রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)কে বয়কট করার চুক্তিনামা ও তার পরিণাম

From Sunnipedia
Jump to: navigation, search
মুহাম্মাদ (সঃ) এর মুজিজা সমূহ 2












  • রাসূলুল্লাহ্ (সাঃ)কে বয়কট করার চুক্তিনামা ও তার পরিণাম

















কুরায়শ দেখল ইসলাম গ্রহনকারীদের একটা বড় অংশ হাবশায় চলে গিয়ে সম্রাট নাজ্জাশীর কাছে সম্মানজনক আশ্রয় পেয়ে গেছে। কুরায়শদের হাত থেকে তারা নিষ্কৃতি পেয়ে গেছে। এদিকে হাজমা ও উমরের মত প্রভাবশালী লোকেরা মুসলমান হয়ে যাওয়ার ওরা বেশ শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। আরবের অপরাপর গোত্রেও মুসলমান সংখ্যা ক্রমে বাড়ছেই। কুরায়শরা শঙ্কিত হলো এবং এ ব্যাপারে একটি ফলপ্রসূ পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য তারা সমবেত হলো।

অনেক কথাবার্তার পর সাব্যস্ত হলো, বনু হাশেম আর বনু মুত্তালিবকে বয়কট করা হবে। কেনাবেচা, লেনদেন, বিয়ে-শাদী এবং সর্বপ্রকার সম্পর্ক ছেদ করা হবে, যতদিন না ওরা ওই পথ ত্যাগ করে কিংবা ধ্বংস হয়ে যায়। এ মর্মে আল্লাহর নামে একটা হলফনামা তৈরী হবে। এবং তা সম্পূর্ণ অলংঘনীয় করার জন্য কাবার দরজায় টানিয়ে রাখা হবে। শেষ পর্যন্ত তাই করা হলো।

দীর্ঘ দু’বছর এ দুঃসহ বয়কট চলেছিল। মুসলমানরা এবং যারা তাদের সহায়তাকারী ডয়লেন তারা অবর্ণনীয় দুঃখ ও দুর্দশার শিকার হন। বনী হাশেম থেকে একমাত্র দুরাত্মা আবূ লাহাবই স্বপক্ষ ত্যাগ করে কাফেরদের সাথে যোগ দেয়। শা’বে আবূ তালিব নামক গিরিসংকটে এ দীর্ঘ দুঃসহ দিনগুলো তাঁদের কাটে।

ক্ষুধা, তৃষ্ণা, দুঃখ ও দুর্দশায় যখন তাঁরা প্রায় অক্ষম হয়ে পড়েছিলেন, তখনই আল্লাহ্ পাকের কুদরতী সাহায্য তাদের মুক্তি দান করে। এ ব্যাপারে একই সাথে দুটি ব্যাপার ঘটে। কুরায়শদের মাঝে যাদেরকে আল্লাহর পছন্দ ছিল, তেমন কয়েকজন নেতৃস্থানীয় লোকের অন্তরে মানবতা ও মমত্ববোধ প্রবল করে দেওয়া হলো। তাদের মাঝে হিশাম ইব্ন আমর একেবারে অস্থির হয়ে উঠলেন। তিনি এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে গোপনে বহুবার মুসলমানদের সাহায্য করেছেন। একদিন অস্থির হয়ে যুহায়র ইব্ন উমাইয়ার কাছে গিয়ে মনের কথা খুলে বললেনঃ ‘হে যুহায়র! এটাই কি তোমার ভাল লাগে যে তুমি খেয়েপরে মহাসুখে থাকবে আর তোমার মাতুল বংশ দুঃসহ বয়কটে অবর্ণনীয় কষ্টে শেষ হয়ে যাবে ? আমি আল্লাহর কসম করে বলতে পারি, ওরা যদি আবূ জেহেলের মাতুল হতো তবে সে এরুপ নিষ্ঠুর কাজে কখনই সায় দিত না।

যুহায়র বললেনঃ ‘সেটা কি আমি বুঝি না হিশাম ! কিন্তু কি করব বল ! আমার সাথে যদি একজন লোকও থাকত, তবে এ চুক্তি বাতিল করার চেষ্টা করতাম এবং অবশ্যই তা করেই ছাড়তাম।’

হিশাম বললেনঃ আমি আছি তোমার সাথে। যহায়র বললেনঃ তবে দেখ তো আর কাউকে পাওয়া যায় কি না ! এরপর হিশাম একে একে মুতয়িম ইব্ন আদী, আবুল বাখতরী, যামআ ইব্ন আসওয়াদ এ তিনজন বিশিষ্ট নেতার সাথে একইরকম কথা বললেন- সকলেই একমত হলেন- অবশ্যই যে কোন মূল্যে এ চুক্তি বাতিল করতে হবে।

সিদ্ধান্ত হলো আগামীকালই এ কাজ করা হবে। যুহায়র বললেনঃ এ ব্যাপরে আমিই সকলের আগে থাকব এবং কথা বলব।

অন্যদিকে রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর চাচা আবূ তালিবকে বললেন, চাচা ! কুরায়শরা যে চুক্তি করেছে তাতে আল্লাহ্ নারাজ হয়েছেন এবং উইপোকাকে আদেশ করেছেন চুক্তিনামা খেয়ে ফেলতে। চুক্তির যে স্থানে ‘আল্লাহ্ নাম লেখা আছে শুধু সেটুকু বাদে বাকি সবটুকুই পোকা খেয়ে ফেলেছ।’

আবূ তালিব বললেনঃ ‘তোমরা আল্লাহ্ কি তোমাকে একথা জানিয়েছেন ?’ তিনি বললেন,হ্যাঁ,। আবূ তালিব বললেনঃ ভাতিজা ! তাহলে আল্লাহর কসম ! আর কোন ক্ষতি তোমার কেউ করতে পারবে না। আমি চললাম, এ বলে তিনি কাবা ঘরের দিকে রওয়ানা হলেন এবং কাবা ঘরের একপাশে এসে বসলেন।

ইতিমধ্যেই পাঁচজন কাবা শরীফের পাশে নিজ নিজ দরবারস্থলে গিয়ে হাজির হলেন। যুহায়র ইব্ন আবূ উমাইয়া অত্যন্ত জমকালো পোশাক পরে এসে প্রথমে কাবা ঘর তাওয়াফ করলেন। তারপর লোকজনকে সামনে নিয়ে অত্যন্ত জোরদার এক ভাষণ দিলেন।

হে মক্কাবাসী  ! আমরা খেয়েপরে মহা সুখে দিনাতিপাত করব, আর বনু হাশিম সমাজচ্যুত হয়ে ধ্বংস হবে, তাদের সাথে ক্রয়-বিক্রয়, লেনদেন পর্যন্ত বন্ধ থাকবে এটা কি হতে পারে ? আল্লাহর কসম ! এ অন্যায় । এ সম্পর্ক বিনষ্টকর হলফনামা এখনই আমি ছিঁড়ে টুকরো টুকরো না করে ক্ষান্ত হবো না।

তৎক্ষণাৎ আবূ জেহেল এর তীব্র প্রতিবাদ করে উঠল-তুমি মিথ্যা বলছ। আল্লাহর কসম ! ওটা কিছুতেই ছেঁড়া যাবে না। সাথে সাথেই যামআ, ইব্ন আসওয়াদ এগিয়ে বললেনঃ ‘আল্লাহর কসম ! তুমিই বরং মিথ্যাবাদী। আমরা শুরুতেই এরকম হলফনামায় সম্মাত ছিলাম না। সেই সাথে আবূ বাথতরীও বলে উঠলেন, যামআ ঠিকই বলছে। এতে যা কিছু লিখা হয়েছে আমরা তাতে রাজী নই। এবং স্বীকারও করি না। মুতায়িম ইব্ন আদী এবার গলা চড়িয়ে বললেন, তোমরা দুজনই সত্য বলেছ। এর উল্টোটা যে বলে, সে-ই বরং মিথ্যুক। আল্লাহর কাচে এ চুক্তির সাথে সম্পর্কহীনতা ঘোষণা করছি। হিশাম ইব্ন আমর এসে একই ঘোষণা প্রদান করলেন।

এবার আবূ জেহেল পুরোদস্তুর হতভম্ব হয়ে গেল। চিৎকার করে বলতে লাগল, এটা চক্রান্ত। নিশ্চয় এরা রাতের আঁধারে সলা-পরামর্শ করে এসেছে। মহা হৈ চৈ শুরু হয়ে গেল।

এতক্ষণ আবূ তালিব মসজিদের কোণে বসে সব লক্ষ করছিলেন। এবার উঠে বাইরে এলেন। সকলের সামনে গম্ভীর স্বরে ঘোষণা করলেন, হে মক্কাবাসী ! আমার ভাতিজা আমাকে একটা সংবাদ জানিয়েছেন। তোমরা যে হলফনামা আল্লাহর নামে তৈরী করেছ, তাতে আল্লাহ্ স্বয়ং ক্ষুদ্ধ হয়েছেন। তাই তাঁর হুকুমে উইপোকা ওই হলফনামায় লেখা সবকথাই খেয়ে ফেলেছে, শুধু আল্লাহর নামটি ছাড়া। তাই তোমরা আগে দেখ তোমাদের হলফনামার কি পরিণতি। যদি আমার ভাতিজার দেয়া সংবাদ সঠিক হয়, তবে তোমরা তোমাদের এ অন্যায় হলফ পরিত্যাগ করবে। আর যদি তার এ সংবাদ মিথ্যা হয় তবে আমি তাকে তোমাদের হাতে তুলে দেব।

একথায় সমস্ত মক্কাবাসী রাজী হয়ে গেল। তৎক্ষণাৎ মুতায়িম ইব্ন আদী দ্রুত এগিয়ে কাবার দরজায় লটকানো হলফনামাটি নামিয়ে আনলেন। অবাক হয়ে সকলেই দেখল যে শুধু আল্লাহর নামটি ব্যতীত হলফনামার সবকটি কথাই পোকা খেয়ে ফেলেছ। এখানোই এমনকি করে শেষ হলো এ দুঃসহ কষ্টের। পূর্বোক্ত পাঁচজনের দলটি এ হলফনামা ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেললেন।

মনসূর ইব্ন ইকরামা নামীয় যে পাপিষ্ঠ নিজ হাতে এ হলফনামা লিখেছিল তার হাত পঙ্গু এবং অবশ হয়ে গেল। আমৃত্যু এভাবেই সে জীবণ কাটাল।

তথ্যসূত্র

  • ইব্ন ইসহাক
  • রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর জীবনে আল্লাহর কুদরত ও রুহানিয়াত (লেখকঃ মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুল গফুর হামিদী, প্রকাশকঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ)