ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহঃ)

From Sunnipedia
Jump to: navigation, search
মাযহাবের ইমামগণ



  • ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহঃ)

ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল (র) প্রসিদ্ধ চার ইমামের একজন। তাঁর নাম আহমদ, উপনাম আবু আবদুল্লাহ, পিতার নাম মুহাম্মদ, পিতামহ হাম্বল ইবন হিলাল । বংশধারাঃ আবদুল্লাহ্ আহমাদ ইবন মুহাম্মদ ইব্ন আযাদ ইব্‌ন ইদ্রীস (র)। ইমাম আহমাদ হাম্বল (র) ১১৬ হিজরীতে রবিউল আউয়াল মাসে বাগদাদে জন্মগ্রহণ করেন। এবং সেখাইে লালিত-পালিত হন। তাঁর বয়স যখন তিন বছর তখন তার পিতা ইন্তিকাল করেন। এরপর তাঁর মাতা সাদিয়া বিন্ত মায়মুনা-এর হাতে তিনি প্রতিপালিত এবং তাঁর তত্ত্বাবধানে মক্তবের শিক্ষা সমাপন করেন। ১৬ বছর বয়সে তিনি ইমাম আবু হানীফা (র)-এর খেদমতে হাজির হয়ে ইলমে হাদীস অধ্যয়নে মনােনিবেশ করেন। এছাড়া বাগদাদের প্রখ্যাত মুহাদ্দিস ও ফকীহগণ থেকে শিক্ষালাভ করার পর কূফা, বসরা, মক্কা, মদীনা, ইয়ামন সিরিয়া, জর্জিয়া ইত্যাদি স্থানের বিভিন্ন মুহাদ্দিস ও ফকীহগণ থেকে হাদীস ফিকহের জ্ঞান অর্জন করেন। এরপর তিনি হাদীস সংকলনের কাজে আত্মনিয়ােগ করেন। ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল (র) সে যুগের একজন প্রসিদ্ধ ফকীহ্ ও মুহাদ্দিস হিসাবে সর্বজন কর্তৃক স্বীকৃতি লাভ করেন। বর্ণিত রয়েছে যে, তিনি ইমাম শাফিঈ (র)-এর নিকট থেকে ইলমে ফিকহ লাভ করেছেন এবং ইমাম শাফিঈ (র)ও ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (র) থেকে ইলমে হাদীস শিক্ষা লাভ করেন। ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম (র) ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল (র)-এর শাগরিদ ছিলেন। হযরত ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বলের ইলমী সুখ্যাতি যখন সর্বত্র পরিব্যাপ্ত, এ সময় একদা তাঁকে দোয়াত-কলম নিয়ে কোন ইলমী দরসে শরীক হওয়ার জন্য যেতে দেখে জনৈক ব্যক্তি আশ্চর্যান্বিত হয়ে বললেন, জাতির একজন সুপ্রসিদ্ধ ইমাম হওয়া সত্ত্বেও ইলম শিক্ষার জন্য যাচ্ছেন! তিনি বললেন,

দোয়াতের সাথে কবরস্থান পর্যন্ত। ইলম শিক্ষার ধারা জারি থাকবে ।

— আইম্মা আরবাআহ, কাযী আতহার হােসাইন, পৃষ্ঠা ২২৩-২২৪।

ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল (র) যে সকল প্রথিতযশা মনীষী হতে ইলম হাসিল করেছেন। তাঁদের মধ্যে ইমাম আবু ইউসুফ, ইসমাঈল ইবন উলাইয়া, হুশায়ম ইবন বাশীর, হাম্মাদ ইবন খালিদ খাইয়্যাত, মানসূর ইবন সালামাহ খুজায়ী, মুজাফফর ইবন মুদরিক, উসমান ইবন উমর ইবুন ফারিস, আবু নযর হাশিম ইবন কাসিম, আবু সাঈদ মাওলা, বনী হাশিম (র), মুহাম্মদ ইন ইয়াযীদ ওয়াসিত, মুহাম্মদ ইব্‌ন আবু আদী, মুহাম্মাদ ইবন জাফর গুন্দর, ইয়াহইয়া ইবন সাঈদ আল-কাত্তান, আবু দাউদ তায়ালিসী, ওয়াকী ইবন জাররাহ, আবু উসমান, সুফইয়ান ইবন উআয়না, মুহাম্মদ ইবন ইদ্রীস শাফিঈ (র) প্রমুখ ব্যক্তি বিশেষভাবে উল্লেখযােগ্য।

ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল (র) চল্লিশ বছর বয়সে হাদীস ও ইফতার মসনদে অধিষ্ঠিত হয়ে পূর্ণ উদ্যমের সঙ্গে হাদীস ও ফিকহের দরস দিতে শুরু করেন। তার দরসে হাজার হাজার লােক অংশগ্রহণ করতেন। তন্মধ্যে আলিম ও সাধারণ উভয় ধরনের লােক শরীক হতেন। আলিমগণ হাদীসের ও ফিকহের শিক্ষা গ্রহণ করতেন এবং সাধারণ লােকেরা আদব ও আখলাকের তালীম নিতেন। তিনি ছাত্রদের সম্মান ও আরামের প্রতি সর্বদা লক্ষ্য রাখতেন। তার দরস ছিল গাম্ভীর্যপূর্ণ। তবে কোন কোন সময় তিনি ছাত্রদের সঙ্গে হাল্কা রসিকতাও করতেন। তিনি মুখস্থ হাদীস বলতেন না বরং অতি সতর্কতার জন্য কিতাব দেখে হাদীস বর্ণনা করতেন। তিনি তার নিজস্ব মতামত লিখতে ছাত্রদেরকে নিষেধ করতেন।

ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বলের অনেক উস্তাদও তাঁর নিকট হতে হাদীস শিক্ষা করেছেন । যেমন-আবদুর রাজ্জাক সান্‌আনী, ওয়াকী ইবন জাররাহ, আবদুর রহমান ইবন মাহদী, ইমাম শাফিঈ (র) প্রমুখ। | তাঁর হাজার হাজার শাগরিদ হতে নিম্নে প্রখ্যাত কিছু শাগরিদের নাম প্রদত্ত হলঃ ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বলের দুই পুত্র সালিহ্ ও আবদুল্লাহ, হাম্বল ইবন ইসহাক, হাসান ইবন সাব্বাহ, মুহাম্মদ ইবন ইসহাক সাগানী, আব্বাস ইবন মুহাম্মদ দূরী, মুহাম্মদ ইব্‌ন উবায়দুল্লাহ্ মুনাদী, মুহাম্মদ ইবন ইসমাঈল বুখারী, মুসলিম ইবন হাজ্জাজ নিশাপুরী, আবু যুরআহ্ রাযী, আবু হাতিম রাযী, আবু যুর্‌আহ দামেশকী, আবদুল্লাহ ইবন মুহাম্মদ বাগাবী, আবু দাউদ সিজিস্তানি, আবুল কাসিম বাগাবী (র) প্রমুখ ।[1]

ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল (র) তাকওয়া, পরহেযগারী ও হকের উপর অটল অবিচল এবং দুনিয়ার প্রতি ছিলেন নিরাসক্ত। খালকে কুরআনের বিষয়ে তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে মু'তাযিলাদের মুকাবিলা করেন। তিনি খলীফা মামুনের খিলাফত কাল থেকে মুতাওয়াক্কিল পর্যন্ত নির্যাতনের শিকার হন। তাঁকে কারারুদ্ধ করা হয়, দৈহিকভাবেও তাঁর উপর অমানুষিক নির্যাতন চালানাে হয়। তিনি এসব যুলুম ও নির্যাতন অত্যন্ত ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার সঙ্গে বরদাশত করে যান। খালকে কুরআনের ভ্রান্ত মতবাদ খণ্ডনের ক্ষেত্রে ইমাম আহমাদের কৃতিতুপূর্ণ ভূমিকা মুসলমানদেরকে যুগ যুগ ধরে সত্যের উপর অটল ও অবিচল থাকার অনুপ্রেরণা যােগাবে। এ ধরনের পরীক্ষায় দৃঢ়, অটল ও অবিচল থাকার কারণে মুসলমানদের কাছে তাঁর মর্যাদা এত বৃদ্ধি পেয়েছিল যে, উম্মতে মুসলিমার কাছে তিনি সে যুগের সর্বসম্মত মুজাদ্দিদ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। ইমাম শাফিঈ (র) তাঁর সম্পর্কে বলেন,

আমি বাগদাদে ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল (র)-এর চেয়ে অধিক মুত্তাকী, দুনিয়ার প্রতি নিরাসক্ত এবং যােগ্যতর আলিম দ্বিতীয় আর কাউকে দেখিনি।

তিনি ২৪১ হিজরী সনে বাগদাদে ইন্তিকাল করেন।

ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল (র) পাঁচটি মূলনীতির ভিত্তিতে ফাত্ওয়া প্রদান করতেনঃ

১. নসূসে কাইয়্যা অর্থাৎ কুরআন ও সহীহ হাদীস।।
২. সাহাবাগণের ফাতওয়া অর্থাৎ যখন তিনি সাহাবাগণের ঐকমত্যের কোন ফাতওয়া পেয়ে যেতেন তখন অন্য কোনদিকে ভ্রুক্ষেপ করতেন না।
৩. যদি সাহাবাগণের মতামত বিভিন্ন হতাে, তবে তিনি যে মতটি কুরআন ও সুন্নাহর বেশি নিকটবর্তী মনে করতেন তাই গ্রহণ করতেন। আর যদি কোনটি কুরআন ও সুন্নাহর বেশি নিকটবর্তী নির্ণয় করতে না পারতেন তবে সবগুলাে মতই উল্লেখ করতেন, কোনটাকেই প্রাধান্য দিতেন না।
৪. উপরােক্ত তিনটি মূলনীতির কোন একটিতে যদি সমাধান খুঁজে না পেতেন, তবে সেক্ষেত্রে মুরসাল হাদীস এমনকি হাসান ও যঈফ হাদীসকে গ্রহণ করতেন এবং তা কিয়াসের উপর প্রাধান্য দিতেন।
৫. যদি কোন মাসআলায় নস, কাওলে সাহাবী, মুরসাল এমনকি হাসান ও যঈফ হাদীস না পেতেন তখন কিয়াসের দ্বারা সমাধান দিতেন।

হাদীস সংকলনের ক্ষেত্রে ‘মুসনাদে আহমাদ ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল (র)-এর অমর অবদান। উক্ত ‘মুসনাদে তিনি তাঁর সংগৃহীত ও মুখস্থ সাত লক্ষ পঞ্চাশ হাজার হাদীস থেকে বাছাই ও নির্বাচন করে চল্লিশ হাজার হাদীস সংকলন করেন। এই ‘মুসনাদ' সংকলন ও বিন্যাসে তিনি তাঁর পূর্ববর্তীদের নীতি অনুসরণ করেছিলেন অর্থাৎ নির্দিষ্ট একজন সাহাবী হতে বর্ণিত হাদীস এক জায়গায় একত্রিত করেছিলেন, সে হাদীসের বিষয়বস্তু যতই ভিন্ন হােক না কেন। যেমন তিনি হযরত আবু বকর (রা) হতে বর্ণিত সমস্ত হাদীস একই অধ্যায়ে একত্র করেছেন যদিও সেসব হাদীসের বিষয়াবলী বিভিন্ন ছিল। অর্থাৎ নামায, যাকাত ইত্যাদি বিষয়ের সমস্ত একই অধ্যায়ে একত্র করেছেন।

ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল (র)-এর শাগরিদগণকে তাঁর নিজস্ব অভিমতসমূহ লিখতে নিষেধ করতেন। এমন কি কেউ তা লিখলে তিনি অত্যন্ত রাগ করতেন । যার ফলে তার ইনতিকারের পর তার শাগরিদগণ তাঁর আকওয়াল একত্র করেন, তাই ফিকহ হাম্বলী নামে পরিচিত।[2]

তথ্যসূত্র

  1. আইম্মা আরবাআহ , কাযী আতহার হােসাইন, পৃষ্ঠা ২১২ ও হুসনুত তাকাযী, যাহিদ কাওসারী, পৃষ্ঠা ৭
  2. আইম্মা আরবাআহ , কাযী আতহার হােসাইন, পৃষ্ঠা ২২৩-২২৪
  • ফাতাওয়া ওয়া মাসাইল (ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ)