হযরত উমর (রাঃ)এর ইসলাম গ্রহণের কাহিনী

From Sunnipedia
Jump to: navigation, search
মুহাম্মাদ (সঃ) এর মুজিজা সমূহ 2


























  • হযরত উমর (রাঃ)এর ইসলাম গ্রহণের কাহিনী



হযরত ইমাম আহমদ (র) হযরত উমর (রা)-এর নিজের বর্ণনা রেওয়ায়েত করেন। হযরত উমর (রা) বলেন, ইসলাম গ্রহণের আগে আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পিছে লেগে থাকতাম। একদিন তিনি আমার আগে মসজিদে হারামে চলে গেলেন। আমিও গেলাম। তাঁর পিছনে দাঁড়িয়ে থাকলাম। তিনি সালাতে সূরা আল-হাক্কা পড়তে আরম্ভ করলেন। কুরআনের ভাষাশৈলী লক্ষ করে অবাক হয়ে গেলাম। এবং অন্য কুরায়শদের মতো আমি মনে মনে ভাবলাম, আল্লাহর কসম ! তিনি একজন কবি। তখনই শুনলান, তিনি তিলাওয়াত করেছেনঃ

এ কুরআন অবশ্যই এক মহা-মর্যাদাবান রাসূলবাহিত বাণী। এটা কোন কবির কাব্য নয়। অথচ তোমরা খুব কমই তা বিশ্বাস করো।

এ তিলাওয়াত শুনে মনে মনে ভাবলাম, তিনি একজন গণক। এ সময় তাঁকে আবার তিলাওয়াত করতে শুনলাম।

এবং এ কোন গণকের কথা নয়, কিন্তু খুব কমই উপদেশ গ্রহণ কর তোমরা।

এতে আমার অন্তরে ঈমানের আলো প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল। হযরত উমর (রা) থেকে আবূ নায়ীম বর্ণনা করেন, উমর (রা) বলেছেন, আমি আবূ জেহেল ও শায়বা ইব্ন রাবিয়ার কাছে বসেছিলাম।

আবূ জেহেল বলল, হে কুরায়শ ! তোমাদের প্রতিমাদের মুহম্মদ মন্দ বলে, আর তোমাদেরকে নির্বোধ ঠাওরায়। তাঁর বিশ্বাস, তোমাদের পূর্বপুরুষ যারা মারা গেছে, জাহান্নমে যাবে। শুনে নাও, তোমাদের মাঝে কেউ যদি মুহাম্মদ (সা)-কে হত্যা করে সে আমার কাছে কালো ও লাল রংয়ের একশ উষ্ট্রী পাবে, সাথে এক হাজার উকিয়া রৌপ্য।

উমর (রা) বলেনঃ আমি তলোয়ার হাতে রাসূল (সা)-কে হত্যা করার জন্য বের হলাম। পথে দেখলাম, কিছু লোক একটা বাছুর যবেহ করছে। দাঁড়িয়ে আমি দেকতে লাগলাম। হঠাৎ শুনতে পেলাম যবেহকৃত বাছুরের ভিতর থেকে আওয়াজ বের হয়ে এলোঃ

হে মানুষ ! একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার শোন- বিশুদ্ধভাষায় এক ব্যক্তি মানুষকে আহবান জানাচ্ছে এ সাক্ষ্য প্রদানের জন্য যে, আল্লাহ্ ছাড়া কোন মাবুদ নেই এবং মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল ।

হযরত উমর (রা) বলেনঃ এ আওয়াজটি শুনে আমার মনে হলো কেউ যেন আমাকে একথাগুলো শুনাতে চাচ্ছে। তারপর আমি একটি ছাগলের কাছ দিয়ে যাচ্ছিলাম। শুনলাম, কেউ বলছে (মর্মার্থ)

হে শরীরধারিগণ !

তোমরা ও বুদ্ধিহীনরা এক ও পার্থক্যহীন ।

তোমরা মূর্তিদের বল হুকুমদাতা।

উটপাখি যেমন বুদ্ধিহীন হয়, তোমরাও তাই।

ঐ নূরখানা তেহামা থেকে চক্ষুষ্মানদের জন্য প্রকাশিত হয়েছে।

কত মহান সে ইমাম আল্লাহর দরবারে তাঁর পবিত্রতা বিদ্যমান,

ঐ ইমাম কুফারের স্থলে এনেছেন শান্তির দীন,

নেক কাজ ও অত্মীয়তার মিলন বন্ধন।

হযরত উমর (রা) বলেন, বুঝতে পারলাম এটাও যেন আমাকেই শোনান হলো। তারপরই যেমার মূর্তির কাছ দিয়ে যাচ্ছিলাম। শুনলাম, তার ভিতর থেকে কেউ বলেছে, যেমার মূর্তির দিন শেষ হয়ে গেল একদা যার পূজা করা হতো, সেই সালাতের পরই যা এসেছ নবীর সাথে। ঈসা ইব্ন মরিয়মের পর নবুওয়াত ও হেদায়াতের উত্তমধিকারী যে হয়েছে সে হলো কুরায়শদের একজন। সে হলো হেদায়াতপ্রাপ্ত । যারা যেমার ও তার মতো অন্যান্য মূর্তির পূজা করত তারা শীঘ্রই (আফসোস করে) বলবে, হায়! যেমার ও তার মতো মূর্তিদেরই কিনা পূজা করা হতো !

(হে উমর যে উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়েছ) তাতে তাড়াহুড়া করো না। কেননা তোমার এ হাত ও মুখ দিয়েই (অচিরেই) এ নবীর সহায়তা করবে।

উমর বলেনঃ আল্লাহর কসম ! আমি পরিষ্কার বুজতে পারলাম অদৃশ্য কারোর আমাকে একথাগুলো শুনানোই উদ্দেশ্য। তারপর আমি আমার বোনের বাড়ি গিয়ে পৌঁছলাম। দেখলাম, সেখানে বোনের স্বামী এবং খাব্বার আছেন। খাব্বার আমাকে বললেন, উমর ! মুসলমান হয়ে যাও। ভাল হবে। আমি পানি আনালাম, ওযূ করলাম এবং সেখান থেকে রাসূল (সা)-এর খিদমতে হাজির হলাম। তিনি আমাকে বললেনঃ ‘তোমার ক্ষেত্রেই আমার দোয়া কবূল হয়েছে।’ আমি মুসলমান হয়ে গেলাম। আমি ইসলাম গ্রহণকারীদের চল্লিশতম ছিলাম। সে সময়ই এ আয়াত নাযিল হয়ঃ

হে নবী ! আপনার জন্য খোদ আল্লাহ্ এবং অনুগত মু’মিনগণই যথেষ্ট।

— সূরা আনফালঃ ৬৪

(খাসায়েসুল কোবরা)

হযরত উমর (রা) আরও বর্ণনা করেন, আমি একদিন একটা মন্দিরে ছিলাম। মুশরিকরা প্রতিমার নামে বলি দিয়েছিল। হঠাৎ প্রতিমার পেট থেকে একটা আওয়াজ বের হলো। বলা হলোঃ “হে মানুষ ! শোনো একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। বিশুদ্ধ আরবিভাষী একজন ঘোষণা করছে এক আল্লাহ্ ব্যতীত কোনও উপস্য নেই।” মানুষ এ আওয়াজ শুনে ভয়ে পালাল। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। দ্বিতীয়বার আমি একই কথা শুনলাম। কয়েকদিনের ভিতর জানতে পারলাম যে, মুহাম্মদ (সা) মানুষকে এ কালেমার দিকে আহবান করছেন। (বুখারী) কিছু ঐতিহাসিক এ ঘটনাটি উমর (রা)-এর ইসলাম গ্রহণের দিন ঘটেছিল বলে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু বুখারীর বর্ণনামতে এটা তারও পূর্বের ঘটনা।

হযরত উমর (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে হযরত আনাস (রা)-এর বিখ্যাত রেওয়ায়েতটি এ রকম যে, হযরত উমর (রা) খোলা তলোয়ার নিয়ে বের হলেন। পথে বনী যুহরার এক ব্যক্তির (নায়ীম) সাথে দেখা। সে জিজ্ঞেস করল, উমর ! কোথা চললে ? উমর (রা) বললেনঃ মুহাম্মদ (সা)-কে হত্যা করতে। সে বললঃ কিন্তু তারপর বনী হাশেম আর বনী যুহবার প্রতিরোধ থেকে কেমনে বাঁচবে ? উমর (ক্ষেপে গিয়ে) বললেনঃ মনে হয় তুমিও ছাবী (ধর্মত্যাগী) হয়ে গেছ ?

লোকটি বললঃ শোনো, তোমাকে একটা অবাক করা খবর দেই। তোমার বোন আর ভগ্নিপতি উভয়েই ছাবী হয়ে গেচে। তোমাদের ধর্ম ত্যাগ করেছে। (নিজের ঘর সামলাও)। একথা শুনে উমর রাগে আগুন হয়ে বোনের বাড়ি গেলেন। তখন সেখানে খাব্বাব (রা) ছিলেন। তিনি উমরের আওয়াজ পেয়ে আত্মগোপন করলেন।

উমর বোন ও ভগ্নিপতিকে জিজ্ঞেস করলেনঃ তোমরা চুপি চুপি কি পড়ছিলে শুনতে পেলাম। তখন তাঁরা সদ্য নাযিল হওয়া সূরা ‘তোয়াহা’ পাঠ করছিলেন। তারা এড়িয়ে গিয়ে বললেনঃ আমরা তো কথাবার্তা বলছিলাম মাত্র। অন্য কিছু নয়। উমর বললেনঃ মনে হয় তোমরা ছাবী হয়ে গেছ। ভগ্নিপতি বললেনঃ সত্য কথা যদি তোমাদের ধর্মে না থেকে থাকে এবং অন্য কোথাও থাকে তবে আমরা কি করতে পারি?

একথা শুনে উমর (রা) ভগ্নিপতিকে বেদম প্রহার শুরু করলেন। তার বোন স্বামীকে রক্ষা করতে গেলে তাঁকে জোরে ঘুষি মারলেন। বোনের মুখ রক্তাক্ত হয়ে গেল। এতে উমরের রাগ কিছুটা ঠাণ্ডা হলো। বোনকে বললেনঃ তোমরা যা পাঠ করছিলে, আমাকে দাও তো পড়ে দেখি। বোন বললেনঃ তুমি নাপাক। কেবল পবিত্র মানুষই তা স্পর্শ করতে পারে। আগে ওযু করো। উমর ওযু করলেন। তারপর লিখিত পাতাটি হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করলেন। তাতে সূরা ‘তাহা’ লিখিত ছিল। পড়তে পড়তে যখন

নিশ্চয়ই আমি- আমিই আল্লাহ্ আমি ছাড়া কোনই আল্লাহ্ নেই, সুতারাং কেবল আমারই ইবাদত কর এবং ‘আমাকে মুহাম্মদ (সা)-এর কাচে নিয়ে চল।’

— তাহাঃ ১৩-১৪

একথা শুনে খাব্বার (রা) বের হয়ে এলেন। বললেনঃ ‘তোমার জন্য সুসংবাদ হে উমর ! আশা করছি রাসূল (সা)-এর ঐ দোয়া তোমার ক্ষেত্রেই বাস্তবায়িত হয়েছে’ যা তিনি গত বৃহস্পতিবার করেছেন। তিনি বলেছিলেনঃ হে আল্লাহ্ ! উমর ইব্ন খাত্তাব অথবা আমর ইব্ন হিশাম যাকে তোমার পছন্দ তাকে দিয়ে ইসলামের শক্তিশালী করো।’ উমর রওয়ানা হলেন এবং রাসূল (সা)-এর দরবারে হাজির হয়ে ইসলাম কবূল করলেন। (বায়হাকী)

তথ্যসূত্র

  • রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর জীবনে আল্লাহর কুদরত ও রুহানিয়াত (লেখকঃ মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুল গফুর হামিদী, প্রকাশকঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ)