ইমাম শাফেঈ (রহঃ)

From Sunnipedia
Jump to: navigation, search

ইমাম শাফিঈ (রহঃ) এর জন্ম ও বংশ পরিচয়

ইমাম শাফিঈ (রহঃ) প্রসিদ্ধ চারজন ইমামের অন্যতম । তাঁর নাম মুহাম্মদ, উপনাম আবূ আব্দুল্লাহ, পিতার নাম ইদ্রিস, পিতামহ আব্বাস, মাতার নাম ফাতিমা, পূর্ণ নাম ইমাম আবূ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবন ইদ্রিস ইবন উসমান ইবন শাফিঈ ইবন সায়েব ইবন ওবায়েদ কুরাইশী (রহঃ) । তাঁর বংশ পরম্পরা সর্বশেষে আবদে মানাফের সঙ্গে মিলে নবী করীম (সঃ) এর বংশের অন্তর্ভূক্ত হয় । তিনি ১৫০ হিজরী সিরিয়ার গাজা প্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন । দু'বছর কালে মাতার সংগে মক্কা মুকাররমায় চলে আসেন । সেখানেই প্রতিপালিত হন এবং প্রাথমিক শিক্ষা সমাপন করেন । প্রথমে কুরআন শরীফ লিখেন । তারপর দশ বছর বয়স পর্যন্ত হুজায়ল গোত্রের মধ্যে অবস্থান করেন এবং ইলমে লুগাত ও কবিতা শেখেন । এ জন্যই ইমাম শাফিঈ (রহঃ) হুজায়ল গোত্রের কবিতার সর্বশ্রেষ্ঠ নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীরূপে সমাদৃত । কথিত আছে যে, আরবী সাহিত্য ও ভাষায় ইমাম আসমায়ী হুজায়ল গোত্রের কবিতা স্বয়ং ইমাম শাফিঈ (রহঃ) হতে শুদ্ধ করে নিতেন । তারপর ইমাম শাফিঈ মক্কার মুফতী মুসলিম ইবন খালিদ যুনজীর নিকট ফিকহ শাস্ত্র শিক্ষা লাভ করেন । এরপর তিনি মদীনা মুনাওয়ারায় সফর করেন এবং ইমাম মালিক (রহঃ) এর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন । ইমাম মালিক (রহঃ) এর নিকট তিনি প্রত্যক্ষভাবে পুরো 'মুয়াত্তা' কিতাব অধ্যয়ন করেন । এই কিতাব অধ্যয়নকালে ইমাম মালিক (রহঃ) ইমাম শাফিঈর অসাধারন প্রতিভা, স্মৃতিশক্তি, অসামান্য বিনয় লক্ষ করে তাঁকে অধিকতর স্নেহ ও সম্মান করতেন ।

এরপর ইমাম শাফিঈ (রহঃ) ইয়ামনের একটি প্রদেশে চাকরি গ্রহণ করেন । চাকরিরত অবস্থায় কোন হিংসুক খলিফা হারুনুর রশীদ এর নিকট তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করেন । তাঁকে বাগদাদে ডেকে আনা হয় । এ সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে আহলে বাইতের প্রাধান্য প্রদানের ও শিয়া মতবাদ অবলম্বনের অভিযোগ আনা হয় । এ ঘটনা ১৮৪ হিজরীর । এরপর তাঁর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হওয়া এবং ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ) এর সুপারিশের কারণে খলীফা সম্মানের সাথে তাঁকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেন । এ ঘটনার পর ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ) এর সংগে ইমাম শাফিঈ (রহঃ) এর সম্পর্ক গভীর হয়ে ওঠে এবং তিনি ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ) এর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন । তিনি মুহাম্মদ (রহঃ) এর ছাত্রদের লিখিত পান্ডুলিপিগুলোও সংগ্রহ করেন । বাগদাদ থেকে প্রত্যাবর্তনের সময় তিনি ইমাম মুহাম্মদ (রহঃ) এর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে নিম্নোক্ত বাক্য উচ্চারন করেছিলেনঃ

ইমাম মুহাম্মদ ইবনে হাসানের ইলম হতে উটের বোঝা পরিমান ইলম নিয়ে আমি বাগদাদ হতে প্রত্যাবর্তন করছি

সেখান থেকে তিনি মক্কা মুকাররমায় ফিরে আসেন এবং সেখানে বসবাস করতে থাকেন । এ সময়ে মাঝে মাঝে তিনি হিজায ও ইরাকে ইলমী সফরে গমনাগমন করতেন । ১৯৯ হিজরীতে তিনি মিসরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন । সেখানে তিনি তাঁর ফিকহী মতামত প্রচার করেন এবং সে অনুযায়ী মাসআলা-মাসাইল সংকলন করেন । ২০৪ হিজরীতে তিনি ইন্তিকাল করেন ।[1]

উস্তাদবৃন্দ

ইমাম শাফিঈ(রহঃ) মক্কা, মদীনা, বাগদাদ ইত্যাদি এলাকার বহু ফকীহ্‌, মুহাদ্দিস হতে ইলমে ফিকহ্‌ ও হাদীসের শিক্ষা গ্রহণ করেন । তাঁদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, মুসলিম ইবন খালিদ যুনজী, মালিক ইবন আনাস, মুহাম্মদ ইবন হাসান, মুহাম্মদ ইবন আলী শাফিঈ (তাঁর চাচা), সুফইয়ান ইবন উআইনাহ্‌, ইব্রাহীম ইবন সা'দ, সাঈদ ইবন সালিম, ইসমাঈল ইবন উলাইয়্যাহ্‌, ইসমাঈল ইবন জাফর (রহঃ) প্রমুখ ।[2]

শাগরিদগণ

ইমাম শাফিঈ (র)-এর ইলমী জ্ঞান-ভাণ্ডার হতে অসংখ্য শাগরিদ ইলমে ফিকহ ও ইলমে হাদীস শিক্ষা লাভ করেছেন। এদের মধ্যে প্রসিদ্ধ কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হলােঃ হাসান ইব্‌ন মুহাম্মদ জাফরানী বাগদাদী, ইমাম আহম্মদ ইবন হাম্বল শায়বানী বাগদাদী, আবু সাত্তার ইবরাহীম হুসাইন ইব্‌ন আলী কারাবিসী, ইসমাঈল মুযানী, রাবী ইবন সুলাইমান, হারমালাহ ইবন ইয়াহইয়া মিসরী, ইউনুস আবদুল আলা, ইউসুফ ইবন ইয়াহইয়া, সুলাইমান ইবন দাউদ (র) প্রমুখ ।[3]

শাফিঈ মাযহাবের নীতিমালা

অন্য ইমামগণের মত ইমাম শাফিঈ (র)-এর মাযহাবের উসুল ছিল কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস। ইমাম শাফিঈ (র) ব্যাপকভাবে খবরে ওয়াহিদ-এর উপর আমল করতেন বিধায়, ইমাম আবু হানীফা (র) ও ইমাম মালিক (র)-এর মাযহাবের তুলনায় তাঁর মাযহাবের দলীলের ক্ষেত্র ছিল বিস্তৃত । অপরদিকে মুরসাল হাদীসের উপর আমল পরিত্যাগ করার কারণে তার মাযহাব অন্যদের তুলনায় ছিল সংকীর্ণ । অবশ্যই তিনি সাঈদ ইবন মুসায়্যিব (র)-এর মত প্রসিদ্ধ তাবিঈনের মুরসাল হাদীস গ্রহণ করতেন। ইমাম শাফিঈ (র)-এর মাযহাবের নীতিমালার মধ্যে আর একটি নীতি ছিল ‘ইসতিসহাব' (পূর্ব থেকে প্রচলিত রীতিনীতি)। প্রমাণ ও খণ্ডন উভয় ক্ষেত্রেই তিনি ইসতিসহাব দলীল পেশ করতেন; হানাফীদেরও তা গ্রহণযােগ্য। তবে তা শুধু খণ্ডনের ক্ষেত্রে, প্রমাণের ক্ষেত্রে নয় । [4]

ইমাম শাফিঈ (রহঃ) ও ইলমে হাদীস

ইমাম শাফিঈ (র) হাদীস শাস্ত্রেও ছিলেন বিশেষভাবে পারদর্শী। তিনি হাদীস রিওয়াতের (বর্ণনা) নীতিমালা প্রণয়ন করেছেন। তিনি ‘আল-উম’ ও ‘আর-রিসালা’ গ্রন্থে সুন্নাহ সম্পর্কে যে উচ্চাঙ্গের আলােচনা করেছেন, পরবর্তীকালের অধিকাংশ উলামায়ে কিরাম তাঁরই অনুসরণ করেছেন।

ইমাম মুহাম্মদ (র)-এর এ উক্তি দ্বারাই তার যথার্থতা প্রমাণিত হয়। তিনি আরও বলেন,

মুহাদ্দিসগণকে হাদীস সম্পর্কে কিছু বলতে হলে তাদের ইমাম শাফিঈর ভাষাতেই বলতে হবে ।

— আইম্মা আরবা'আহ, কাযী আতহার হােসাইন, পৃষ্ঠা ২২২

উপরোক্ত গ্রন্থদ্বয় ব্যতীত মাসনাদে শাফিঈ, সুনানে শাফিঈ নামে তাঁর আরও দুটি রয়েছে ।[5]

তথ্যসূত্র

  1. আস্‌সুন্নাহ ও মাকানাতুহা ফিত্‌ তাশরী'ঈল ইসলামী, ডঃ মুস্তাফা হুসনী আস্‌ সুবাঈ, পৃষ্ঠা ৪০১
  2. আইম্মা আরবা'আহ, কাযী আতহার হােসাইন, পৃষ্ঠা ১৪১-১৮১
  3. আইম্মা আরবা'আহ, কাযী আতহার হােসাইন, পৃষ্ঠা ১৭১
  4. আসসুন্নাতু অমাকানাতুহা ফিত তাশরী’ঈল ইসলামী, ড. মুস্তফা হুসনী আস্ সুবাঈ, পৃষ্ঠা ৪৪০
  5. আসসুন্নাতু অমাকানাতুহা ফিত তাশরী’ঈল ইসলামী, ড. মুস্তফা হুসনী আস্ সুবাঈ, পৃষ্ঠা ৪৪২
  • ফাতাওয়া ওয়া মাসাইল (ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ)