হযরত তুফায়েলের কুদরতী নিদর্শন লাভ

From Sunnipedia
Jump to: navigation, search
মুহাম্মাদ (সঃ) এর মুজিজা সমূহ 2













  • হযরত তুফায়েলের কুদরতী নিদর্শন লাভ
















কুরায়শরা যখন সকল দিক থেকে ইসলামের আওয়াজ বন্ধ করতে ব্যর্থ হতে লাগল, তখন এক অদ্ভুত শুরু করল। মক্কায় আগত সকল সম্প্রদায় ও লোকজনকে রাসূলুল্লাহ্ (সা) এর সাথে মেলামেশা না করার এবং তাঁর কোন কথা না শোনার জন্য সতর্ক করা শুরু করল। এমনকি কোন বিশিষ্ট ব্যক্তি মক্কায় এলে সে যাতে কোন অবস্থায়ই তাঁর সাথে মিশতে বা কথা শুনতে ও বলতে না পেরে সেজন্য ওরা দলবেঁধে তার পিছু নিতে শুরু করল।

এক পর্যায়ে তুফায়েল ইব্ন আমর দাওনী মক্কায় এলেন। তিনি ছিলেন সম্ভ্রান্ত ও বিচক্ষণ একজন খ্যাতরনামা কবি এবং বিখ্যাত লোক। কুরায়শরা তাঁকে এ ব্যাপারে খুব সতর্ক করল। এদের এরকম ব্যাগ্র সতর্কতায় তিনি স্থির করলেন, নেতৃবৃন্দ এত করেই যখন বলছে, আমি আর ঐ ব্যক্তির কোন কথা কিছুতেই শুনব না। এমনকি তিনি কাবার কাছে যখনই যেতেন, কানে কাপড় গুঁজে রাখতেন, পাছে অসতর্ক মুহূর্তেও ওই লোকটির কোন কথা শুনে ফেলতে না হয়।

কিন্তু কুদরতের ইচ্ছে ছিল ভিন্ন। একদিন কাবার কাছে সালাতরত রাসূলুল্লাহ্ (সা) কুরআন পাঠ করছিলেন। তুফায়েল তাঁর কাছাকাছি এক জায়গায় দাঁড়ালেন এবং কুরআন তিলাওয়াতের কিছু অংশ তাঁর কানে পৌঁছল। কবি মানুষ তিনি। তাঁর মাঝে ভাবান্তর দেখা দিল। ভীষণ চমৎকৃত হলেন তিনি। সিদ্ধান্ত নিলেন, আমি তো একজন বুদ্ধিমান এবং কবি। ভালমন্দ বোঝা আমার জন্য কঠিন নয়। তবে কেন তাঁর কথা শুনব না ? ভাল হয় গ্রহণ করব, নয়তো প্রত্যাখ্যান করব। কিন্তু শুনব না কেন ?

এরপর তুফায়েল খুঁজে খুঁজে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বাড়িতে গিয়ে তাঁর সাথে দেখা করলেন। নিজের সব কথা তাঁর কাছে খুলে বললেন এবং দীন সম্পর্কে জানতে চাইলেন। আল্লাহর রাসূল (সা) তাঁর কাছে ইসলামের ব্যাখ্যা দিলেন। কিছু কুরআন পাঠ করে শোনালেন।

তুফায়েল বলেন, ‘আল্লাহর কসম ! এমন মধুর বাণী জীবনে শুনিনি। এত সুন্দর দীনের কথাও শুনিনি। সেখানেই তুফায়েল ইসলাম গ্রহণ করলেন। তারপর আরজ করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ্ ! আমি হলাম আমার কাওমের নেতা। তাদের কাছে গিয়ে ইসলামের দাওয়াত দেব। দাওয়াতের কাজে সহায় হয় এমন কোন নিদর্শন প্রদানের জন্য দয়া করে আল্লাহর কাছে দোয়া করুন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) দোয়া করলেন- “আয় আল্লাহ্ ! একে কোন নিদর্শন দাও।”

তারপর তুফায়েল দেশে রওয়ানা হলেন। যখন মক্কা থেকে বের হওয়ার গিরিপথে তিনি পৌঁছলেন, তাঁর দুচোখের মাঝখানে একটি উজ্জ্বল আলো জ্বলে উঠল। কাছাকাছিই তখন একটি কাফেলা অবস্থান করছিল। তুফায়েল ঘাবড়ে গিয়ে দোয়া করলেন, ‘আয় আল্লাহ্ ! এ আলো আমার চোহারা ব্যতীত অন্য কোথাও দাও। আশংকা হয়, লোকেরা আমাকে চেহারা বিকৃতির অপবাদ দেবে। তৎক্ষণাৎ এ আলো তার চোহরা থেকে সরে তাঁর চাবুকের মাথায় গিয়ে স্থিত হলো। কাফেলার লোকেরা এ কুদরতী আলো ফানুসের মতো তাঁর চাবুকের মাথায় প্রত্যক্ষ করছিল।

তুফায়েল বাড়ি ফিরে তাঁর পিতা ও স্ত্রী ইসলামের দাওয়াত দিলেন। তারা ইসলাম কবূল করলেন। তুফায়েলের মাধ্যমেই শেষ পর্যন্ত তাঁর কাওমের অধিকাংশ মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে। (ইব্ন ইসহাক)

বায়হাকী ইব্ন ইসহাক থেকে যে রেওয়াতে করেছেন তাতে আর একটু বিস্তারিতভাবে তুফায়েলের জবানীতে বলা হয়েছে, তুফায়েল বলেনঃ “আমি (ইসলাম গ্রহণের পর) আমার কাওমের কাছে ফিরে যেতে রওয়ানা হলাম। যখন কোদা নামক জায়গায় পৌঁছলাম, তখন আমার দু’চোখের মাঝ থেকে প্রদীপের মত একটা উজ্জ্বল আলো [রাসূল (সা)-এর দোয়ার মত] প্রকাশিত হলো। আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করলাম। আয় আল্লাহ্ ! এ আলো আমার মুখাবয়ব ব্যতীত অন্য কোথাও দাও। আমার ভয় হয় লোকেরা আমাকে মুখবিকৃতির অপবাদ দেবে। তখনই আলোটি আমার মুখবয়ব থেকে সরে চাবুকের মাথায় ঝুলন্ত বাতির মত হয়ে গেল।

বাড়ি ফেরার পর আমি কাওমকে ইসলামের দাওয়াত দিলাম। তারা ইসলাম গ্রহণে ইতস্তত করল। আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে এসে আরজ করলাম। দাওস কাওম মতের বিরুদ্ধে প্রবল হয়ে গেছে। আপনি তাদের জন্য দোয়া করুন। তিনি দোয়া করলেন, আয় আল্লাহ্ ! তুমি দাওসকে হেদায়াত দাও।’ তারপর আমাকে বললেনঃ কাওমের কাছে যাও। নম্রভাবে দাওয়াত দিও।

আমি ফিরে গেলাম। দাওলাত দিলাম। একসময়ে রাসূল (সা) মদীনায় হিজরত করলেন। দাওস গোত্রের মুসলমান হওয়া সত্তর কিংবা আশিটি পরিবার নিয়ে আমি খায়বারে পৌঁছলাম।”

হযরত আবুল ফারাজ এক সনদে মুহাম্মদ ইব্ন হাসান থেকে রেওয়ায়েত করেন, আমার চাচা আব্বাস ইব্ন হিশাম সূত্রে হিশাম থেকে বর্ণনা করেন যে,...... তারপর তুফায়েল রাসূল (সা)- এর কাছে এলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁকে ইসলামের দাওয়াত দিলে তিনি বলেনঃ আমি কবি। আমি যা বলি শুনুন। রাসূল (সা) বললেনঃ “ঠিক আছে বল।” তুফায়েল কয়েক পংক্তি কবিতা আবৃত্তি করলেন।

রাসূল (সা) বললেনঃ “এবার আমি পড়ি, তুমি শোন।” তিনি আউযুবিল্লাহ ও বিসমিল্লাহ্ পড়ে সূরা এখলাস ও সূরা ফালাক তিলাওয়াত করলেন। পুনরায় তাকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। সাথে সাথে তুফায়েল মুসলমান হয়ে গেলেন। তারপর কাওমের কাছে ফিরে চললেন।

যখন তাঁর কাওমের কাছাকাছি পৌঁছলেন, তখন অন্ধকার রাত। বৃষ্টি পড়ছিল। পথ দেখা যাচ্ছিল না। হঠাৎ তার চাবুক থেকে একটি আলো বের হলো। এ অবস্থায় তাঁর কাওমে পৌঁছলে সকালে তাঁকে জড়িয়ে ধরল এবং চাবুক স্পর্শ করে দেখতে লাগল। আলোর রশ্মি তাদের আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে ঠিকরে পড়ছিল।

তুফায়েল তাঁর মা-বাবাকে ইসলামের দাওয়াত দিলেন। তার বাবা তৎক্ষণাৎ মুসলমান হয়ে গেলেন। তার কাওমের দাওয়াত দিলেন। একমাত্র আবূ হুয়ায়রা (রা)ছাড়া তখন আর কেউ মুসলমান হলেন না। (অন্যরা পরে মুসলমান হন)

হযরত ইব্ন জরীর ইব্ন কালবী থেকে রেওয়ায়েত করেন, হযরত তুফায়েল (রা) কে উপরোক্ত কারণে “যিন্নুর’-নূরওয়ালা বলে ডাকা হতো।.... এ নূর অন্ধকার রাতে জ্বলে উঠতো। (খাসায়েসুল কোবরা)

তথ্যসূত্র

  • রাসুলুল্লাহ (সঃ) এর জীবনে আল্লাহর কুদরত ও রুহানিয়াত (লেখকঃ মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুল গফুর হামিদী, প্রকাশকঃ ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ)