কুরআন নাযিলের প্রথম সূচনা

From Sunnipedia
Jump to: navigation, search
মুহাম্মাদ (সঃ) এর বিস্তারিত জীবনী



























  • কুরআন নাযিলের প্রথম সূচনা


নবী করিম (দঃ)-এর বয়স যখন ৪০ বছর ৬ মাস ১৫ দিন, তখনই পবিত্র রমযানের শবে ক্বদর সোমবার রাত্রে কোরআন মজিদ নাযিলের ধারা সূচিত হয়। গভীর রাত-ঘন অন্ধকার, কৃষ্ণা তিথীর শেষাংশ। নবী করিম (দঃ) গভীর ধ্যানে মগ্ন। হযরত জিব্রাইল (আঃ) গারে হেরার চূড়ায় নবীজীর (দঃ) খেদমতে এসে উপস্থিত। তিনি কোরআন নাযিলের সূচনা করলেন এভাবে 'ইকরা'-আপনি পাঠ করুন। শুধু একটি শব্দ। তিনবার উচ্চারণ করলেন জিব্রাইল (আঃ)। তিনবারই নবী করিম (দঃ) বললেন-মা আনা বি-কারিয়ীন-'আমি পাঠক নই-বরং পাঠদানকারী'। হযরত জিব্রাইল (আঃ) তিনবার নবী করিম (দঃ) কে জোরে আলিঙ্গন করলেন। এতে জিব্রাইলের (আঃ) পরিশ্রম হলো। নবী করিম (দঃ) বলেন-

আমার পক্ষ হতে জিব্রাইলের নিকট জহুদ বা কষ্ট পৌঁছলো।

এই আলিঙ্গন ছিল যাতে বশরী ও যাতে মালাকীর মধ্যে সমন্বয় সাধন। পরস্পর দুই যাতের মধ্যে যে ব্যবধান ছিল, তা আলীঙ্গনের মাধ্যমে দূরীভূত হয়ে গেল। এখানে হুযুর (দঃ)-এর মালাকী ছুরত প্রকাশ পেল এবং জিব্রাইলও জাহেরী বশরী ছুরতের আধ্যাত্মিক পরশে ধন্য হলেন। আলিঙ্গনের এই অনুষ্ঠান ছিল ফয়েয আদান-প্রদানের আলিঙ্গন। এক সীনা হতে অন্য সীনায় যে প্রবাহ গমন করে-তাকে ফয়েয বলা হয়। ইহা স্ফুলিঙ্গ সদৃশ। কারেন্ট যেভাবে প্রবাহিত হয়-ফয়েযও সেভাবে প্রবাহিত হয়। এজন্যই ইলমে মা'রেফাতকে ইলমে সীনা বলা হয় এবং শরীয়তের কিতাবী বিদ্যাকে বলা হয় ইলমে ছফীনা বা জাহাজী বিদ্যা।

হাদীস বিশারদগণের এটা আংশিক মতামত। তিনবার এই আনুষ্ঠানিকতা শেষে জিব্রাইল (আঃ) কোরআনের সূরা আলাক-এর প্রথম পাঁচটি আয়াত তিলাওয়াত করে শুনালেন। নবীজী পরে পাঠ করলেন। এভাবেই প্রত্যক্ষ অহী নাযিলের ধারা শুরু হলো।

এই পাঁচটি আয়াতই প্রথম প্রত্যক্ষ ওহী। সুতরাং এই পাঁচটি আয়াতের গুরুত্বও অপরিসীম। জ্ঞানের প্রথম সোপানই হলো পাঠ করা বা পড়া। কিন্তু মুসলমানরাই আজ জ্ঞানার্জনে সবচেয়ে অনগ্রসর। আমরা কোরআন সুন্নাহ ভিত্তিক জ্ঞান চর্চা করছিনা। তাই এই অধঃপতন। উক্ত পাঁচটি আয়াতে মানব সৃষ্টির দ্বিতীয় স্তর 'আলাক' বা রক্তপিণ্ড উপাদানের উল্লেখ করা হয়েছে। তারপর বলা হয়েছে-কলমের সাহায্যে আল্লাহ তায়ালা মানুষকে জ্ঞান দান করেছেন এবং অজানা তত্ত্ব কামেল মানুষকে (নবীজী) শিখিয়েছেন। বৈজ্ঞানিকদের সৃষ্টি সম্পর্কে গবেষণার মূল সূত্র এই পাঁচটি আয়াত। এভাবেই সমস্ত সৃষ্টিতত্ত্ব ও জ্ঞানের উৎস নবী করিম (দঃ)-এর নিকট প্রকাশ করা হলো।

অতঃপর জিব্রাইল (আঃ) অদৃশ্য হয়ে গেলেন। নবী করিম (দঃ) গারে হেরা থেকে নেমে নীচে আসলেন। এমন সময় জিব্রাইল (আঃ) শূন্যলোক থেকে আপন মূল ছুরতে দেখা দিলেন এবং বললেন-

আন্তা রাসুলুল্লাহ ওয়া আনা জিব্রাইল -আপনি আল্লাহর মনোনীত রাসুল এবং আমি জিব্রাইল ফিরিস্তা

মাওয়াহিবে লাদুন্নিয়া গ্রন্থে আল্লামা শাহাবুদ্দীন কাসতুলানী (রাঃ) লিখেন-ঐ সময়ই হযরত জিব্রাইল (আঃ) জমিনে পদাঘাত করে পানি বের করে নিজে অযু করলেন এবং নবী করিম (দঃ) কে অযু করার পদ্ধতি দেখিয়ে দিলেন। অযু শেষে হযরত জিব্রাইল (আঃ) দু'রাকাত নামায আদায় করলেন এবং হুযুর আকরাম (দঃ) কে দু'রাকাত নামায আদায় করতে বললেন। সেই সময় থেকে নবী করিম (দঃ) সাহাবায়ে কিরামকে নিয়ে সকালে ও সন্ধ্যায় দু'রাকাত করে ফজর ও মাগরিব নামায আদায় করতেন। এর ১১ বছর পাঁচ মাস পর যখন মে'রাজ শরীফে গমন করেন, তখন পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয করা হয় এবং মূল দু'রাকাআতের সাথে মাগরিবে এক রাকাত, যোহর, আছর ও এশাতে দু'রাকআত করে যোগ করা হয়।

হযরত আয়েশা সিদ্দিকা (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত নবুয়ত ধারার এই হাদীসখানা বোখারী শরীফে উল্লেখিত হয়েছে। হেরা গুহায় নবী করিম (দঃ) কে নবুয়তের দায়িত্বে অভিষিক্ত করা হয়। আরবিতে এই অভিষেককেই বি'ছাত বা মাবআছ বলা হয়। প্রিয় নবী (দঃ) আদম সৃষ্টির পূর্বেই নবী হিসেবে মনোনীত ছিলেন। দায়িত্ব প্রদান করা হয় হেরা গুহাতে। এদিনেই 'আউয়াল ও আখের নবী' উপাধীর রহস্য প্রকাশ পায়। আউয়াল, আখের, যাহের, বাতেন যেমন আল্লাহর সিফাতি নাম, তেমনিভাবে নবী করিম (দঃ)-এরও সিফাতি নাম [1]

নবী করিম (দঃ) যখন আকাশে তারকা হিসেবে বিরাজমান ছিলেন, তখন ঐ জগতের পাঁচশত চার কোটি বছর যাহের এবং পাঁচশত চার কোটি বছর বাতেন হিসেবে বিদ্যমান ছিলেন- বলে হযরত জিব্রাঈল (আঃ) নবী করিম (দঃ)-এর দরবারে স্বীকার করেছেন। জিব্রাঈলের মুখের এই স্বীকৃতি শুনে নবী করিম (দঃ) বললেন, 'আল্লাহর কসম, আমিই সেই তারকা-হে জিব্রাঈল'। ঐ সময়েও তিনি নবীই ছিলেন।

যাহের-বাতেন মিলিয়ে ঐ জগতের এক হাজার আট কোটি বছর পূর্বের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে দেয়া নবী করিম (দঃ) ব্যতীত অন্য কারও পক্ষে সম্ভব কি? এটাই তো গায়েবের এক বড় সংবাদ। নবী শব্দের মূল ধাতু নাবাউন। এর অর্থ 'গোপন সংবাদ প্রদান'। প্রত্যেক নবীর তিনটি বৈশিষ্ট্য থাকে। এক নম্বর বৈশিষ্ট্য হলো- আল্লাহ প্রদত্ত গায়েবী এলেম, দুই নম্বর বৈশিষ্ট্য- ফিরিস্তা দর্শন এবং তিন নম্বর বৈশিষ্ট্য হলো' আল্লাহ প্রদত্ত সরাসরি জ্ঞান বা ইলমে বদিহী [2]। সুতরাং নেতার কথা মেনে নেয়া তাদের উচিৎ।

হেরা পর্বত থেকে অবতরণ করে নবী করিম (রাঃ) সোজা বিবি খাদিজার (দঃ) নিকট চলে আসলেন এবং বললেন, 'তোমরা আমাকে চাদর দিয়ে ঢেকে দাও'। আকস্মিক ঘটনার স্বাভাবিক বিহ্বলতা কেটে যাওয়ার পর নবী করিম (দঃ) বিবি খাদিজার নিকট হেরা গুহার সব ঘটনা খুলে বললেন। বিবি খাদিজা (রাঃ) শান্ত্বনা দিয়ে নবী করিম (দঃ)-এর বিগত ১৫ বছরের চরিত্র মাধুর্য বর্ণনা করে বললেন, 'আপনি সুসংবাদ গ্রহণ করুন, আল্লাহর শপথ, নিশ্চয়ই আপনাকে আল্লাহ অপদস্ত করবেন না। কেননা, আপনি আত্মীয়-স্বজনদের সাথে সুসম্পর্ক রেখেছেন, কথায় সততার প্রমাণ দিয়েছেন, মানুষের দুঃখ লাঘব করেছেন, অতিথিদের সেবা করেছেন, সত্যপথে বিপদগ্রস্তদের সহযোগিতা করেছেন'। একথা বলে বিবি খাদিজা সর্বপ্রথম নবী করিম (দঃ)-এর উপর ঈমান আনয়ন করলেন। পৃথিবীর ইতিহাসে নিজ স্ত্রী কর্তৃক স্বামীর মহত্বের প্রথম স্বীকৃতি প্রদান এক বিরল ঘটনা। ইংরেজ লেখক ওয়ার্ডস ওয়ার্থ বলেছেন,

কোনো মানুষই নিজ স্ত্রীর কাছে হিরো বা সাধু সাজতে পারে না। কিন্তু মোহাম্মদ (দঃ)-এর বেলায় এর ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যায়

NO MAN IS HERO TO HIS VALET EXCEPT MOHAMMAD

প্রিয় নবীর (দঃ) চরিত্র মাধুর্য সম্পর্কে ১৫ বছর একান্ত সান্নিধ্যে থেকে অবলোকন করার সুযোগ বিবি খাদিজার (রাঃ) হয়েছিল। সামান্য ত্রুটিও যদি পরিলক্ষিত হতো- তাহলে তিনি এভাবে স্বীকৃতি প্রদান করতেন না। নবী করিম (দঃ) বিবি খাদিজাকে অযু করার পদ্ধতি শিক্ষা দিলেন এবং তাঁকে নিয়ে দু'রাকাআত নামাজ আদায় করলেন। এ অবস্থা দেখে ৮/১০ বছরের বালক হযরত আলী (রাঃ) ঈমান এনে নামাজে শরিক হয়ে গেলেন। বালকদের মধ্যে সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারী হচ্ছেন হযরত আলী (রাঃ), এরপর পুরুষগণের মধ্যে সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারী ছিলেন হযরত আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ), আশ্রিত লোকদের মধ্যে পালিতপুত্র যায়েদ ইবনে হারেছা (রাঃ), ক্রীতদাসগণের মধ্যে হযরত বেলাল (রাঃ), মহিলাদের মধ্যে বিবি খাদিজার (রাঃ) পর আবদুর রহমান ইবনে আউফ-এর মাতা হযরত শিফা (রাঃ) প্রথম ইসলাম কবুল করেন। এরপর নবীজীর চাচা উম্মুল ফযল (রাঃ), হযরত আবু বকর (রাঃ)-এর কন্যা আসমা (রাঃ) প্রথমদিকে ইসলাম গ্রহণ করার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন [3]

তথসূত্র

  1. বেদায়া-নেহায়া ও মাওয়াহিব
  2. ওহাবী লেখক সোলায়মান নদভীর সিরাতুন্নবী গ্রন্থের ৩য় খণ্ড ১৬ ও ১৭ পৃষ্ঠা-উর্দ্দু
  3. আনওয়ারে মোহাম্মদীয়া
  • নূরনবী (লেখকঃ অধ্যক্ষ মাওলানা এম এ জলিল (রহঃ), এম এম, প্রাক্তন ডাইরেক্তর, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ)