুনে আবূ তালিব সেখানেই দ্রুত তাঁর মালামাল বিক্রয় করে দিলেন। আশাতীত মুনাফা হলো এবং রাসূলুল্লাহ (সা)-কে নিয়ে দ্রুত দেশে ফিরে এলেন।

তথ্যসূত্র

  • ইবন ইসহাক
  • মাদারেজুন্নাওয়াত
  • রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর জীবনে আল্লাহর কুদরত ও রুহানিয়াত (লেখকঃ মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুল গফুর হামিদী, প্রকাশকঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ)