হযরত মুজাদ্দিদে আলফে সানী (রহঃ)এর মুজাদ্দেদীয়াত

From Sunnipedia
Jump to: navigation, search

উল্লেখ্য যে, আকায়ে নামদার তাজেদারে মদীনা মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম সমস্ত নবী-রাসূলদের মাধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশেষ। তাঁর পর দুনিয়াতে আর কোন নবী-রাসূল আসবেন না। এ জন্য আল্লাহ্ তায়ালা তাঁর দ্বীনকে কিয়ামত পর্যন্ত দুনিয়াতে জারী রাখার বিশেষ ব্যবস্থা, তথা ‘মুজাদ্দিদ’ প্রেরণের ব্যবস্থা করেছেন। যেমন আবূ দাউদ শরীফে বর্ণিত এক হাদীসে প্রত্যেক শতকে একজন ‘মুজাদ্দিদ’ পাঠানোর সুসংবাদ আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন

নিশ্চয় আল্লাহ্ তায়ালা প্রত্যেক শতকের শুরুতেই এই উম্মতের দ্বীনের সংস্কারের জন্য একজন ‘মুজাদ্দিদ’ প্রেরণ করবেন।

— আবূ দাউদ শরীফ বর্ণিত।

এ হাদীসের ব্যাখ্যায় বিখ্যাত মুহাদ্দিস হাফিজ ইবন হাযার আস্কালানী (রহ.) বলেন, ‘প্রত্যেক শতকের জন্য একজন মুজাদ্দিদই যথেষ্ট। অবশ্য কারো কারো মতে, একের অধিক মুজাদ্দিদ ও হতে পারে। শাহ্ ওলীউল্লাহ (রহ.) এ মতের অনুসারী।

“মুজাদ্দিদ’ সম্পর্কে এ আলোচনার পর, হযরত মু জাদ্দিদে আলফে সানী (রহ.) সম্বন্ধে একথা উল্লেখ্য যে, তাঁর আগে সাধারণতঃ শতকের মুজাদ্দিদ প্রেরিত হতেন; কিন্তু হাজার বছরের মুজাদ্দিদ কেউ হননি। কেননা, এ হিজরী দ্বিতীয় হাযার বছর শুরু হয়নি। আর প্রথম হাযার বছরের মধ্যে স্বয়ং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের পবিত্র হাস্তিই (অস্তিত্ব) বিদ্যমান ছিল।

বস্তুতঃ মুজাদ্দিদে আলফে সানী (রহ.)-এর আগে যত মুজাদ্দিদ ছিলেন, তাঁর কেউ-ই দ্বীনের সমুদয় শাখা-প্রশাখার জন্য মুজাদ্দিদ ছিলেন না; বরং তাঁর দ্বীনের বিশেষ বিশেষ শাখার মুজাদ্দিদ ছিলেন। এ কারণে একই সময় কয়েক জন মুজাদ্দিদ হতেন। যেমন কেউ ইল্মে হাদীসের মুজাদ্দিদ, কেউ ইল্মে ফিকাহের মুজাদ্দিদ এবং কেউ ইলমে মারিফাতের মুজাদ্দিদ। কিন্তু আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন হযরত মুজাদ্দিদে আলফে সানী (রহ.)-কে দ্বীনের সব শাখার উপর মুজাদ্দেদীয়াত দান করে তাঁকে এক বিশেষ মাকামে উন্নীত করেন।

এর অর্থ এই যে, পূর্ববর্তী সকল ‘মুজাদ্দিদ’ জনাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের তরফ থেকে বিশেষ বিশেষ বিষয়ে প্রতিনিধিত্ব অর্জন করেন। কিন্তু হযরত মুজাদ্দিদে আলফে সানী (রহ.) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের তরফ থেকে সর্ব বিষয়ে পূর্ণ প্রতিনিধিত্ব হাসিল করেন। এই দুই প্রকারের প্রতিনিধিত্বের মধ্যে আকাশ-পাতাল ব্যবধান, কেননা, তাঁর পূর্ববর্তী মূজাদ্দিদগণের খিদ্মতের প্রভাব ছিল মাত্র এক শতকের জন্য। কিন্তু তাঁর মুজাদ্দেদীয়াতের প্রভাব হলো আগামী এক হাযার বছরের জন্য। উল্লেখ্য যে, কোন মুজাদ্দিদের জন্য, তাঁর মুজাদ্দিদ হওয়ার ইল্ম বা জ্ঞান থাকা জরুরী নয়। কিন্তু হযরত শায়খ আহমদ সিরহিন্দী (রহ.) পূর্ণভাবে নিজ মুজাদ্দেদীয়াত সম্পর্কে ওয়াকিভহাল বা অবহিত ছিলেন। এ সম্পর্কে তিনি তাঁর লিখিত মাক্তূবাত শরীফের ২য় খন্ডের ৪র্থ নং মাকতূব বা চিঠিতে লিখেছেনঃ

এই ফকীর আইনুল ইয়াকীন ও হাক্কুল ইয়াকীন সম্পর্কে কী বর্ণনা করবে ? আর যদি কিছু বর্ণনা করে, তবে তা কে বুঝবে? এই মারিফাত গুলো ‘বেলায়েতের ’ বা ওলীদের সীমার বাইরে। সাধারণ ওলীরা জাহিরী আলেমদের মত বুঝতে অক্ষম। কেননা, এই ইল্ম নবূওতের প্রদীপ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে, যা দ্বিতীয় হাযার বছরের তাজ্দীদের জন্য প্রকাশ লাভ করেছে। এই ইলম ও মারিফাতগুলোর অধিকারী হলো এই দ্বিতীয় হাযারের মুজাদ্দিদ। যা থেকে জানা যায় যে, তাঁর এই ‘ইল্ম ও মারিফাত জাত, সিফাত, হাল, ওয়াজদ, তাজাল্লীয়াত ও জযবা ইত্যাদি বিষয়ে সম্পর্ক রাখে .......।

— মাকতুবাত শরীফ, ২য় খন্ড, মাকতুব নংঃ ৪

মুজাদ্দিদে আলফে সানী (রহ.) আরো লিখেছেনঃ

জেনে রাখ যে, প্রত্যেক একশ’ বছর পর একজন মুজাদ্দিদ চলে গেছেন। আর শত ও হাযার বছরের মুজাদ্দিদ এক নয়। শত ও হাযারের মধ্যে যে পরিমান প্রভেদ, ঐ পরিমাণ, বরং তার চেয়েও অধিক প্রভেদ উভয় মুজাদ্দিদের মধ্যে বিদ্যমান। দ্বিতীয় হাযার বছরের মুজাদ্দিদ ঐ ব্যক্তি, যার মাধ্যমে ঐ সময় কুত’ব, আওতাদ, আব্দাল, নুজাবা ও নুকাবা বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও উম্মতের নিকট ফয়েজ পৌঁছে।

মুজাদ্দিদের সব চেয়ে বড় পরিচয় হলো তাঁর কাজকর্ম, যা দ্বারা দ্বীনের হিফাযত, সুন্নত প্রতিষ্ঠা ও বিদ’আত দূর হয়। মুজাদ্দিদের মূল কাজ হলো বিদ্’আত রহিত করা, উম্মতের ইস্লাহ বা সংশোধন এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের সুন্নতের পুনরুজ্জীবিত করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করা এবং এই বিশেষ কর্তব্য পালনে কোন বাধা বা প্রতিবন্ধকতার পরোয়া না করা। তাঁর কাজ কর্ম সর্ব সাধারণের নিকট ব্যাপকভাবে প্রচার লাভ করে। তিনি ও তাঁর অনুসারীগণ বিদআতি, বাতিলপন্থী ও দুনিয়াদার আলেমদের জন্য “লা হাওলা অলা কুওয়াতা ইল্লাবিল্লাহের’ প্রভাব রাখেন। তিনি ও তাঁর মুরীদগণ বাতিল পন্থীদের জন্য আকাশের বজ্রপাত ও ইয়ামনী তরবারীর ন্যায়। কেননা, তারা বাতিল পন্থীদের সমূলে বিনাশ ও জাহেলী যুগের কুসংস্কার ও আকীদার উচ্ছেদ সাধন কারী হন।

— মাকতুবাত শরীফ, ২য় খন্ড, মাকতুব নংঃ ৪

উল্লেখ্য যে, হিন্দুস্থানে বাদশাহ আকবর [1] ও জাহাঙ্গীরের রাজত্বকালে দ্বীন-ইসলাম বিপন্ন হয়ে পড়ে এবং ধর্মের মধ্যে অনেক বিদআত অনুপ্রবেশ করে। এ সময় হিন্তুস্থানে দ্বিতীয় হাজার বছরের মুজাদ্দিদরূপে হযরত শায়খ আহমদ সিরহিন্দী (রহ.)-এর আগমণ আল্লাহ্ তায়ালার কুদরতের অন্যতম নিদর্শন। তিনি আল্লাহর অসীম রহমতে দ্বীন-ইসলামের পূর্ণ হিফাযত করে তাঁর বিপ্লবী সংস্কারের মাধ্যমে দ্বীনের তাজ্দীদের দায়িত্ব পালন করেন। ‘জামেউদ্দোরার’ নামক কিতাবে হাদীস বর্ণিত আছে যে, হযরত নবী করীম (স.) ইরশাদ করেছেনঃ

হিজরী এগার শতকের শুরুতে আল্লাহ্ তায়ালা এমন এক ব্যক্তিকে প্রেরণ করবেন, যিনি হবেন এক বিশাল নূর। তাঁর নাম আমার নামের অনুরূপ হবে। দু ’জন অত্যাচারী বাদশার মধ্যে তাঁর আবির্ভাব হবে এবং তাঁর শাফাআতে অংখ্য ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে।

উল্লেখিত হাদীসটি হযরত মুজাদ্দিদে আলফে সানী (রহ.)-এর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য; কারণ তাঁর পবিত্র নাম ছিল শায়খ আহমদ (রহ.), এবং তিনি হিজরী এগার শতকের শুরুতে আকবর ও জাহাঙ্গীর এই দুই অত্যাচারী ইসলাম বিরোধী সম্রাটের যুগে দ্বিতীয় হাযার বছরের মুজাদ্দিদরূপে প্রেরিত হয়েছিলেন।

যার অর্থ হলো আল্লাহ্ ছাড়া ইলাহ্ নেই এবং আকবর হলো আল্লাহর খলীফা। এর ফলে আকবরের যুগে হযরত মুহাম্মদ (স.) কে রাসূল বলে স্বীকার করা রাষ্ট্রীয় বিধানে দন্ডনীয় অপরাধ বলে সাব্যস্ত হয়ে। উল্লেখ্য যে, ‘রওজাতুল কাইউমিয়া’ নামক গ্রন্থেও এ হাদীসটি বর্ণিত আছে[2]

এ সম্পর্কে আরো কিছু বক্তব্যঃ

হযরত মুজাদ্দিদে আলফে সানী (রহ.)-এর আবির্ভাবের পূর্বের ওলীগণের উন্নতি বেলায়েতের স্তর পর্যন্ত ছিল। হযরত রাসূরে করীম (স.)-এর মধ্যে ছিল যেমন নবুওতের কামালাত, তেমনি ছিল বেলায়েতের কামালাত।’ হযরত মুজাদ্দিদে আলফে সানী (রহ.) সর্বপ্রথম ‘বেলায়েতের’ উপরে এবং নবূওতের’ নীচে ‘কাইউমিয়াতের’ মাকামের বর্ণনা দেন এবং বলেনঃ তাঁর মাকামগত উন্নতি চার খলিফার ন্যায় বেলায়েত হতে নবুওত পর্যন্ত হয়েছিল এবং বেলায়েতের উপরে কাইউমিয়াতের স্তর তাঁর জন্য খাস করে দেয়া হয়। তাই তিনি উম্মতে মুহাম্মদীর প্রথম কাইউমরূপে আখ্যায়িত হন।

তাঁর বংশের আরো তিনজন কাইউম হলেনঃ
দ্বিতীয় কাইউম ছিলেন খাজা মুহাম্মাদ মাসুম
তৃতীয় কাইউম ছিলেন খাজা মুহাম্মদ নকশবন্দ (র.) এবং
চতুর্থ কাইউম ছিলেন খাজা মুহাম্মদ জুবাইর (র.)।

উল্লেখ্য যে কাইউম যে ব্যক্তি হয়, যাঁর খামিরের সাথে নবী করীম (স.)-এর খামিরের পরিত্যক্ত অংশ মিশ্রিত থাকে। মুজাদ্দিদে আলফে সানী (রহ.) বলেছেনঃ

আমার খামির হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের পরিত্যক্ত খামিরের অংশ হতে গ্রহণ করা হয়েছে।

— মাকতুবাত শরীফ, ৩য় খন্ড, মাকতূব নং- ১০০

‘ইমামে রাব্বানী’ হযরত মুজাদ্দিদে আলফে সানী (রহ.)-এর ‘লকব’ বা উপাধি। আর ইমামতের পদ নবূওতের নূরের অংশ। ইমামের ফিত্রত বা স্বভাব নবী (আ.) গণের ফিতরতে নিকটবর্তী। এ ছাড়া তাঁকে ‘খাজিনাতুর রহমত’ বা রহমতের ভান্ডার উপধিতে ভূষিত করা হয়। [3] বস্তুতঃ হযরত মুজাদ্দিদে আলফে সানী (রহ.)-এর তরিকাই সর্বশ্রেষ্ঠ তরীকা। শেষ যামানায় যখন ইমাম মেহেদি (আ.) আসবেন, তখন তিনি তাঁরই তরীকার খলীফাগণের অন্তর্ভূক্ত হবেন। তিনি ছিলেন একই সাথে কুতুবে মাদার ও ‘কুতুবে ইরশাদ’। পরবর্তীতে তারই সিলসিলায় ‘কুতুবে মাদার’ ও ‘কুতুবে ইরশাদ’ হবেন। কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর তরীকাভুক্ত মুরীদগণের পরিচয় তাঁকে জানানো হয়েছে।

তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা সম্পর্কে আরো বলা হয়েছে যে, তিনি মাধ্যম ব্যতীত আল্লাহর সাথে কথা বলেছেন। তিনি ‘ইলমে লাদুন্নী’ বা আল্লাহর থেকে প্রাপ্ত বিশেষ ইলেমের অধিকারী ছিলেন। তাঁর নিকট আল্ কুরআনের হরুফে মুকাত্তিয়াতের’ ভেদ সমূহ প্রকাশ করা হয়। হযরত আলী (রা.) তাঁকে আসমানের ইলম শিক্ষণ দিয়েছিলেন এবং হযরত খিজির (আ.) ও ইলিয়াস (আ.) তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করে তাঁকে হায়াত ও মউতের গুপ্ত রহস্য জানিয়ে দেন। তাঁকে অতীত ও ভবিষ্যতের ঘটনাসমূহ জানানো হয়েছিল।

তথ্যসূত্র

  1. বাদশাহ আকবর দ্বীনে-ইলাহী” নামে ইসলাম বাদে সব ধর্মের সমন্বয়ে এক খেঁচু ড়ি ধর্ম প্রচার করে। যার মূলমন্ত্র ছিলঃ” লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু আক্বারু খলীফাতুল্লাহ; আমরা বলবোঃ নাউজু বিল্লাহ মিন যালিক।
  2. এ সম্পর্কে অধিক জানার জন্য পড়ুনঃ বিপ্লবী মুজাদ্দিদ (রহ.); দ্বীন-ইলাহী ও মুজাদ্দিদে আলফে সানী
  3. ২৩. রওজাতুল কাইউমিয়া, খাজা মুহাম্মদ ইহসান লিখিত।
  • মুজাদ্দিদ-ই-আলফে সানী (রহঃ) জীবন ও কর্ম (লেখকঃ ডক্টর আ. ফ. ম. আবু বকর সিদ্দীক)