হজরত মুসা (আঃ) ও নবী (সঃ)

From Sunnipedia
Jump to: navigation, search

আলাহ্তায়ালা হজরত মুসা আ. কে এই মোজেজা দান করেছিলেন যে, তাঁর হাতের লাঠি অজগর সাপ হয়ে যেতো। আমাদের পয়গম্বর স. কেও আলাহ্তায়ালা এরকম মোজেজা দান করেছিলেন। তা হচ্ছে উস্তুনে হান্নানা অর্থাৎ খেজুর গাছের ওই খন্ড যাতে হেলান দিয়ে রসুলেপাক স. মসজিদে খোতবা দিতেন। খোত্বার জায়গায় যখন মিম্বর প্রস্তুত করা হলো, তখন তা সেখান থেকে সরিয়ে নেয়া হয়েছিলো। তখন সেই উস্তুনে হান্নানা রসুলেপাক স. এর বিচ্ছেদের কারণে আলাহতায়ালার কাছে ফরিয়াদ করেছিলো এবং স্পষ্ট ভাষায় কান্নাকাটি করেছিলো। এ ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে মোজেজা অধ্যায়ে।

ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী র. তাঁর তাফসীরে বর্ণনা করেছেন, একদিন আবু জাহেল ইচ্ছা করলো, রসুলেপাক স. কে বড় একটি পাথর মেরে পিষ্ট করে দিবে (নাউযুবিলাহ্)। একথা মনে করতেই সে দেখতে পেলো রসুলেপাক স. এর দুই কাঁধের উপর দু’টি অজগর সাপ বসে আছে। সে ভয় পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে পালিয়ে গেলো।

হজরত মুসা স. এর মোজেজা ছিল ইয়াদে বায়দা (শুভ্র হস্ত)। তা থেকে বিকশিত ঔজ্জ্বল্যে মানুষের চোখ ঝলসে যেতো। আমাদের নবী সাইয়্যেদে আলম স. তো আপাদমস্তক নূর ছিলেন। আলাহ্তায়ালা পরিপূর্ণতার সাথে তাঁকে যে সৌন্দর্য দান করেছিলেন, তার কারণে মানুষেরা নূরের তাজাল্লীতে দৃষ্টি হারানোর বিপদ থেকে নিরাপদ থাকতো। তিনি যদি মানবতার পোশাক না পরতেন, তবে কারও পক্ষেই তাঁর দিকে দৃষ্টি দেয়া সম্ভব হতো না। কেউই তাঁর সৌন্দর্য অবলোকন করতে পারতো না। তাঁর সেই নূরের বিকাশ হজরত আদম আ. থেকে নিয়ে হজরত আব্দুলাহ্ পর্যন্ত পবিত্র পৃষ্ঠ ও পবিত্র গর্ভের মাধ্যমে স্থানান্তরিত হয়ে আসছিলো।

হজরত কাতাদা ইবনে নোমান রা. একজন সাহাবী ছিলেন। ঝড় বৃষ্টির এক অন্ধকার রাত্রিতে তিনি রসুলেপাক স. এর সঙ্গে এশার নামাজ আদায় করেছিলেন। রসুলেপাক স. তাঁর হাতে একটি খেজুরের ডাল দিয়ে বললেন, যাও। এটা রাস্তার আশেপাশে দশহাত দশহাত পর্যন্ত আলো প্রদান করবে। বাড়ীতে পৌঁছে একটি কালো সাপ দেখতে পাবে তুমি। ওটাকে মেরে দূরে ফেলে দিও। আবু নাঈম এই হাদীছ বর্ণনা করেছেন।

সহীহ্ বোখারী ও অন্যান্য কিতাবে উলেখ আছে, হজরত উব্বাদ ইবনে বিশর এবং উসায়েদ ইবনে হুযায়র রা. একদা এক অন্ধকার রজনীতে রসুলেপাক স. এর খেদমত থেকে বের হলেন। তাঁদের উভয়ের হাতে লাঠি ছিলো। রাস্তায় বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের একজনের লাঠি আলোকিত হয়ে গেলো, আর তাঁরা সে আলোতে রাস্তা চলতে লাগলেন। কিছু দূর আসার পর তাঁরা যখন পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেন, তখন উভয়ের লাঠিই আলোকিত হয়ে গেলো। প্রকৃত ব্যাপার হচ্ছে, রসুলেপাক স. তো নিজেই নূর ছিলেন। সেখান থেকেই সঞ্চারিত হয়েছে এই নূর। রসুলেপাক স. এর নাম সমূহের মধ্যে নূরও একটি নাম।

ইমাম বোখারী র. তারিখ কিতাবে, ইমাম বায়হাকী ও আবু নাঈম হামযা আসলামী রা. এর মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন- হামযা আসলামী বলেছেন, আমরা একবার রসুলেপাক স. এর সঙ্গে কোনো এক সফরে ছিলাম। অন্ধকার রাতে আমরা যখন রসুলেপাক স. থেকে আলাদা হলাম, তখন অকস্মাৎ আমার আঙ্গুলসমূহ থেকে আলো বিচ্ছুরিত হতে লাগলো এবং আলোগুলো পরস্পর মিলে যেতে লাগলো। স্পষ্ট অনুভব করলাম যে, কোনো আঙ্গুলের আলোই নিভছে না।

হাদীছ শরীফে এসেছে, রসুলে আকরম স. তাঁর জনৈক সাহাবীকে তাঁর সম্প্রদায়ের লোকদের কাছে দাওয়াত দেওয়ার জন্য প্রেরণ করেছিলেন। তারা তাঁর কাছে অলৌকিকতার নিদর্শন দেখতে চাইলো, যা মুসলমানগণের সত্যতার দলীল হতে পারে। রসুলেপাক স. তাঁর দু’খানা বৃদ্ধাঙ্গুলী উক্ত সাহাবীর দু’চোখের মধ্যবর্তী স্থানে স্থাপন করলেন। তাতে তাঁর দেহের উক্তস্থান শুভ্র ও নূরানী হয়ে গেলো। সাহাবী আরয করলেন, আমার ভয় হচ্ছে লোকেরা একে কুষ্ঠরোগ মনে করে কিনা। হজরত মুসা আ. এর ঘটনা সম্পর্কে কোরআন মজীদে উক্ত হয়েছে, ‘এমন শুভ্রতা যার মধ্যে কোনো দোষ নেই।’ এরপর রসুলেপাক স. শুভ্রতাকে ওই সাহাবীর লাঠির মধ্যে স্থানান্তরিত করে দিলেন।

প্রশ্ন জাগে, হজরত মুসা আ. সমুদ্রকে লাঠির আঘাতে বিভক্ত করেছিলেন। আমাদের নবী স. কি এমন করেছেন? হাঁ, আমাদের নবী সাইয়্যেদে আলম স. হাতের আঙ্গুলের ইশারায় চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত করেছিলেন। এতো আরও বিস্ময়কর ও মহান ঘটনা। কেননা হজরত মুসা আ. এর ক্ষমতা সীমাবদ্ধ ছিলো এই মাটি পানির পৃথিবীতে। আর আমাদের নবী স. এর ক্ষমতা বিস্তৃত ছিলো নভোজগতে। এই দুইয়ের মধ্যে পার্থক্যের পরিমাণ সহজেই অনুমেয়। বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে, আসমান ও যমীনের মধ্যে ‘মাকুকুফ’ নামক একটি মহাসমুদ্র রয়েছে। পৃথিবীর সাগর উক্ত মহাসাগরের তুলনায় একটি বিন্দু। ওই মহাসাগর রসুলেপাক স. এর জন্য দ্বিখণ্ডিত করা হয়েছিলো। মেরাজ রজনীতে তিনি উক্ত সাগর পাড়ি দিয়ে দীদারে এলাহীতে গিয়েছিলেন। নিশ্চয় হজরত মুসা আ. কর্তৃক নীল দরিয়া দ্বিখণ্ডিত করার চেয়ে এই ঘটনা অধিকতর মর্যাদাশালী।

দোয়া কবুল প্রসঙ্গ

ফেরাউনকে নীল দরিয়ায় নিমজ্জিত করার জন্য হজরত মুসা আ. আলাহ্তায়ালার নিকট দোয়া করেছিলেন। আলাহ্তায়ালা তা কবুলও করেছিলেন। এটি ছিলো সীমিত পরিসরের দোয়া, আর রসুলেপাক স. যে আলাহ্তায়ালার নিকট দোয়াসমূহ করেছিলেন এবং তা কবুল হয়েছিলো, তার কিন্তু কোনো সীমা নেই, হিসাব নেই।

পানি প্রবাহিত করা

হজরত মুসা আ. এর মোজেজা ছিলো, তিনি পাথর থেকে ঝর্ণা জারী করে দিয়েছিলেন। আর আমাদের পয়গম্বর স. এর মোজেজা এই, তিনি আপন আঙ্গুল থেকে ঝর্ণা জারী করে দিতেন। পাথর তো মাটি জাতীয় পদার্থ, আর মাটি থেকে পানি প্রবাহিত হওয়ার তুলনায় রক্তমাংশের দেহ থেকে পানি জারী হওয়া অধিকতর অস্বাভাবিকও বিস্ময়কর।

আলাহ্তায়ালার সঙ্গে বাক্যালাপ

হজরত মুসা আ. এর ফযীলত বর্ণনায় হকতায়ালা এরশাদ করেছেন,’আলাহ্তায়ালা হজরত মুসা আ. এর সঙ্গে কথা বলেছেন।‘ আমাদের নবী সাইয়্যেদে আলম স. এর সঙ্গেও আলাহ্তায়ালা কথা বলেছেন শবে মেরাজে।

দু’জন নবীর কালামের অবস্থা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আলাহ্তায়ালা রসুলে আকরম স. এর সাথে একান্তে কথা বলেছেন, যা সংঘটিত হয়েছিলো সমগ্র নভোমন্ডলের উপরে সিদরাতুল মুন্তাহার কাছে। আর তা হচ্ছে সৃষ্টিকুলের যাবতীয় এলেমের শেষ সীমা। আর হজরত মুসা আ. এর সঙ্গে আলাহ্তায়ালার একান্ত কথা হয়েছিলো সীনাই পর্বতে। রসুলে আকরম স. এর সঙ্গে আলাহ্পাকের আলাপনের স্থান পাহাড় নয়, জগত নয়, আকাশ নয়। বরং আকশসমূহেরও ঊর্ধ্বে।

ভাষার প্রাঞ্জলতা ও অলংকার গুণ

হজরত হারুন আ. কে ভাষার প্রাঞ্জলতা ও অলংকরণের বৈশিষ্ট্য প্রদান করা হয়েছিলো। যেমন হাদীছ শরীফে উক্ত হয়েছে হার“ন আ. সম্পর্কে হজরত মুসা আ. এর ভাষ্য, আমার ভাই হারুনের ভাষা আমার চেয়ে প্রাঞ্জল। আমাদের পয়গম্বর সাইয়্যেদে আলম স. এর ভাষার প্রাঞ্জল্য ও অলংকার গুণ এতো অধিক ছিলো যে, তার গভীরতা কল্পনা করাও সম্ভব নয়। হজরত হারুন আ. এর ফাসাহাত বা প্রাঞ্জলতা কেবল ইবরানী ভাষাতে ছিলো। কিন্তু আরবী ভাষা তার চেয়ে অধিকতর ফাসাহাতপূর্ণ। তদুপরি হজরত মুসা আ. বলেছেন, আফসাহুমিন্নী অর্থাৎ ‘আমার চেয়ে অধিক প্রাঞ্জল।’ এখানে তিনি মুতলাক বা সাধারণভাবে বলেননি। অর্থাৎ সকলের চেয়ে বিশুদ্ধ ও প্রাঞ্জল ছিলো- একথা বলেননি। কেননা হজরত মুসা আ. এর বাচনে জড়তা ছিলো।

তথ্যসূত্র

  • মাদারিজুন নবুওয়ত (লেখকঃ আবদুল হক মুহাদ্দেসে দেহলভী (রহঃ))