ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)

From Sunnipedia
Jump to: navigation, search
মাযহাবের ইমামগণ
  • ইমাম আবু হানিফা (রহঃ)



বংশ পরিচয়

প্রসিদ্ধ চার মাযহাবের ইমামগণের মধ্যে ইমাম আযম আবূ হানীফা (রহঃ) হলেন প্রথম ও সর্বশ্রেষ্ঠ । তাঁর নাম নু'মান, উপনাম আবূ হানীফা । তাঁর বংশ তালিকা এরূপ - আবূ হানীফা নু'মান ইবন সাবিত ইবন নু'মান মারযুবান । কারো মতে তাঁর দাদার নাম ছিল যুতী । ইমাম আ'যম আবূ হানীফা (রহঃ) ছিলেন একজন তাবিঈ । তিনি ইমাম আবূ হানীফা নামেই সমধিক প্রসিদ্ধ । তিনি হানাফী মাযহাবের প্রবর্তক । পৃথিবীতে তাঁর অনুসারীর সংখ্যাই সর্বাধিক ।

ইমাম আ'যম আবূ হানীফা (রহঃ) কূফা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন । তাঁর জন্মসাল সম্পর্কে ঐতিহাসিকগণের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে । কেউ বলেছেন, ৬৩ হিজরী, কেউ বলেন ৭০ হিজরী আবার কেউ বলেছেন ৮০ হিজরী সন । অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে তিনি উমাইয়া খলীফা আব্দুল মালিক ইবন মারওয়ানের শাসনআমলে ৮০ হিজরী সনে জন্মগ্রহণ করেন । তবে প্রখ্যাত গবেষক লেখক আল্লামা যাহিদ আল-কাওসারী বিভিন্ন ঐতিহাসিক তথ্যের ভিত্তিতে ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ) এর জন্মসন হিসাবে ৭০ হিজরী সালকে প্রাধান্য দিয়েছেন । [1]

ইমাম আ'যম আবূ হানীফা (রহঃ) এর পিতামত যুতী কাবুলের অধিবাসী একজন বিশিষ্টি ব্যবসায়ী ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের লোক ছিলেন । তিনি হযরত আলী (রাঃ) এর যুগে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার পর কূফায় আগমন করেন এবং এখানেই স্থায়িভাবে বসবাস শুরু করেন । তবে ইমাম আ'যম আবূ হানীফা (রহঃ) এর পৌত্র ইসমাঈল বলেন, আমরা বংশীয়ভাবে পারস্যের অধিবাসী ছিলাম । আমার পিতামহ ইমাম আ'যম আবূ হানীফা (রহঃ) ৮০ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেছেন ।

ইমাম আ'যম আবূ হানীফা (রহঃ) এর পিতা সাবিত হযরত আলী (রাঃ) এর খেদমতে উপস্থিত হন এবং তাঁর কাছে নিজের ও তার বংশধরদের কল্যাণের জন্য দু'আ করার আবেদন জানান । হযরত আলী (রাঃ) তাঁর এবং তাঁর বংশধরদের জন্য দু'আ করেন । সম্ভবত এ দু'আর বরকতেই ইমাম আ'যম আবূ হানীফা (রহঃ) এত বড় জ্ঞানের অধিকারী ও শ্রেষ্ঠ ইমাম হতে পেরেছিলেন । তিনি কূফায় তায়মুল্লাহ ইবন সা'য়ালাবাহ গোত্রের মিত্র ছিলেন বলে তাঁকে তায়মুল্লাহ্‌ও বলা হয় ।[2]

শিক্ষা

সেকালে ইসলামী শহরগুলোর মধ্যে কূফা নগরী ছিল সর্বাধিক প্রসিদ্ধ । বড় বড় উলামা, মুহাদ্দিসীন ও ফুহাকার সমাবেশের ফলে কূফা নগরী সেকালের ইলমের মারকায ও কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল । নাহু, সরফ, হাদীস, ফিকহ্‌, দর্শন ইত্যাদি জ্ঞানচর্চার মারকায হিসেবে কূফা ছিল সারা পৃথিবীর কাছে সুপরিচিত ।[3]

ইমাম আ'যম আবূ হানীফা (রহঃ) ছিলেন অসাধারণ মেধাশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব । তিনি সর্বপ্রথম ইলমে কালাম শিক্ষা লাভ করেন । তিনি এই বিষয়ে এত গভীরতা ও পারদর্শীতা লাভ করেন যে, লোকেরা তাঁর দিকে ইশারা করে বলত, তিনি হলেন ইলমে কালামের শ্রেষ্ঠ ইমাম । সেকালের যিন্দীক, নাস্তিক ও বাতিল শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে মুনাযারা করে তিনি অত্যন্ত সুখ্যাতি অর্জন করেন । তাঁর নিজের বক্তব্য যে, শুধুমাত্র মুনাযারা ও বাহাসের উদ্দেশ্যে আমাকে বিশ বার বসরায় গমণ করতে হয়েছে ।[4]

কোন কোন সময় পূর্ণ এক বছর আবার কোন কোন সময় প্রায় এক বছরকাল বসরায় অবস্থান করে খারিজী, হাসবিয়া ইত্যাদি বাতিল ফিরকার মুকাবিলায় আমাকে বাহাস করতে হয়েছে । সে সময় ইলমে কালামই ছিল আমার নিকট সবচেয়ে প্রিয় । একেই দ্বীন ও শরী'আতের সবচেয়ে মৌলিক জ্ঞান বলে আমি ধারণা করতাম । এবং এর দ্বারাই দ্বীনের বিরাট খেদমত হয় এই ছিল আমার বিশ্বাস । এরপর আমি ভেবেচিন্তে দেখলাম যে, হযরত সাহাবায়ে কিরাম ও তাবিঈন আমার তুলনায় দ্বীন ও শরী'আতের ব্যাপারে অধিক জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার অধিকারী ছিলেন । তথাপি তারা তর্ক-বিতর্ক ও বাহাস-মুবাসায় লিপ্ত হননি । বরং দ্বীনের ব্যাপারে তর্ক-বিতর্ককে কঠোরভাবে নিষেধ করতেন । তাঁরা তো শরী'আতের ফিকহী মাসআলা, মাসাইল ও আহ্‌কামের জন্য নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন এবং এজন্য ইলমী হালকা ও মজলিস কায়েম করেছিলেন । এ সময় আমাকে এক মহিলা একটি মাসআলা জিজ্ঞাসা করলে আমি এর উত্তর দিতে না পেরে বড় লজ্জিত হলাম । তখন আমি ইলমে কালাম বাদ দিয়ে ফিকহ ও হাদীস শিক্ষার জন্য আত্মনিয়োগ করলাম ।[5]

এরপর তিনি সে যুগের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফকীহ্‌ হাম্মাদ (রহঃ) এর ইলমী হালকায় শরীক হয়ে ইলমে হাদীস ও ইলমে ফিকহ অর্জনে আত্মনিয়োগ করেন । ইমাম হাম্মাদ (রহঃ) এর দারসের এ মজলিস হযরত আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রাঃ) এর সাথে সম্পর্কযুক্ত ছিল । কেননা হাম্মাদ (রহঃ) ইব্রাহীম নাখ্‌ঈ হযরত আলকামা (রহঃ) থেকে, হযরত আলকামা (রহঃ) হযরত আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রহঃ) থেকে ইলমে হাদীস ও ইলমে ফিকহ শিক্ষা লাভ করেছেন । ইমাম আ'যম আবূ হানীফা (রহঃ) ইমাম হাম্মাদ (রহঃ) এর মৃত্যু পর্যন্ত (১২০ হিঃ) মোট আঠার বছর অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে নিয়মিতভাবে তাঁর নিকট থেকে ইলমে হাদীস, ইলমে ফিকহ্‌ শিক্ষা লাভ করেন । যার ফলে ইমাম হাম্মাদ (রহঃ) এর মৃত্যুর পর তাঁর ছাত্রগণ সর্বসম্মতিক্রমে ইমাম আ'যম আবূ হানীফা (রহঃ) কে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করেন এবং কূফায় অবস্থিত এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব তাঁর উপর ন্যস্ত করেন । পরবর্তী সময়ে এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি 'মাদরাসাতুর রায়' নামে খ্যাতি অর্জন করে । ইমাম আ'যম আবূ হানীফা (রহঃ) সমগ্র ইরাকের শ্রেষ্ঠ ফকীহ হিসাবে সর্বজন কর্তৃক স্বীকৃতি লাভ করেন এবং সারা বিশ্বে তাঁর ইলম ও খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে ।[6]

ইমাম আ'যম আবূ হানীফা (রহঃ) ২২ বছর বয়স পর্যন্ত শুধু ইলমে কালাম শিক্ষায় রত ছিলেন তা-ই নয় বরং সাথে সাথে ইলমে হাদীসও শিক্ষা করেছেন । তবে ঐ সময়ে তিনি ইলমে হাদীস শিক্ষার তুলনায় ইলমে কালামকে অধিক প্রাধান্য দিয়েছিলেন । ২২ বছর বয়সের পর থেকে তিনি কেবল ইলমে হাদীস ও ইলমে ফিকহ শিক্ষায় আত্মনিয়োগ করেন । হাম্মাদ (রহঃ) এর সাহচর্যে থাকাকালীন দরসের অবশিষ্ট সময়ে তিনি বিভিন্ন মুহাদ্দিসের খেদমতে হাযির হয়ে ইলমে হাদীস শিক্ষা গ্রহণ করতেন । ফিকহ শিক্ষার ক্ষেত্রে ইমাম হাম্মাদ (রহঃ) যেমন ছিলেন তাঁর বড় উস্তাদ, তেমনি হাদীস শিক্ষার ক্ষেত্রে আমির শা'বী ছিলেন তাঁর বড় উস্তাদ । একবার ইমাম সাহেব হাদীসের উস্তাদ আ'মাশের দরবারে উপস্থিত হলে উস্তাদ তাঁকে কিছু প্রশ্ন করেন । উস্তাদ আ'মাশ বললেন, তুমি কোন্‌ দলীলের ভিত্তিতে এ উত্তর দিয়েছ ? তখন ইমাম সাহেব বললেন, আপনার কাছ থেকে যে হাদীস শিক্ষা করছি তার ভিত্তিতে উত্তর দিয়েছি । ইমাম আ'মাশ তখন বললেন,

হে ফকীহ্‌ সম্প্রদায়! তোমরা হলে ডাক্তার আর আমরা ঔষধ বিক্রেতা ।

ইমাম আ'যম আবূ হানীফা বলতেন, ঐ ব্যক্তিরই হাদীস বর্ণোনা করবার অধিকার রয়েছে যিনি হাদীস শ্রবণ করে তা মুখস্থ রাখতে পারেন । ইমাম ইয়াহ্‌ইয়া ইবন মু'ঈন বলেন, ইমাম আ'যম আবূ হানীফা (রহঃ) মুখস্থ ব্যতীত অন্য কোন হাদীস বর্ণনা করেন না ।[7]

সেকালের ইলমী মারকায বসরা, মক্কা মুয়াযযমা ও মদীনা মুনাওয়ারার শ্রেষ্ঠ উলামা-ই-কিরাম ও ইমামগণের সাথে ইমাম আ'যম আবূ হানীফা (রহঃ) এর সাক্ষাৎ ঘটে । আব্বাসী খলীফা মানসূর যখন বাগদাদ নগরী স্থাপন করেন তখন বাগদাদের উলামা ও মাশাইখের সংগে তাঁর সাক্ষাৎ লাভ এবং এ সকল উলামা ও মাশাইখের সংগে ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ) এর বিভিন্নভাবে ইলমী আলোচনা ও পর্যালোচনা অনুষ্ঠিত হয় । এসব আলোচনার মাধ্যমে ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ) যেমনিভাবে তাঁদের থেকে ইলমী ফায়দা লাভ করেন অনুরূপভাবে তাঁরাও ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ) থেকে যথেষ্ট উপকৃত হন । ফলে ইমাম আ'যম আবূ হানীফা (রহঃ) এর সুখ্যাতি এত ছড়িয়ে পড়ে যে তাঁর ইলমী হালকা বিশাল সমাবেশরূপে পরিণত হয় । যার একদিকে ছিলেন আব্দুল্লাহ ইবন মুবারক ও হাফ্‌স ইবন গিয়াস (রহঃ) প্রমুখ মুহাদ্দিস অপরদিকে ছিলেন ইমাম আবু ইউসুফ, ইমাম মুহাম্মদ ইবন হাসান, যুফার, হাসান ইবন যিয়াদের মত ফকীহ্‌গণ ।[8]

ইমাম সাহেবের উস্তাদবৃন্দ

ইমাম আ'যম আবূ হানীফা (রহঃ) অসংখ্য উস্তাদ থেকে ইলম শিক্ষা লাভ করেছিলেন । আবূ হাফস কাবীরের নির্দেশে ইমাম সাহেবের উস্তাদগণের যে তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছিল তাঁর মধ্যে চার হাজার উস্তাদের নাম লিপিবদ্ধ ছিল । 'উকূদুল জুম্মান' গ্রন্থে তাঁর দুই শ' আশি জন উস্তাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে । নিম্নে আবূ হানীফা (রহঃ) এর কিছু সংখ্যক প্রসিদ্ধ উস্তাদের নাম উল্লেখ করা হলোঃ

১) হাম্মাদ ইবন আবূ সুলাইমান (রহঃ)
২) আমির ইবন শুরাহ্‌বীল হিমাইরী কূফী (রহঃ)
৩) আলকামা ইবন মারসাদ কূফী (রহঃ)
৪) হাকাম ইবন কুতায়বা কূফী (রহঃ)
৫) আসিম ইবন আবুন-নাজওয়াদ কুফী (রহঃ)
৬) সালমান ইবন কুহায়েল কূফী (রহঃ)
৭) আলী ইবন আকমার কূফী (রহঃ)
৮) যিয়াত ইবন আলফাহ কূফী (রহঃ)
৯) হায়সাম ইবন হাবীব (রহঃ)
১০) আতা ইবন আবী রাবাহ মক্কী (রহঃ)
১১) সাঈদ ইবন মাসরুক সাওরী (রহঃ)
১২) আবূ জা'ফর আল-বাকের মুহাম্মদ ইবন আলী (রহঃ)
১৩) আদী ইবন সাবিত আনসারী (রহঃ)
১৪) আতিয়্যা ইবন সাঈদ আওফী (রহঃ)
১৫) আবূ সুফিয়ান সাদী (রহঃ)
১৬) আবূ উমায়্যা আব্দুল কারীম (রহঃ)
১৭) আবূ মুযারিফ বাসরী (রহঃ)
১৮) ইয়াহ্‌ইয়া ইবন সা'ঈদ আনসারী (রহঃ)
১৯) হিশাম ইবন উরওয়ার মাদানী (রহঃ)
২০) নাফি ইবন মাওলা ইবন উমার মাদানী (রহঃ)
২১) আমর ইবন দীনার মাক্কী (রহঃ)
২২) আব্দুর রহমান ইবন হরমুয আল-আ'রাজ মাদানী (রহঃ)
২৩) কাতাদাহ্‌ ইবন দাআমাহ বাসরী (রহঃ)
২৪) আবূ ইসহাক সাবী'ঈ কূফী (রহঃ)
২৫) মুহারিব ইবন দিসার কূফী (রহঃ)
২৬) মুহাম্মদ ইবন মুনকাদির (রহঃ)
২৭) সিমাক ইবন হারব কূফী (রহঃ)
২৮) কায়স ইবন মুসলিম কূফী (রহঃ)
২৯) ইয়াযীদ ইবন সুহায়েব কূফী (রহঃ)
৩০) আব্দুল আযীয ইবন কাফী মাক্কী (রহঃ)
৩১) আবূ যুহায়ের মুহাম্মদ মুসলিম মাক্কী (রহঃ)
৩২) মানসুর ইবন মু'তামিম কূফী (রহঃ)
৩৩) সুলাইমান ইবন মেহরান (রহঃ) এবং অনেক বিখ্যাত তাবিঈ । [9]

ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ) এর ছাত্রবৃন্দ

ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ) এর হাজার হাজার ছাত্র ছিল । তৎকালে অন্য কোন মুহাদ্দিস বা ফকীহ্‌ এর এত সংখ্যক ছাত্র ছিল না । মক্কা মুকাররমা, মদীনা মুনাওয়ারা, দামেশক, বসরা, কূফা, ওয়াসিত, মুসিল, জাযীরা, রিক্কাহ্‌, মিসর, ইয়ামন, বাহরাইন, বাগদাদ, আহওয়ায, কিরমান, ইস্পাহান, ইস্তারাবাদ, হালওয়ান, হামদান, দামগান, তাবরাস্তান, জুরজান, সারখ্‌স, নিসা, মারু, বুখারা, সমরকন্দ, তিরমিয, বলখ, কুহেস্তান, খাওয়ারিযম, সিজিস্তান, মাদায়েন, হিমস্‌ ইত্যাদি এলাকার হাজার হাজার শিক্ষার্থী ইমাম সাহেবের দরসে অংশগ্রহণ করে শিক্ষালাভ করেছেন । 'উকুদুল জুম্মান' গ্রন্থের লেখক উক্ত কিতাবে ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ) এর আটশ' শাগরিদের নাম লিপিবদ্ধ করেছেন । তাঁর ছাত্রদের মধ্যে বহু সংখ্যক ফকীহ্‌ ফকীহ্‌, মুহাদ্দিস ও কাযী ছিলেন । ইমাম সাহেবের কিছু প্রসিদ্ধ ছাত্রের মধ্যে কাযী আবূ ইউসুফ ইয়াকুব ইবন ইব্রাহীম, মুহাম্মদ ইবন হাসান শায়বানী, যুফার ইবন হুযায়ল আম্বরী, হাম্মাদ ইবন আবূ হানীফা, হাসান ইবন যিয়াদ, আবূ ইসমাত নূহ ইবন মারয়াম, কাযী আসাদ ইবন আমর, আবূ মুতী' হাকাম ইবন আব্দুল্লাহ বলখী, মুগীরা ইবন মিকসাম, যাকারিয়া ইবন আবূ যায়দা মিসআর ইবন কুদাম, সুফইয়ান সাওরী, মালিক মিগওয়াল, ইউনুস ইবন আবূ ইসহাক, দাউদ তাঈ, হাসান ইবন সালেহ্‌, আবূ বকর ইবন আইয়্যাশ, ঈসা ইবন ইউনুস, আলী ইবন মুসহির, হাফস ইবন গিয়াস, আবূ আসিম নাবীল, জারীর ইবন আব্দুল হামীদ, আব্দুল্লাহ ইবন মুবারক, ওয়াকী' ইবন জাররাহ্‌ আবূ ইসহাক ফাযারী, ইয়াযীদ ইবনু হারুন, মাক্কী ইবন ইব্রাহীম, আব্দুর রাযযাক ইবন হাম্মাদ সান আনী, আব্দুর রহমান মুকরী, হায়শাম ইবন বশীর, আলী ইবন আসিম, জাফর ইবন আওন, ইব্রাহীম ইবন তাহমান, হামযাহ ইবন হাবীব আয-যায়্যাত, ইয়াযীদ ইবন রাফী, যুবায়র, ইয়াহ্‌ইয়া ইবন ইয়ামান, খারিজা ইবন মুসআব, মুসআব ইবন কুদাম, রাবীয়া ইবন আব্দুর রহমান রাঈ মাদানী (রহঃ) প্রমুখ ।[10]

রচনাবলী

ফিকহী মাসাইলের সংকলন ও রচনার প্রচলন নিয়মিতভাবে দ্বিতীয় শতাব্দীতে শুরু হয় । এ সময়ে বিজ্ঞ উলামা, ফুকাহা ও মুহাদ্দিসগণ বিভিন্ন স্থানে কিতাবাদি লেখা আরম্ভ করেন । ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ)ও কূফাতে ইলমে ফিকহ সংকলন করেন । তাঁর ছাত্রদের এক জামা'আত নিয়ে 'আল-মাজমাউল ফিকহী' প্রতিষ্ঠা করেন ।

তাঁদের মাধ্যমে তিনি হাদীস ও ফিকহ লিপিবদ্ধ করাতেন । পরবর্তীতে তাঁর শিষ্যগণ এই সকল লিপিবদ্ধ মাসাইল তাঁদের ছাত্রদের শিক্ষাদান করেন । এ সংকলিত মাসাইলগুলোকে ইমাম আবূ হানীফার রচনাবলীর মধ্যে গণ্য করা হয় । এ ছাড়া ইমাম সাহেবের স্বরচিত কিতাবও রয়েছে, যেমন-

১) ফিকহুল আকবর
২) কিতাবুর রিসালা ইলাল-বুস্তী
৩) কিতাবু'ল আলিম ওয়াল মুতা'আল্লিম
৪) কিতাবুর রাদ্দে আলা'ল জাহামিয়া

আব্দুল্লাহ ইবন দাউদ ওয়াসিতী মন্তব্য করেন যে, কেউ যদি অন্ধত্ব ও মূর্খতার লাঞ্চনা হতে বেরিয়ে ফিকহের স্বাদ গ্রহণ করতে চায় সে যেন ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ) এর কিতাবসমূহ অধ্যয়ন করে ।[11]

চারিত্রিক গুণাবলী

ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ) চারিত্রিক গুণাবলীতে ছিলেন এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব । ইমাম আবূ ইউসুফ (রহঃ) খলীফা হারুনুর রশীদের সামনে ইমাম সাহেব সম্পর্কে বলেন, ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ) অত্যন্ত পরহেযগার ব্যক্তি ছিলেন । তিনি সর্বদা নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকতেন । অধিকাংশ সময় তিনি নীরব থাকতেন । তাঁর নিকট কোন মাসআলা জিজ্ঞাসা করা হলে তা জানা থাকলে তিনি তাঁর উত্তর দিতেন । তিনি ছিলেন অত্যন্ত দানশীল ও দয়ালু । জাগতিক শান-শওকত ও জাঁকজমক তিনি মোটেও পছন্দ করতেন না । অন্যের অপবাদ দেওয়া হতে সর্বদা বিরত থাকতেন এবং পরোপকারিতা, ন্যায়পরায়ণতা, সত্যবাদীতা, সাধুতা, ধৈর্য, সংযম, মায়ের খেদমত ও উস্তাদের প্রতি ভক্তি ইত্যাদি বহু গুণের অধিকারী ছিলেন ।

ইন্তিকাল

ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ) তৎকালীন শাসকবর্গ কর্তৃক অমানুষিকভাবে নির্যাতিত হন । উমাইয়া খিলাফতের সময় ইবন হুবায়রা তাঁকে কাযীর পদ গ্রহণ করার জন্য অনুরোধ করেন । কিন্তু তিনি তা গহণ করতে অস্বীকার করেন । যার কারণে ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ) কে দৈনিক দশটি বেত্রাঘাত করা হয় । এতদসত্ত্বেও তিনি কাযীর পদ গ্রহণ করতে সম্মত হননি । এরপর আব্বাসী খিলাফত আমলে পুনরায় কাযীর গ্রহণের জন্য তাকে অনুরোধ করা হয় । এবারও তিনি তা অস্বীকার করেন । যার কারণে খলীফা আবূ জা'ফর মানসুরের নির্দেশে তাঁকে গ্রেফতার করে কারাগারে রাখা হয় । কথিত আছে যে, কারাগারে তাঁকে বিষপান করানো হয়েছিল ।

তিনি ১৫০ হিজরী সনে কারাগারেই ইন্তিকাল করেন । বাগদাদের খেযরান নামক কবরস্থানের পূর্ব পার্শ্বে মসজিদ সংলগ্ন স্থানে তাঁকে দাফন করা হয় । পরবর্তীতে ইমাম আ'যমের স্মরণে তাঁর মাযারস্থ অঞ্চলটি আ'যামিয়্যা নামে পরিচিতি লাভ করে ।[12]

ইলমে ফিকহ ও ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ)

ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ) যদিও ইলমে কালাম, ইলমে হাদীস, ইলমে ফিকহ ইত্যাদি সব বিষয়েই পারদর্শী ছিলেন, তবে ইলমে ফিকহকে অধিক উপকারী মনে করে তিনি এর জন্য নিজের জীবনকে উৎসর্গ করে দেন । সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) ছিলেন ফিকহ শাস্ত্রে বিশেষ ব্যক্তিত্বের অধিকারী । অব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রাঃ) এর ইলমের বিশেষ উত্তরাধিকারী হাম্মাদ ইবন আবূ সুলাইমানের সাহচর্যে দীর্ঘদিন অবস্থান করে ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ) হযরত আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ (রাঃ) এর ফিকহ হাসিল করেন । এছাড়াও তিনি বিভিন্ন সূত্রে হযরত আলী, হযরত ইবন উমর, হযরত ইবন আব্বাস, হযরত যায়িদ ইবন সাবিত ও হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রাঃ) থেকে বর্ণিত ফিকহী জ্ঞান লাভ করেন ।[13]

ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ) এর ফিকহী ইজতিহাদের মূলনীতি

আমি ফিকহী বিষয়ে প্রথমত কিতাবুল্লাহ (কুরআন) থেকে হুমুক গ্রহণ করি । যদি কিতাবুল্লাহের মধ্যে সে সম্পর্কে হুকুম না পাই তবে সুন্নাত অর্থাৎ রাসুলুল্লাহ থেকে বর্ণিত সহীহ্‌ হাদীস থেকে হুকুম গ্রহণ করি । আর যদি কিতাবুল্লাহ ও সুন্নাতে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর মধ্যে সে হুকুম না পাই তবে সাহাবীগণের মধ্যে যার কথা গ্রহণযোগ্য মনে করি তাঁর কথা গ্রহণ করি । তাঁদের অভিমত বর্তমান থাকতে তা পরিত্যাগ করে অন্য কারো অভিমত গ্রহণ করি না । যখন সাহাবাদেরও কোন অভিমত না পাওয়া না যায় এবং মাসআলার সিদ্ধান্ত ইব্রাহীম নাখ্‌ঈ, শা'বী, ইবন সীরীন, হাসান, আতা, সাঈদ ইবন মুসায়্যিব প্রমুখ ফকীহের ইজতিহাদের উপর নির্ভরশীল হয় তখন আমিও ইজতিহাদ করি যেমন তারা ইজতিহাদ করেন ।

— আখবারু ইমাম আবূ হানীফা ওয়া আসহাবিহী, পৃষ্ঠা ১০

ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ) এর ইজতিহাদের পদ্ধতি ছিল এই যে, যে সব বিষয়ে কিতাবুল্লাহ, সুন্নাত রাসূলুল্লাহ্‌ ও সাহাবাগণের অভিমত পাওয়া যেত না, সেসব বিষয়ে তিনি কিয়াস দ্বারা সমাধান করতেন । খতীবে বাগদাদী 'তারীখে বাগদাদে আব্দুল্লাহ ইবন মুবারক তাঁর বক্তব্যে বর্ণনা করেন যে, কোণ বিষয়ে রাসূলুল্লাহ (সঃ) এর হাদীস পাওয়া গেলে তা আমাদের শিরোধার্য । আর সাহাবাগণের বিভিন্ন মত পাওয়া গেলে তাঁর মধ্যে কোন একটি মত নির্বাচন করে নেই । তাঁদের মত বর্জন করে অন্যভাবে সমাধান করি না । আর যদি তাবিঈনের অভিমত হয় সে ক্ষেত্রে আমরাও তাঁদের মত ইজতিহাদ করি ।[14]

ইমাম আবূ হানিফা (রহঃ) শরয়ী দৃষ্টিভঙ্গিতে সকল বিষয়ের সমাধানকল্পে প্রখ্যাত চল্লিশজন ফকীহ্‌ নিয়ে ইলমে ফিকহের একটি মজলিশ কায়েম করেন । তাঁদের মধ্যে ইমাম আবূ ইউসুফ (রঃ), মুহাম্মদ (রঃ), যুফার (রহঃ), ইমাম দাউদ তায়ী (রহঃ), ইমাম আসাদ ইবন উমর (রহঃ), ইমাম ইউসুফ ইবন খালিদ সিমতী (রহঃ), ইয়াহ্‌ইয়া ইবন যাকারিয়া ইবন আবূ যায়দা প্রমুখ ফকীহ্‌ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য । এই মজলিসে সর্বসম্মত সিদ্ধান্তগুলো লিপিবদ্ধ করা হত । তাঁদের মধ্য থেকে একজনও যদি কোন ভিন্ন মত পোষণ করতেন তবে তিন দিন পর্যন্ত সে বিষয়ের আলোচনা করা হত এরপর একমতে পৌঁছতে পারলে তা লিপিবদ্ধ করা হত ।[15]

তথ্যসূত্র

  1. আস্‌সুন্নাহ ও মাকানাতুহা ফিত্‌ তাশরী'ঈল ইসলামী, ডঃ মুস্তাফা হুসনী আস্‌ সুবাঈ, পৃষ্ঠা ৪০১
  2. আখবারু ইমাম আবূ হানীফা ওয়া আসহাবিহী, আবূ আব্দুল্লাহ, হুসাইন ইবন আলী আস-সামিরী, পৃষ্ঠা ৩; আইম্মা আরবা'আহ, কাযী আতহার হোসাইন, পৃষ্ঠা ৩৪
  3. আখবারে ইমাম আবূ হানীফা ওয়া আসহাবিহী, সামিরী; আইম্মা আরবা'আহ, কাযী আতহার হোসাইন
  4. আস্‌সুন্নাহ ও মাকানাতুহা ফিত্‌ তাশরী'ঈল ইসলামী, ডঃ মুস্তাফা হুসনী আস্‌ সুবাঈ, পৃষ্ঠা ৪০১
  5. আইম্মা আরবা'আহ, কাযী আতহার হোসাইন, পৃষ্ঠা ৪০
  6. আস্‌সুন্নাহ ও মাকানাতুহা ফিত্‌ তাশরী'ঈল ইসলামী, ডঃ মুস্তাফা হুসনী আস্‌ সুবাঈ, পৃষ্ঠা ৪০১
  7. আইম্মা আরবা'আহ, কাযী আতহার হোসাইন, পৃষ্ঠা ৪২
  8. আইম্মা আরবা'আহ, কাযী আতহার হোসাইন, পৃষ্ঠা ৪২
  9. আখবারু ইমাম আবূ হানীফা ওয়া আসহাবিহী, আবূ আব্দুল্লাহ হুসাইন ইবন আলী আস-সামিরী, পৃষ্ঠা ৩; আইম্মা আরবা'আহ, কাযী আতহার হোসাইন, পৃষ্ঠা ৮৬
  10. আস্‌সুন্নাহ ও মাকানাতুহা ফিত্‌ তাশরী'ঈল ইসলামী, ডঃ মুস্তাফা হুসনী আস্‌ সুবাঈ, পৃষ্ঠা ৪০১
  11. আইম্মা আরবা'আহ, কাযী আতহার হোসাইন, পৃষ্ঠা ৪০
  12. আইম্মা আরবা'আহ, কাযী আতহার হোসাইন, পৃষ্ঠা ৯২
  13. আইম্মা আরবা'আহ, কাযী আতহার হোসাইন, পৃষ্ঠা ৯২
  14. আস্‌সুন্নাহ ও মাকানাতুহা ফিত্‌ তাশরী'ঈল ইসলামী, ডঃ মুস্তাফা হুসনী আস্‌ সুবাঈ, পৃষ্ঠা ৪৪৭
  15. আইম্মা আরবা'আহ, কাযী আতহার হোসাইন, পৃষ্ঠা ২২২
  • ফাতাওয়া ওয়া মাসাইল (ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ)